বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানিরা যেমন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে দেশটাকে ৩০ বছর পিছিয়ে দিয়েছিল, নদীর পারে যাঁরা ব্যবসা করছেন, তাঁরাও মেধাশক্তি ধ্বংস করে দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে

সবাই জানি, করোনার সময় কী ভয়ানক অক্সিজেন–সংকটে ছিলাম। অথচ প্রকৃতি আমাদের অক্সিজেন গ্রহণের যত সুযোগ দিয়েছে, পৃথিবীর অনেক দেশেই সেটা নেই। কিন্তু ঢাকা শহরে ধুলাবালু ও গাড়ির কালো ধোঁয়ায় গাছগুলো বিবর্ণ হয়েছে। পাতায় ময়লার স্তর জমে অক্সিজেন প্রবাহ প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। এ জন্য শীতকালে আমাদের দেশে অনেক মানুষকে ইনহেলার নিতে হয়। আমার পরামর্শে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে।

ঢাকা শহরের চারপাশে যে পাঁচটি নদী, আমরা যখন স্কুলে পড়েছি, তখন এসব নদীর পানি মানুষ খেত। পরিমাণমতো ফিটকিরি দিলে নদীর পানি জীবাণুমুক্ত হয়। আমার পানির ট্যাংকে বাধ্যতামূলক প্রতিদিন একমুঠো ফিটকিরি দিই। ব্রিটিশ আমলে সাহেবরা পর্যন্ত নদীর পানি খেত। আমরা কেন প্রকৃতির এই অপার সম্পদ নষ্ট করলাম। এসব নদীর দুই পারের জমি কারও না। যার পেশিশক্তি আছে, সে দখল করে। এভাবে গড়ে উঠল শত শত শিল্পকারখানা। যার এটা রক্ষা করার দায়িত্ব, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেও এটার সঙ্গে জড়িত। নদীর দুই পারের কারখানার যত বর্জ্য সব নদীতে ফেলছে।

আমি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহসভাপতি। আমাদের আন্দোলনে বর্জ্য শোধনাগার মেশিন বসানো বাধ্যতামূলক করা হলো। ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকজন পুলিশ নিয়ে দেখলেন মেশিন চলছে। গণমাধ্যমে খবর হয় সব কারখানায় বর্জ্য শোধন যন্ত্র চালু আছে। কিন্তু আমরা জানি, কারখানার মালিকেরা এটা চালান না। পাইপ দিয়ে সব বর্জ্য নদীতে ফেলেন। তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট কেন চালু দেখেন? ঘটনা হলো বর্জ্য শোধনের কার্যকারিতা যাঁদের দেখার কথা, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আগেই জানিয়ে দেন আজ আপনার কারখানা তদারক করা হবে।

কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট এটি সহজেই ধরতে পারবেন, যদি তিনি ধরতে চান। এক ঘণ্টা মেশিন চালাবেন। এক মাসের ঘণ্টা দিয়ে গুণ করলে যে বিল হবে, সেটা আর তাঁর মাসিক বিদ্যুৎ বিল। মালিকের যেকোনো এক মাসের বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে তুলনা করলেই ধরতে পারবেন যে মেশিন চালু ছিল নাকি বন্ধ ছিল। দু-একজনকে এমন শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যেন অন্যরা এটা আর না করেন। চিরদিনের জন্য কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে।

যাঁরা সাজা দেবেন, তাঁরা প্রায়ই যুক্তি দেখান, কারখানা বন্ধ হলে ৫০০ থেকে ১০০০ মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। কিন্তু এর জন্য যে নদীর পারের লাখ লাখ মানুষের মেধা, স্বাস্থ্য, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এর ধারাবাহিকতায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে নানা অসুখে পড়ে তাঁদের মৃত্যু হবে; এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষতির মুখে পড়ছে—এসব নিয়ে তাঁরা ভাবছেন না। কোনটি লাভজনক—কারখানা টিকিয়ে রাখা নাকি জেনারেশন টিকিয়ে রাখা? যারা ভেজাল তৈরি করে, তারাও তো ভেজাল খায়। যারা এসব অন্যায় করছে, তারাও এর শিকার হচ্ছে।

আমি বারবার বলেছি ছয় মাসে নদী দূষণমুক্ত করা সম্ভব। যদি আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকে। বিদেশে সেমিনারে হাতিরঝিলকে উদাহরণ হিসেবে দেখাই। এটা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জায়গা ছিল। অল্প সময়ে অসাধারণ নান্দনিক দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। আমরা নয় মাসে দেশ স্বাধীন করেছি।

ঢাকাই হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র রাজধানী, যেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, প্রধান সেনাপতিসহ অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা থাকেন। সেই রাজধানীতে রাস্তায় লালবাতি জ্বললে ট্রাফিক পুলিশ বলে ‘যান’, সবুজ বাতি জ্বললে বলে ‘থামেন’। সিটি করপোরেশনকে এ সিগন্যাল বাতি ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। প্রতিদিন সকালে উঠে আমাকে আইন ভঙ্গ করতে হয়।

পাকিস্তানিরা যেমন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে দেশটাকে ৩০ বছর পিছিয়ে দিয়েছিল, নদীর পারে যাঁরা ব্যবসা করছেন, তাঁরাও মেধাশক্তি ধ্বংস করে দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটে নদীতে, সমুদ্রে। সেই কবে টাইটানিক ডুবেছে, এমন ঘটনা কী আর আছে। জলযান সবচেয়ে নিরাপদ ও কম খরচ। এখন কেউ নদীর খোঁজ নিচ্ছেন না। নদী যেন পতিত কিছু। একটি বিরাট অংশের ভাবনা হচ্ছে, নদীর জায়গাটা যদি জমি হতো, তাহলে অনেক কিছু করতে পারতাম।

ঢাকার পাশের নদীতে ওয়াটার বাস চালু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে সে প্রকল্প ব্যর্থ হলো। এটা ছিল একটা চরম পরিকল্পনাহীন প্রকল্প। কোথা দিয়ে চলবে, কীভাবে চলবে, কারা চালাবে কোনো কিছু তেমন গোছানো ছিল না। যেখানে বোট থামবে, সেখানের সঙ্গে প্রধান সড়কে যাওয়ার পথ আছে কি না, এর কোনো ব্যবস্থা নেই। তাহলে কীভাবে চলবে? বোট থেকে নেমে যদি কোথাও যাওয়ার পথ না থাকে, নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে কেন মানুষ বোটে উঠবে। প্রকল্প তো ব্যর্থ হবেই।

কোনো জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হলেন ডিসি, এসপি ও বিচারক। আমাদের ছোটবেলায় এসব ব্যক্তি তাঁদের পরিবার নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলায় থাকতেন। ফলে জেলার নিরাপত্তা, শিক্ষা, ও স্বাস্থ্য সব কিছু ভালো ছিল। এখন তাঁদের প্রায় সবার পরিবার ঢাকায় থাকে। এসব জেলার নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁদের তেমন ভাবনা নেই। এখন সব কিছু ঢাকায়। সবকিছুর হেড অফিস ঢাকায়।

বাংলাদেশের মানুষ আইন মানে না—এটা সবচেয়ে মিথ্যা কথা। জাহাঙ্গীর গেটের মধ্য দিয়ে সেনানিবাস এলাকায় ঢুকলে সবাই আইন মানে, বাইরে এলে মানে না। আমাদের এক কোটির বেশি মানুষ বিদেশে কাজ করেন। তাঁদের অধিকাংশ তেমন লেখাপড়া জানেন না। বিদেশে তাঁরা সব আইন মানছেন। দেশে এলেই মানছেন না। একবার একটা ফ্লাগস্ট্যান্ডওয়ালা গাড়ি সংগ্রহ করলাম। চালককে বললাম বাবা, কোথাও কোনো সিগন্যাল মানবা না। আইন ভঙ্গ করার জন্য কোথাও কোথাও ট্রাফিকের স্যালুট পেলাম। সাবেক ‍পুলিশ কমিশনারকে বললাম, গাড়িতে ফ্লাগস্ট্যান্ড বন্ধ করতে হবে। অনেক চেষ্টা করে তিনি বললেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এটি চান না। তাঁদের পরিবারের সবাই ফ্লাগস্ট্যান্ডওয়ালা গাড়িতে চড়েন।

এমন অবস্থা জেনেও আমি বলেছি ছয় মাস আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে নদী পরিষ্কার করা সম্ভব। নদীতে প্রথমে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। দুই মাসেই সব কারখানার বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা যায়। সবাই জানে কে কোথায় কীভাবে বর্জ্য ফেলছে। শিশু ছেলেমেয়েরা কীভাবে ট্রাফিক কন্ট্রোল করেছিল মনে আছে? এক নেতাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তারা রিকশায় পাঠিয়েছিল।

তাহলে আমাদের নদী পরিষ্কার করতে কয় দিন লাগবে? বারবার বলছি, চাইলেই এই নদীর অপূর্ব সৌন্দর্য দৃশ্যমান করা যায়।

মোবাশ্বের হোসেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন