নদী ডুকরে উঠলে মানুষ কোথায় যাবে

বিজ্ঞাপন
default-image

‘রাইতোত নদী খুব ডোকরে (ডুকরে ওঠা)। দূর থাকি মানুষ আসি হামাক কয়, এটে থাকতে ভয় নাগে না? হামরা কই, কোন্টে যামো? হামার যাওয়ার কোনো জাগা আছে?’ জেলেকা বেগম তিস্তা নদীর পাড়ে এই কথাগুলো বলছিলেন।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের একটি গ্রাম গাবুর হেলান। প্রতিবছর তিস্তা সেখানে হাজার হাজার মানুষের নিয়তিতে দুঃখতিলক এঁকে দেয়। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা প্রকৃতির কাছেই নিবেদন জানায়। কত মানুষ নদীর কাছে কতভাবে যে পরাস্ত হয়, তার কোনো অন্ত নেই। ভিটা-বাড়ি-জমি মুহূর্তেই নদী হয়ে যায়। কত সম্পদওয়ালা মানুষও যে মুহূর্তে নিঃস্ব হয়, তার পরিসংখ্যান নেই। কাল রাজা তো আজ ফকির। আজ রাজা তো কাল ফকির।

এক একর জমি ছিল নজির হোসেনের। তিস্তা নদী আজ থেকে ৩৫-৪০ বছর আগে সব গর্ভে নিয়ে নেয়। এরপর কোথায় উঠবেন, এমন কোনো ঠিকানা তাঁর ছিল না। নদীতীরবর্তী স্থানেই ঠাঁই হয়েছিল। এরপর আটবার বাড়ি ভেঙেছে তাঁদের। এখন তিস্তার হাঁ করা ঠোঁটের ওপর বাড়ি। এরই মধ্যে একটি ঘর খেয়েছে তিস্তা। তিস্তার পানি এসে ধাক্বা দিচ্ছে শোয়ার ঘরে। ওই বাড়ির রান্নাঘরে বসে কথা হয় নজির হোসেন ও জেলেকা বেগমের সঙ্গে।

আটবার বাড়ি ভাঙা নজির হোসেনদের পরিবারে এখন কোনো সম্পদ নেই। জেলেকা বেগম বলছিলেন, ‘বিয়ের আগে নদী অনেক দূরে ছিল। তাই বিয়ে করছি। না হলে এটে বিয়া করনোং না হয়।’ জেলেকা বেগম আরও বলছিলেন, গত মাঘ মাস থাকি এমরা (স্বামী) কোনো কাম কইরবার পায় না। কোমরের নিচখান অচল। খাবার নাই, থাকার ঘর নাই। কোন্টে যামো তার ঠিক নাই। রাইতের বেলা যখন নদী ডুকরি ওঠে, তখন নিন্দ আইসে না। রাইত জাগি পাহারা দেই, কখনবা বাড়িটা নদীত যায়। দিনের বেলা চোখ জ্বলে।’ এসব কথা বলার সময়ে জেলেকার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। দুই হাতে চোখের পানি মোছেন আর কথা বলেন সংসারের সীমাহীন কষ্টের কথা। জীবনের মানে এখানে যে কত ভঙ্গুর, কতটা হতাশাব্যঞ্জক, তার কোনো শেষ নেই। প্রতিবেশী রূপজন বেগম কথাগুলো শুনছিলেন। তিনিও মুখ খোলেন, এমরা (এরা) একখণ্ড মাটির উপরা বাঁচি আছে। ভাঙি গেইলে একেবারে ভাঙি যাইবে।’

ঈদে আগের দিন দুপুরে যখন সেখানে কথা হচ্ছিল, তখন দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি। তিস্তার এক পাড় থেকে অন্য প্রান্ত দেখায যায় না। কিন্তু আমরা সবাই জানি, এ নদীর অন্য পাড় আছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন, জেলেকার পরিবারের কষ্টের নদীর অন্য পাড় আছে কি না? যেখানে কিছুটা হলেও স্বস্তি আছে, শান্তি আছে, সুখ আছে।

জেলেকা বেগমই বলছিলেন, তাঁদের কেউ কোনো খবর নিতে আসে না। যে কজন আত্মীয় আছে, তারাও না। এলে যদি কিছু দিতে হয়, এই ভয়েই নাকি আসে না। জেলেকার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। এক বছরের বেশি হলো তাঁর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর আর ছেলে বাড়ি আসেননি। জেলেকা বেগম বলেন, ‘গত সেমাই ঈদোত আসছিল আর আইসে নাই। এক বছরের বেশি হইল।’ নজির হোসেন যুক্ত করেন, ‘কোনো মাসে বেটা টাকা দেয়, কোনো মাসে দেয় না। বেটার বউক এলাও দেখি নাই।’

জেলেকার মেয়ে আছে। বিয়ে হয়েছে। একমাত্র এই মেয়েই যাওয়া–আসা করেন। মেয়ের আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ। তাঁরাও নদীভাঙা। এই মাসাধিক কালে সরকার থেকে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন। বেসরকারিভাবে ৫ কেজি চাল পেয়েছেন। জেলেকা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কয় দিন আগে কাঁইবা বিস্কুট দেছে। হামাক বিস্কুট দেয় নাই। খোঁড়া মানুষ যাওয়ারও পায় নাই, বিস্কুটও দেয় নাই।’ ঈদ প্রসঙ্গে জোলেকাই বলেন,‘ঈদের দিন কিছু করার কোনো বুদ্ধি নাই। বাঁচি না মরি তারে ঠিক নাই, আর ঈদের কথা কন।’

কিছু পরিবারে ত্রাণ দেওয়ার কাজে গিয়েছিলাম। গাবুর হেলানের যে স্থানে কথা হচ্ছিল, সেখানেই একটি বাঁধ ভেঙে গেছে। বালুভর্তি বস্তা সেখান ফেলা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী কুক শারাফাত উল্লাহ নামের একজন তদারকি করছেন। সহকারী কুক হয়ে তিনি কেন তদারকি করছেন, এ কথা জানতে চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এরপরই আমরা গাবুর হেলান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তৈয়ব খাঁ যাই। এই পথের অবস্থা এতটাই খারাপ যে কোনো যানবাহনেই যাওয়া যাওয়া যায় না। হেঁটে যেতে হয়।

ত্রাণ নিতে আসা বাদশা মিয়া জানালেন, তাঁর আর কোনো কিছুই নাই, সব নদী খেয়েছে। যেটুকু পেরেছেন, সঙ্গে নিয়ে এসে স্কুল ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর কোথায় থাকবেন, তিনি জানেন না। তাঁর সঙ্গে পাঁচ সন্তানের চারজন আছে। ১৬ বছর বয়সে প্রথম মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।

তিন বছর আগে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক স্কুল নদীগর্ভে বিলীন হয়। কয়েকজন শিক্ষকের সুবিধার কথা ভেবে ওই স্কুল এখন চরাঞ্চল থেকে অনেক দূরের সমতলে নেওয়া হয়েছে। ফলে, বেশ কয়েকটি চরের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়তে পারছে না। নদীভাঙা মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেল।

সেখান থেকে ত্রাণ দিতে গিয়েছিলাম তিন-চার কিলোমিটার দূরের বুড়ির হাটে। সেখানে তিস্তার ওপরের ক্রসবাঁধ এবারে ভেঙে গেছে। ওই বাঁধের পাশে একটি মৃত গরু ভেসে যাচ্ছিল। স্থানীয় লোকজনের কাছে জানলাম, সেখানে আগের দিন একটি লাশ এবং তিন-চার দিন আগে আরও দুটি লাশ তাঁরা ভেসে যেতে দেখেছেন। তাঁদের কাছে মানুষের লাশ ভেসে যাওয়ার কথা শুনতে শুনতে নজির হোসের আর জেলেকা বেগমের মুখ আমার সামনে ভেসে উঠল। যদি হঠাৎ একখণ্ড মাটি ভেঙে নদীগর্ভে যায়, তাহলে ডুকরে ওঠা নদী থেকে কি নিজেদের বাঁচাতে পারবেন জেলেকা আর প্রতিবন্ধী নজির হোসেন?

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
wadudtuhin@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন