default-image

প্রথম আলো তার ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পরপর কয়েকটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। একটি ক্রোড়পত্রে ছিল করোনা মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দুর্বলতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নয়টি লেখা ও তিনটি সাক্ষাৎকার। জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটি ছিল সাক্ষাৎকার ও নিবন্ধগুলোর আলোচ্য বিষয়। এ বছর পৃথিবীর সব দেশই তার অন্য যে সমস্যাই থাকুক, স্বাস্থ্যসেবাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় কর্তব্য আর কিছু হতে পারে না।

করোনা মহামারির জন্য কোনো দেশই প্রস্তুত ছিল না, বাংলাদেশও নয়। তবে বাংলাদেশ দুই–আড়াই মাস সময় পেয়েছিল। প্রস্তুতির জন্য ওই সময়টিতে গাফিলতি করা হয়েছে। তারপর আকস্মিক ধাক্কা যখন এল, তখন শুরু হলো আসল কারবার। বিভিন্ন দেশ কোভিড-১৯ প্রতিরোধ এবং করোনা–আক্রান্ত রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত, আমাদের করোনা রোগীসেবকেরা মহামারিকালে এর থেকে কতটা সুবিধা হাতিয়ে নেওয়া যায়, তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। সমগ্র মানবজাতির জন্য যখন করোনা অভিশাপ, তখন আমাদের স্বাস্থ্যসেবকদের কারও কারও জন্য তা দেখা দিল আশীর্বাদ রূপে। পরীক্ষার জন্য মানুষ পাগলের মতো ছুটল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয়। পরীক্ষা করে দেওয়া হলো সার্টিফিকেট: পজিটিভকে নেগেটিভ এবং নেগেটিভকে পজিটিভ। সিপিসি অনুযায়ী এটা ফৌজদারি অপরাধ। হত্যাচেষ্টার সমতুল্য।

বিজ্ঞাপন

ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনোনীত প্রাইভেট হাসপাতাল কামিয়ে নিল কোটি কোটি টাকা। ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়েই বাঙালি বসে থাকতে পারে না, তার প্রধান আগ্রহ কেনাকাটা। তা সে কেনাকাটায় বালিশ হোক, পর্দা হোক বা মাস্ক হোক। একমাত্র বাংলাদেশেই দেখা গেল কোভিড-১৯ শুধু মানুষই মারে না, সে দুর্নীতিকেও উৎসাহিত করে। নিম্নমানের মাস্ক ও অন্যান্য উপকরণ দু–তিন গুণ বেশি দামে সরবরাহ করে শত শত কোটি টাকা লোপাট করা হলো কয়েক সপ্তাহে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে করোনা–বাণিজ্যের মতো মানবতাবিরোধী ব্যবসার ঘটনা ঘটেনি।

স্বাস্থ্য খাতে সরকার যে টাকা বরাদ্দ দেয়, তার পরিমাণ কম নয়। কেউ বলবে ১৭ কোটি মানুষের দেশ, এ আর বেশি টাকা কি? সবকিছু পাটিগণিতের অঙ্ক কষে হয় না। তবে একটা পুরোনো কথা আছে ‘যত গুড় তত মিঠা’। টাকা আরও বেশি বরাদ্দ দিলে তা খুশির কথা। বিশেষ করে টাকা যত বেশি, তত বেশি ইয়ে করা যায়। দেশে ছোট–বড় সরকারি হাসপাতাল–ক্লিনিক আড়াই হাজার। প্রাইভেট হাসপাতাল–ক্লিনিক ইত্যাদি সম্ভবত তার দ্বিগুণ বা তারও বেশি। মানুষের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কেন হয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল করোনা মহামারির মধ্যে।

রাজধানীর কয়েকটি বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতাল আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা দিয়ে থাকে। কিন্তু শুধু জেলা শহরগুলোতে নয়, গ্রামের হাটবাজারে পর্যন্ত যেসব ‘অত্যাধুনিক হাসপাতাল ও ক্লিনিক’ এবং ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ গড়ে উঠেছে, সেগুলোতে মানুষ ঠিকমতো চিকিৎসা পায় কি না, তা তদারকির কোনো কর্তৃপক্ষ আছে বলে মনে করার কারণ নেই। কার অনুমতি নিয়ে সেসব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তা মানুষ জানে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) যোগ দিয়েই ঘোষণা দিলেন, অমুক তারিখের মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক রেজিস্ট্রেশন না করলে অথবা নবায়ন না করলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে দুই মাস আগে। অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক রেজিস্ট্রেশন নবায়ন করেছে অথবা করার জন্য আবেদন করেছে, অধিকাংশই যথাপূর্ব চলছে। যে হাসপাতাল মানসিক রোগীকে পিটিয়ে মারে, তারও রেজিস্ট্রেশন নেই।

স্বাস্থ্য খাতে শুধু অবিশ্বাস্য দুর্নীতি নয়, চরম অব্যবস্থা ও অদক্ষতা চলে আসছে বহুদিন ধরে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। দুনিয়ার কোথাও যা নেই, তা আছে বাংলাদেশে: চিকিৎসকেরা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, অনেকেই প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের ক্যাডার। ডাক্তারদের একটি বড় অংশের মধ্যে পেশাগত নৈতিকতার অভাব। এই বৈরিতা যদি শান্তিপূর্ণভাবে মিটমাট না হয়, তাহলে স্বাস্থ্য খাত সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য শুধু হাসপাতালের সুন্দর অবকাঠামো, দামি যন্ত্রপাতি (বাংলাদেশে যা কিনে এনে ফেলে রাখা হয়), ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা যে সম্ভব নয়, তা করোনা মহামারির মধ্যে উন্নত দেশগুলোই উপলব্ধি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করায় চরম মূল্য দিয়েছে আমেরিকার জনগণ এবং নির্বাচনে ট্রাম্প স্বয়ং।

রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের গুরুত্ব নেই, রাষ্ট্রনেতারা নির্ভর করেন টেকনোক্র্যাটদের ওপর। রাষ্ট্রনেতা ও বিজ্ঞানী একেবারেই দুই জগতের মানুষ। জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন রাষ্ট্রনেতাদের লক্ষ্য। বিজ্ঞানীরা মানুষের কল্যাণে গবেষণা করেন, যাতে শুধু তাঁদের দেশের মানুষ নয়, সমগ্র মানবসমাজ উপকৃত হয়।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান, তাঁরা তাঁদের সহযোগী করেন আমলা ও টেকনোক্র্যাটদের। সমাজের বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের প্রয়োজন বোধ করেন না; বরং তাঁদের কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অধীন বা বশ করে রাখার মধ্যে তাঁদের আনন্দ। করোনার মধ্যে দেখা গেল, সবচেয়ে প্রয়োজন বিজ্ঞানীদের। বিপদের সময় এগিয়ে এলেন অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড, এমআইটির বিজ্ঞানীরা শুধু নন; বহু দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। টিকা আবিষ্কার টেকনোক্র্যাটদের কাজ নয়।

বিজ্ঞাপন

আমাদের মতো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে সুষ্ঠু গবেষণার পরিবেশ অনুকূল নয়। একই কক্ষে দুই ভিন্ন দলের সমর্থক দুই বিজ্ঞানী হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করবেন, সে আশা করা দুরাশা মাত্র। কোনো গবেষণায় যদি তাঁরা সফল হন, কৃতিত্ব কে নেবেন? কৃতিত্ব ভাগাভাগিতে বাঙালি অভ্যস্ত নয়।

বিজ্ঞানীদের শুধু মৌখিক মর্যাদা দিয়ে কোনো লাভ নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দরকার। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারের একার পক্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ সম্ভব নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমাদের শিল্প এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আগ্রহ একেবারেই কম। ইউরোপের দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে অনেক পরে, প্রথম তারা এগিয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।

করোনা মহামারির বিপদের মধ্যে রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনেতাদের উপলব্ধিতে পরিবর্তন আনার সুযোগ হয়েছে। বিজ্ঞানীদের বাদ দিয়ে প্রণীত উন্নয়ন পরিকল্পনায় শেষরক্ষা হবে না। করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর কোনো জীবাণু যদি দেখা দেয়, তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ বিজ্ঞানীদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। আমাদের নেতাদেরও বিষয়টি এখনই ভাবতে হবে।


সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

মন্তব্য পড়ুন 0