বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরসেপ গঠনের আলোচনা যখন শুরু হয়েছিল, সে সময় বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যে বড় ধরনের বদল ঘটছিল। অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে জাপানকে পেছনে ফেলে চীন দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছিল এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দাবি ও কর্মকাণ্ড অনেক বেড়ে যাচ্ছিল। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত জানান, দক্ষিণ চীন সাগরে সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে চীন জাতিসংঘ সমুদ্র আইনের যে বিধিবিধান রয়েছে, সেটা লঙ্ঘন করছে।

ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অংশীদারত্ব চুক্তি (টিপিপি) স্বাক্ষর হয়েছিল। চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা থেকেই এ জোট তৈরি করা হয়েছিল। যাহোক, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তাঁর প্রশাসন টিপিপি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে।

টিপিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এ সিদ্ধান্ত অনেক দেশের জন্য হতাশার কারণ হয়েছিল, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও। ২০১৭ সালে ওই অঞ্চলে নিয়োজিত ছয়জন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কংগ্রেসে খোলা চিঠি দিয়ে টিপিপি সমর্থনের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এ সুযোগে চীন ওই অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়। এ দৃশ্যপটের মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বর আরসেপ গঠনের জন্য ফিলিপাইনের ম্যানিলায় প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভারত প্রথম দিকে এ প্রক্রিয়ায় ছিল। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে তারা এ প্রক্রিয়া থেকে সরে যায়।

কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক বদল হয়েছে। নেকড়ে যোদ্ধা কূটনীতিকে তারা সামনে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মধ্যেও সাম্প্রতিক কালে বিরোধ বাড়ছে। চীন তার রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক কূটনীতি প্রয়োগ করছে।

আরসেপ গঠন করা হয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। কিন্তু চীনের নেকড়ে যোদ্ধা কূটনীতি অন্যদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাপান এ বছরের জুন মাসে আরসেপ-এ যুক্ত হতে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু চীন থেকে জাপানি কোম্পানিগুলোকে সরে আসার জন্য প্রণোদনাও দিচ্ছে তারা। দক্ষিণ কোরিয়াতেও চীনবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বাজে অবস্থায় পৌঁছেছে। ক্যানবেরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অকাস নিরাপত্তা চুক্তি সই করেছে।

নিরাপত্তা নিয়ে ওই অঞ্চলে উদ্বেগ যেভাবে বাড়ছিল, তাতে ধারণা করা হচ্ছিল আরসেপ জোটে সই করতে অনেক সদস্য বিরত থাকবে। আবার এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী, সেটা তার মিত্রদের কাছে স্পষ্ট নয়। আরসেপভুক্ত দেশগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। আবার তারা চীনকে থামানোর জন্য আলাদা ভূরাজনৈতিক জোটও গড়তে চায়। কিন্তু ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোট আলাদা হতে পারে না।

অতি সম্প্রতি চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতার নতুন সম্প্রসারিত জোটে (সিপিটিপিপি) যুক্ত হওয়ার আবেদন করেছে। এই আবেদন গ্রহণ করা হতে পারে, যদি বেশির ভাগ সদস্যদেশ চীনের পক্ষে উমেদারি করে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের ভূমিকার কথা বিবেচনা করতে পারি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হওয়ার পর চীন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি।

আরসেপ-এর মাধ্যমে চীন এখন ওই অঞ্চলে নিজেদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বাড়াতে চাইবে। প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াসহ চীনের অর্থনীতি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চীনের আবাসন কোম্পানি ইভারগ্রান্ডের যে বিপর্যয়, সেটা এ চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করছে। আরসেপ তাই অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে চীনের সামনে একটা বড় সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। কিন্তু এর অভিঘাত সদস্যদেশগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

  • সঞ্জয় পুলিপাকা সিনিয়র ফেলো দিল্লি পলিসি গ্রুপ, ভারত

  • মোহিত মুসাদ্দি স্বাধীন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা

মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন