default-image

২৭ জানুয়ারি প্রায় ২০ লাখ ভোটারের বন্দরনগরীতে হয়ে গেল স্থানীয় সরকার নির্বাচন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এ নির্বাচনের ভালো দিকটি ছিল বিরোধী ও বৃহত্তর দল বিএনপির অংশগ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকা। কাজেই নির্বাচনটিকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায়, তবে প্রতিযোগিতামূলকের সংজ্ঞায় একে ফেলা যাবে না। এ নির্বাচনে মেয়র পদের ফলাফল নিয়ে কখনোই সন্দেহ ছিল না। বর্তমানে সরকারি দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার নিশ্চয়তা।

নির্বাচন কমিশনের মতে, নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হয়েছে। অথচ জাতীয় দৈনিকগুলোর বেশির ভাগের শিরোনামই ছিল এর বিপরীত। একটি নির্বাচনের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে কয়েকটি উপাদানের বিশ্লেষণ জরুরি। যেমন নির্বাচনী পূর্বাবস্থা, ভোট গ্রহণ ব্যবস্থাপনা, ভোটের দিনের পরিবেশ, ভোটার, বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি, ভোটের প্যাটার্ন এবং সর্বোপরি ভোট ও ভোট-পরবর্তী সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এসবের বিশ্লেষণ করে এককথায় বলা যায়, এ নির্বাচনের মান ছিল অত্যন্ত নিম্ন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ইতিহাসে এমন রক্তাক্ত অধ্যায় আগে ছিল না, মারা গেছেন দুজন আর গুরুতর আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক।

বিজ্ঞাপন

ভোটের দিন সকাল থেকেই পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আইনশৃঙ্খলা ও ভোট গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ, কেউ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে বলে মনে হয়নি। বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখা গেছে যে সকাল আটটা থেকেই তিনটি ওয়ার্ডে শুধু পাল্টাপাল্টি ধাওয়াই নয়, কোথাও কোথাও ত্রিমুখী সংঘর্ষ এবং গুলি ও ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি হয়েছে। এ অবস্থা কয়েক ঘণ্টা ধরে চললেও আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীকে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল ওই ওয়ার্ডগুলোর নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা। কিন্তু তা না করে তারা কয়েকটি কেন্দ্র মাত্র স্থগিত করে। এর প্রভাব শুধু ওই কয়টি ওয়ার্ডেই নয়, বরং সমগ্র নির্বাচনী এলাকার ওপরই পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা একেবারেই ভেঙে পড়ে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে ভোট প্রদানের পরিবেশ একেবারেই নষ্ট হয়েছিল। ফলে সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে নারী ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ বলে এসব এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছিল। ৭০০ কেন্দ্রের প্রায় ৪০০ কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের যাঁদের এত সংখ্যায় নিয়োগ করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, জানা যায়নি। এ অবস্থায় দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপরই বর্তায়।

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ৭৩৫টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ২টি কেন্দ্র স্থগিত, কাজেই ভোটে প্রভাব পড়েনি। এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। যে কয়টা ওয়ার্ডে গোলযোগ হয়, সেগুলোর সবই ঘনবসতি এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে। কাজেই ভোটাররা অবশ্যই নিরুৎসাহিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের হিসাবমতে, সর্বমোট ভোট পড়েছে ২২.৫১ শতাংশ। অতীতের তথ্য-উপাত্ত বলছে, চট্টগ্রামের নির্বাচন সব সময়ই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয় এবং গড়পড়তা ভোটের হার থাকে ৬৫ শতাংশ। সেখানে ২২ শতাংশ ভোট পড়ার হারই প্রমাণ করে চট্টগ্রামবাসী ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত বোধ করেননি। শুধু গোলযোগই এর একমাত্র কারণ নয়। কয়েকটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখা গেছে যে বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রের চৌহদ্দি এবং আশপাশ বহিরাগত ও স্থানীয় তরুণদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। নিজেদের তাঁরা শাসকদের অঙ্গসংগঠনের সদস্য বলে দাবি করেন। এসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেখা যায়নি। এসবই নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বে ছিল। তাদেরই দায়িত্ব ছিল একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান।

বিরোধী দলের সাংগঠনিক দুর্বলতারও সুযোগ নিয়েছে শাসক দল। যেখানে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ ছিল না, সেখানে তাদের আরও সংগঠিত হওয়া উচিত ছিল।

চট্টগ্রামের এ নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়ার যে ব্যাখ্যা কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব দিয়েছেন, তা হাস্যকর। তাঁর মতে, দেশ উন্নতির পথে, তাই মানুষ ভোটে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি আরও বলেন যে ভোটাররা মনে করেন, ভোট দিয়ে কী লাভ? একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০-এর নির্বাচনে ৫১.৩ শতাংশ ভোট প্রদত্ত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করতে চাই যে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ নির্বাচনে দারুণ সংক্রামক রোগের পরিস্থিতির মধ্যে এবং বরফের মধ্যে মোট ৫১.৩ শতাংশ ভোট প্রদত্ত হয়েছে। বাংলাদেশে ভোট প্রদান উৎসব। কাজেই এ ধরনের অজুহাত না দেওয়াই ভালো, যার প্রধান দায়িত্ব কমিশনের পক্ষে নির্বাচনী পরিবেশ ভোটার সহায়ক করা এবং ভোটের দিনে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা, তার এ ধরনের মন্তব্য কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রামের এ নির্বাচনের নেতিবাচক পরিস্থিতি নিজে বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে এ ধরনের সাফাই কতখানি গ্রহণযোগ্য? মাঝেমধ্যে কমিশনের কিছু কিছু মন্তব্য সব পক্ষকেই বিব্রত করে, এমনকি সরকারি দলকেও বিব্রত করে।

বিজ্ঞাপন

একজন কমিশনার অবশ্য অকপটে স্বীকার করেন, ‘চট্টগ্রামের নির্বাচন অনিয়মের মডেল’। তিনি যে মন্তব্য করেছেন, সমগ্র বিশ্লেষণ তা-ই বলে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় চট্টগ্রামের নির্বাচন সব সময়েই বেশ কঠিন। তারপরও ২০১০ সালের অভিজ্ঞতার আলোকে এ নির্বাচনকে বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছুক নই। করলে ওই নির্বাচনকে ১০ দিলে এ রক্তাক্ত, বিশৃঙ্খল আর জোর খাটানোর নির্বাচনকে ৪ দেওয়াও অনেক হবে।

অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে ভোটাররা সরকারি দলের প্রার্থীকেই হয়তো ভোট দিতেন। নির্বাচনটি হতে পারত বিতর্কহীন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি দলের প্রার্থীরা জনগণ, নিজেদের এবং সরকারের প্রচুর ভালো কাজের ওপর আস্থা রাখেন না। যে কারণে নির্বাচনগুলোতে এত অনিয়ম। অপরদিকে ভোটারদের প্রতি নির্বাচন কমিশনের যে দায়িত্ব ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সংবিধান তাদের যে ক্ষমতা দিয়েছে, তা হয়তো তারা উপলব্ধি করে না। নির্বাচন নিয়ে ক্রমাগত এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

hhintlbd@yahoo.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন