নদীতে ভাসা সিরীয় কিশোরী থানি, সঙ্গে নাগিব মাহফুজের চিঠি

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রায় দুই হাজার বয়সী বাইজেন্টাইন জামানার ভূগর্ভস্থ কয়েদখানা ছিল আমাদের প্রথম গন্তব্য। শেষে আমরা হাজির হলাম তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তবর্তী ছোট শহর নুসাইবিনে। নুসাইবিনের ইতিহাস রোম আর ইস্তাম্বুলের মতোই পুরোনো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে নিজেদের সুবিধামতো তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে ব্রিটিশ আর ফরাসিরা শহরের বুকে ছুরি চালিয়ে দ্বিখণ্ডিত করেছে, অনেকটা আজকের আসাম আর সিলেটের মতো করেই। তুরস্কের অংশের নাম নুসায়বিন আর সিরিয়ার অংশের নাম কামুসলু। লিখিত ইতিহাসের বয়ানে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এই দুই শহরের মানুষ পরস্পরের আত্মীয়। কিন্তু ১৯১৬ সালের সাইকস পিকট চুক্তির দরুন জাতিরাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের নামে এই মানুষগুলোর জীবনকে দ্বিখণ্ডিত করে বিভক্ত করেছে দুই ভূমিতে।

কিন্তু এই অধম কেন সেখানে? ২০১৩ সালের শীতকাল। দেশের প্রথাগত নৃবিজ্ঞানচর্চার এবং পড়াশোনার বৃত্তের বাইরের কিছু বিষয়কে জানার আগ্রহে বেশ কয়েকটা বেখাপ্পা কোর্স নিয়েছিলাম। সীমান্ত ও সীমান্তভূমি এলাকার নৃতত্ত্ব (অ্যানথ্রোপলজি অব বর্ডার অ্যান্ড বর্ডারল্যান্ড) ছিল তার মধ্যে একটা। ভারী ভারী সব চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর ঠিক করলাম স্বচক্ষে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনবোধ আর কঠোর সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। তখন মাঠকর্মের কাজে তুরস্ক-সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যাওয়া হয়।

এক মানুষ আর দুই সীমান্ত
বর্তমান তুরস্ক সীমান্তবর্তী শহর নুসাইবিনে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ আরম্ভের পর মাইনের সঙ্গে ইট, পাথর আর কাঁটাতারের দেয়াল উঠেছে ন্যাটোর সীমান্ত এবং তুরস্কের স্থানীয় নিরাপত্তার নামে। সীমান্তে পোঁতা মাইনের অবস্থান সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের বিস্তর জ্ঞান যেভাবে হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গুত্ব ও মরণ থেকে রক্ষা করতে পারেনি, ঠিক একইভাবে পঙ্গুত্ব, মরণ আর সীমান্তে মাইনের স্তূপ মানুষের অনুভূতি আর দৈনন্দিন জীবনকে অবদমন করতে পারেনি। অনুভূতির তাগিদে ভালোবাসা নির্মাণে প্রতিনিয়ত মানুষ সীমান্ত পারাপার করে নতুন জীবনের খোঁজে। জীবনের দায়ভার সহজ করতে রাষ্ট্রের কড়া নজরদারি ডিঙিয়ে বাণিজ্য করে। জাতিরাষ্ট্র উপনিবেশবাদীদের অঙ্কিত যে কৃত্রিম সীমানাকে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব হিসেবে নির্ধারণ করে, সেই সীমানাকে মোটাদাগে সীমান্তবর্তী মানুষ প্রতিনিয়ত ভেঙে নিজস্ব সীমানা বিনির্মাণ করে। সীমানা বিনির্মাণের এই হাঙ্গামায় প্রাণ যায় গণমানুষের। প্রাণ হরণ আর প্রাণ হারানো, দুই দলই একই বর্গের মানুষ।

সীমান্তের নদী থেকে উঠে এল এক মেয়ে
মাঠকর্মের শেষে গোধূলির শুরুতে মূল দল থেকে পালানোর একটা সুযোগ এল একদিন। স্থানীয় এক বন্ধুকে নিয়ে কাছ থেকে সীমান্ত অঞ্চল দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। বন্ধুবর নুসাইবিনের স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় সীমান্তবর্তী মানুষের ইতিহাস, সমস্যা আর সিরিয়ার যুদ্ধের অবস্থায় তার দক্ষতা ছিল মোল্লা নাসিরুদ্দিনের মতো। দুই দেশের সীমান্তবর্তী চা-চা নদীর তীরে বসে অপর পাশের সিরীয় অংশের মানুষের চলাচল দেখছিলাম আমরা। কুর্দিরা এই নদীকে চেখচেখ বলে ডাকে। নদীর চারপাশ ঘিরে দুই রাষ্ট্রের সেনাচৌকি ও টহল। আমরা বসে ছিলাম। আমার চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল বিশাল উত্তেজনা। সেই উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় রূপ নিল যখন কিঞ্চিৎ দূরে নদীর পানির মধ্যে কিছু নড়াচড়া শুরু করল। শুরুতে পাত্তা দিলাম না। কিন্তু পানির মধ্য থেকে আস্ত একটা মানুষ উঠে আসতে দেখে দিনের আলোতেই ভয়ে চুপসে গিয়েছিলাম। বিপরীতে আমার সঙ্গী মেয়েটি ছিলেন নিরুদ্বিগ্ন। এ ধরনের পরিস্থিতি সামলে নিতে সীমান্তবর্তী মানুষের অভ্যস্ত। আস্ত মানুষটি ছিল সিরীয় একজন কিশোরী। সংক্ষেপে তার নাম নায়লা আল থানি। সীমান্তের অপর অংশ সিরিয়ার কামুসলু থেকে জীবন বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তুরস্কে আসছে সে। সীমান্তে টহলরত সেনাদের চোখ ফাঁকি দিতেই নদীই ছিল তার একমাত্র সহায়।

নিতান্তই পুলিশি ঝামেলা এড়াতে শুরুতে বান্ধবী থানি নামের মেয়েটিকে সঙ্গ দিতে রাজি ছিলেন না। তবে জোরাজুরির একপর্যায়ে থানিকে স্থানীয় থানায় নিতে আগ্রহ দেখালেন। তৎকালীন সময়ের বিচারে, ২০১৩ সালে তুরস্কের শরণার্থীনীতি পাকাপোক্ত ছিল না। তাই আইন মোতাবেক পুলিশ ছিল নিরুপায়। সর্বশেষ সুদর্শনা এক কর্মকর্তার তদবিরে স্থানীয় এক শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় মেলে থানির। থানিকে শরণার্থীশিবিরে রেখে আমাকে ফিরতে হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের সঙ্গে। শীতের মধ্যে একাকী ১৩ বছরের এক কিশোরীকে শরণার্থীশিবিরে একা রেখে যেতে মন চায়নি। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন আমাদের উভয়কে একাকী করেছে। তবে মন পড়ে ছিল থানির হাতে ভিজে যাওয়া পোঁটলার মধ্যে রাখা তার বইয়ে আর তার নিষ্পাপ হাসিতে।

ছয়টি ঈদ থানির সঙ্গে, অথচ এবারে নয়
পরের দিন আরবিভাষী বন্ধুকে নিয়ে হাজির হলাম থানির ক্যাম্পে। কিন্তু থানি লাপাত্তা। শরণার্থীশিবিরের নিরাপত্তারক্ষীরা পর্যন্ত থানির খবর দিতে পারল না। সন্ধ্যার পর থানি শরণার্থীশিবিরে ফিরল। জানা গেল, সিরিয়ায় থাকা তার বাবাকে ফোনে তার বর্তমান অবস্থান জানান দিতে সে শহরে গিয়েছিল। থানির পরিবার তখন ছিল আসাদের নজরবন্দী। তার আগে পুরো পরিবার আসাদের জেলখানায় ছিল চার বছর। ঈদসহ অন্য সব উৎসব থানিকে নীরব রাখত। নুসাইবিনের সীমান্ত থেকে সিরিয়ার দিকে তাকিয়ে নীরবে অশ্রু ফেলত কিশোরী থানি। অঙ্কের হিসাবে পুরো ছয়টি ঈদ কাটিয়েছি থানির সঙ্গে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থানিকে সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টায় আমার কার্পণ্য ছিল না।

দুই বছর শরণার্থীশিবিরের স্কুলে ছিল থানি। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকে থানির ফলাফল ছিল আকাশচুম্বী। এই পুরো সময়ে হাজারবার দেখা হয়েছে থানির সঙ্গে। কথা হয়েছে তার শৈশব, তুরস্কের নতুন জীবন আর তার স্বদেশ সিরিয়া নিয়ে। আরবি আর কুর্দি ভাষায় থানির দক্ষতা আমাদের বারবার মুগ্ধ করলেও বইয়ের প্রতি তার বেশুমার ভালোবাসা সম্মোহিত করেছিল সবাইকে। থানির ভক্তি ছিল মিসরীয় কবি নাগিব মাহফুজে। যে ভক্তির শুরু ছিল তার বাবার মাধ্যমে। রুশ-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের কালে থানির বাবা ছিলেন কায়রোতে। কায়রোতে আরবি তুলনামূলক সাহিত্যের ওপর পাঠ নিয়েছেন তিনি। সে সুবাদেই থানির বাবার সাক্ষাৎ পান নোবেল বিজয়ী মিসরীয় সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজের।

থানি জন্মাবে বলে তার জন্য লিখলেন নাগিব মাহফুজ
উপসাগরীয় যুদ্ধের আগমুহূর্তে যখন থানির বাবা কায়রো ত্যাগ করেন, তখন থানির বাবা নাগিব মাহফুজকে অনুরোধ করেছিলেন যদি তাঁর কোনো কন্যা জন্মে, তার জন্য কিছু লিখে দিতে। নাগিব মাহফুজ লিখেছেন এবং মেয়েটির জন্য ‘থানি’ নাম ঠিক করে দিয়েছেন। থানি দুনিয়াতে আসে এর ঠিক ১০ বছর পর। বেঁচে থাকার তাগিদে নদীপথে যখন থানি তুরস্কে এসে ওঠে, তখন তার হাতের পোঁটলার মধ্যে ছিল নাগিব মাহফুজের চিঠি এবং স্বাক্ষরিত বই। থানির রক্তের মধ্যে জীবন রক্ষার মরণপণ বিক্ষোভ আর নাগিব মাহফুজের স্মৃতি মিলেমিশে এক বিপ্লবী দর্শনের গোড়াপত্তন হয়েছে, যা আরব বিশ্বকে নব্য উপনিবেশবাদীদের কবজা থেকে মুক্ত করতে অবিরাম সংগ্রামের কথা বলে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মধ্যকার বিভেদ পাশ কাটিয়ে ক্ষুধা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে হুংকার দেয়। দুর্জয় থানি তার দুর্ভেদ্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছে তার মহত্ত্ব। নাগিব মাহফুজের স্বাক্ষরিত সেই বই আর কিছু চিঠি তুরস্কের জাতীয় মহাফেজখানায় জমা দেয় সে। তুরস্কের সরকার থানির বিশাল মনের জবাব দিয়েছে থানিসহ তার পরিবারকে নাগরিকত্ব প্রদান করে।

ধ্রুপদি সংগ্রামের একজন
তবে আজ প্রায় ১০ বছর পর থানিকে নিয়ে লেখা কারণ ভিন্ন। করোনার প্রতাপে যখন থানিবিহীন আরেকটি ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন থানি জানালেন প্রশান্তির সুসংবাদ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্টে থানি মার্কিন মুলুকের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে। সমাজ এবং ব্যক্তিগত সত্যের দ্বন্দ্বে পক্ষ না নিয়ে মন আর ইচ্ছার মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধন তৈরি করেছেন থানি। সেই বন্ধনের ফল এই সাফল্য। থানি শৈশবের মানসিক আঘাত ঝেড়ে ফেলেছেন। বাবাকে হারিয়েছেন কয়েক বছর আগে। পিতৃবিয়োগ থানির মানসিক অবস্থাকে পিটিয়ে লোহার মতো শক্ত করেছে আর মজবুত গাঁথুনি দিয়েছে দুনিয়াকে বোঝার শক্তিকে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ লাখো মানুষের জীবনের গতি থামিয়ে দিতে পারলেও থানিকে কাবু করতে পারেনি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনবদ্য সৃষ্টি ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ উপন্যাসের হাজারি ঠাকুরের মতো তাঁর ‘উদ্যমই জীবনের সবটুকু। যার জীবনে আশা নেই, যা কিছু করার ছিল সব করা হয়ে গেছে—তার জীবন বড় কষ্টের’। এই উক্তি থানি তাঁর কর্মের মাধ্যমে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন চারপাশের মানুষদের। থানির জীবনে উদ্যমই ছিল একমাত্র সম্পদ। উদ্যমই তাঁর শিরকে উঁচু করেছে। থানি বিভিন্ন সময়ে নাগিব মাহফুজের লেখা চিঠিগুলো দেখিয়েছেন আমাকে। কিন্তু আরবি ভাষায় মূর্খতার দরুন জানা হয়নি নাগিব মাহফুজের চিকন অক্ষরে লিখিত ভালোবাসা আর স্বপ্নের ভাষ্য। অবিরাম যুদ্ধ আরব বিশ্বকে নিঃস্ব করেছে। ধ্রুপদিরা নিঃস্বতাকে সম্বলে পরিণত করে নিজেদের অসীম উচ্চতায় আসীন করেন। থানি সেই ধ্রুপদিদেরই একজন হবেন—এই আশা রাখি।

রাহুল আনজুম: ইস্তাম্বুলে বসবাসরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন