বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কোভিডের দরুন দুই বছর ধরে ভারতের অর্থনীতি চলেছে ঢিমেতালে। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, গোঁত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো কর্মসংস্থানের হাল ও বেকারত্বের ঊর্ধ্বগামিতায় অর্থনীতির ঋণাত্মক বৃদ্ধির হাহাকার দেশবাসীকে কুরে কুরে খেয়েছে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি অর্থনীতির আকাশে রুপালি কিছু ঝিলিক দেখা দিয়েছিল। অবসাদ কাটিয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি সামান্য হলেও ইতিবাচক হয়েছিল। কিন্তু অমিক্রনকে দোসর করে কোভিডের ফিরে আসা ও পুরোনো নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা সামান্য সেই বৃদ্ধিও ধরে রাখতে পারবে কি না, সংশয় জাগিয়েছে।

চিন্তাকে দুশ্চিন্তায় পর্যবসিত করেছে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি। দেশের সর্বত্র পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশের ওপর। পেট্রল-ডিজেলের নিত্য মূল্যবৃদ্ধির ঝাপটায় সাধারণ মানুষ তিক্তবিরক্ত। কোভিডের মোকাবিলায় সরকারের প্রাথমিক ব্যর্থতার পাশাপাশি অর্থনীতির তলানিতে পৌঁছানো এবং মূল্যবৃদ্ধিজনিত সার্বিক অসহায়তা মোদি সরকারের ভাবমূর্তিতে যে আঘাত হানে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে শেষ পর্যন্ত বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারগুলো জ্বালানির ওপর ভ্যাট কমাতে বাধ্য হয়। বস্তুত সেটা ছিল অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের ওপর বিজেপির রাজনৈতিক চাপ। কিন্তু তাতেও সুরাহা হয়নি। যে সময় মনে করা হচ্ছিল অর্থনীতির ফাড়াটা কাটতে চলেছে, সে সময়ই মূর্তিমান বিপদ

সেজে অমিক্রনকে দোসর করে উপস্থিত কোভিডের তৃতীয় ঢেউ। অর্থনীতিকে তা ফের কোন চুলায় নিয়ে যাবে, এখনই সেই অনুমান সম্ভবপর নয়। আপাতত ত্রাহি ত্রাহি রব চারদিকে।

এর ঠিক আগের পরিস্থিতিও সরকারের পক্ষে বিশেষ স্বস্তিজনক ছিল না। গত জুলাইয়ে কিছুটা বাড়া কর্মসংস্থানের লেখচিত্র আগস্ট মাসে আচমকাই নিম্নগামী হয়। ১ মাসে ১৫ লাখ কর্মী বেকার হয়ে যান। ‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’র রিপোর্ট অনুযায়ী জুলাইয়ে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৩৯৯ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন। আগস্ট মাসে কর্মহীন হন ১৫ লাখ! শহুরে বেকারত্বের হার বাড়ে দেড় শতাংশ, গ্রামীণ হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ, সারা দেশের হার দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ! অথচ আগস্টে সেই হার ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সারা দেশে ৪ কোটি মানুষ তখন চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন। অবস্থার উন্নতি যখন হচ্ছিল, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় অর্থনীতিতে যখন গতি আসছিল, তখনই কোভিডের তৃতীয় হুংকারের নতুন আতঙ্ক। প্রধানমন্ত্রী মোদির চিন্তা তো বাড়বেই।

ঘরের লড়াই জিততে বিজেপির উগ্র হিন্দু্ত্ববাদ আন্তর্জাতিক মহলে মোদির ভাবমূর্তি কিছুটা মলিন করেছে। হয়তো আরও করবে। কিন্তু সে পরের কথা। আগে ঘর, পরে বাহির। একের পর এক ‘ধর্ম সংসদ’ থেকে তাই খুল্লামখুল্লা মুসলমান নিধনের হাঁক শোনা যাচ্ছে। দিল্লি, হরিদ্বার, রায়পুরের ধর্ম সংসদের বিষোদ্‌গার দেশকে উত্তাল করলেও প্রধানমন্ত্রী নির্বিকার।

এই দুশ্চিন্তার মধ্যেই এসে গেছে উত্তর প্রদেশসহ পাঁচ বিধানসভার ভোট। নতুন বছরে নরেন্দ্র মোদির প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ এটাই।

চ্যালেঞ্জের শীর্ষে অবশ্যই উত্তর প্রদেশ। এই ‘মিনি ইন্ডিয়া’ ২০১৪ থেকে মোদির ঝুলি ভরাচ্ছে। আজ তাঁর যা হাঁকডাক, উত্তর প্রদেশের জনতা উপুড়হস্ত না হলে তা সম্ভব হতো না। গত বিধানসভা ভোটে রাজ্যের ৪০৩ আসনের মধ্যে শুধু বিজেপিই জিতেছিল ৩১২ আসন। সহযোগীদের নিয়ে ৩২৫। এবার সেই আসনের কাছাকাছি থাকা গেরুয়াধারী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের যত বড় চ্যালেঞ্জ, ততটাই দুশ্চিন্তা প্রধানমন্ত্রী মোদির।

উত্তর প্রদেশের ভালোমন্দের প্রাথমিক দায় অবশ্যই আদিত্যনাথের। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মোদির পছন্দ তিনি ছিলেন না। আজ যিনি জম্মু-কাশ্মীরের উপরাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মোদি চেয়েছিলেন সেই মনোজ সিনহাকে। কিন্তু নেপোর দই মারার মতো শেষবেলায় কেল্লা ফতে করেন আদিত্যনাথ; উগ্র হিন্দুয়ানা ও একবগ্গা মানসিকতার দরুন। সংঘ ভেবেছিল, আদিত্যনাথই

হবেন অযোধ্যাভূমিতে হিন্দুত্ববাদের সারথি। মোদির অসম্মতি তাই ধোপে টেকেনি। পরবর্তীকালে দেখা যায়, ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর যে কারিকুরি বিজেপির পতাকাকে পতপত করে উড়তে সাহায্য করেছে, আদিত্যনাথের শাসন তা কমজোরি করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর অত্যধিক স্বজাতপ্রেম (ক্ষত্রিয়) ক্ষুব্ধ করে তুলেছে ব্রাহ্মণ, দলিত ও অনগ্রসরদের। আদিত্যনাথ এমনই এক খচখচে কাঁটা, অমিত শক্তিধর মোদিও যা গিলতে বা উগরাতে পারেননি। তাঁকে বহাল রেখেই মোদি নেমেছেন এই এসপার–ওসপার লড়াইয়ে।

উত্তর প্রদেশের ভালোমন্দের সঙ্গে বেশি জড়িয়ে মোদির ভাগ্য। কারণ, ভারতীয় রাজনীতির আদি ও অকৃত্রিম সত্য হলো দিল্লি জয়ের রাস্তা লক্ষ্ণৌ ঘুরে আসে। উত্তর প্রদেশ বিধানসভার দখল আগের মতো নিরঙ্কুশ রাখতে না পারলে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে অনিশ্চয়তা বাড়বেই। গতবারের ভোট এই রাজ্য থেকে বিজেপিকে দিয়েছে ৮০-এর মধ্যে ৬৪ আসন। তা ছাড়া মনে রাখতে হবে, বিধানসভার সংখ্যাধিক্য রাজ্যসভারও নিয়ন্ত্রক। সংসদে বিরোধী দাবি দুরমুশের যা একমাত্র হাতিয়ার। উত্তর প্রদেশ তাই এত গুরুত্বপূর্ণ।

ছোট রাজ্য হলেও উত্তরাখন্ড ও গোয়ার গুরুত্ব এবার কম নয়। দুই রাজ্যেই বিজেপি যথেষ্ট নড়বড়ে। উত্তরাখন্ডে মুখ্যমন্ত্রী বদলাতে হয়েছে তিনবার। এই রাজ্য হারানোর অর্থ কংগ্রেসের পালে বাতাস লাগা। মনোহর পারিক্করের মৃত্যুর পর গোয়াও হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিশ্চিত। সেখানে কংগ্রেস জোটের বাড়া ভাতে তৃণমূল কংগ্রেস ছাই দিতে পারলে মোদির পক্ষে মন্দের ভালো। নইলে ঘাড়ের ব্যথার মতো গোয়াও খচখচ করবে। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রবল। কিন্তু বিজেপি সেখানে নিমিত্ত মাত্র। সাবেক কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং ও অকালি দলের ভগ্নাংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা ভেসে থাকতে চাইছে। পাঞ্জাবে লড়াইটা মূলত কংগ্রেসের সঙ্গে আম আদমি পার্টির। দলিত মুখ্যমন্ত্রী চান্নির ওপর ভর দিয়ে কংগ্রেস রাজ্য ধরে রাখতে পারলে মোদির ভ্রু আরও কুঞ্চিত হবেই। কেননা, তাঁর ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ গড়ার স্লোগান তখন তাঁকেই পরিহাস করবে।

ঘরের লড়াই জিততে বিজেপির উগ্র হিন্দু্ত্ববাদ (মুসলমানবিরোধিতা) আন্তর্জাতিক মহলে মোদির ভাবমূর্তি কিছুটা মলিন করেছে। হয়তো আরও করবে। কিন্তু সে পরের কথা। আগে ঘর, পরে বাহির। একের পর এক ‘ধর্ম সংসদ’ থেকে তাই খুল্লামখুল্লা মুসলমান নিধনের হাঁক শোনা যাচ্ছে। দিল্লি, হরিদ্বার, রায়পুরের ধর্ম সংসদের বিষোদ্‌গার দেশকে উত্তাল করলেও প্রধানমন্ত্রী নির্বিকার। কোনো রা কাড়েননি। বিজেপিও। যে সরকারের কাছে মহাত্মা গান্ধী প্রাতঃস্মরণীয়, সেই সরকার কী করে তাঁর হত্যাকারীর আরাধনা সয়, তা বিস্ময়ের! ছত্তিশগড়ের কংগ্রেসি সরকার একজনকে গ্রেপ্তার করলেও বিজেপি রাজ্যে ‘অপরাধীরা’ মুক্ত বিহঙ্গ। হরিদ্বার থেকে ঘোষিত হয়েছে পরবর্তী ধর্ম সংসদের দিনক্ষণ। জানুয়ারিতে গাজিয়াবাদ, আলিগড়, কুরুক্ষেত্র ও হিমাচল প্রদেশে। অযোধ্যার সাফল্য বেগবান করেছে কাশী, মথুরা ও বৃন্দাবনের মুক্তির ডাক। নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে দিন দিন। মোদির উপলব্ধি, উন্নয়ন ভোট টানে না। হিন্দুত্বই একমাত্র মুশকিল আসান। বারানসিতে তাই বলেছেন, ঔরঙ্গজেব এলেই শিবাজির আবির্ভাব ঘটে। ভোটের আগে চিত্রনাট্য তৈরি।

‘ফ্রিডম হাউস’ ভারতীয় গণতন্ত্রকে ‘মুক্ত’ থেকে ‘আংশিক মুক্ত’ তালিকায় নামিয়েছে, ‘ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট–এর বিচারে ‘ত্রুটিপূর্ণ’। ‘ভি-ডেম ইনস্টিটিউট’ ভারতকে ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক দেশ’ বলেছে। এদের দৃষ্টিতে মোদি সরকার ‘স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী’। আন্তর্জাতিক এই ভ্রুকুঞ্চন সামালের চেয়ে মোদির কাছে বেশি জরুরি ঘরের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা।

নতুন বছর ফুরফুরে মেজাজে শুরু হয়নি। চিন্তামুক্ত নন তিনি। ঘর সামলানো মোদির প্রথম কাজ। বাইরে তাকানোর সময় তারপর।

  • সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন