আমি দুই মহাদেশ জোড়া লাগানো বসফরাস ব্রিজ দেখেছি, টেমসের ওপর টাওয়ার ব্রিজ দেখেছি, নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ব্রুকলিন ব্রিজে উঠেছি। এসব ব্রিজের তাৎপর্য, ঐতিহ্য ও অভিঘাত অতুলনীয়। কিন্তু এগুলো একটাও আমার দেশের নয়। পদ্মা সেতু আমাদের, আমাদের মানুষের টাকায় নির্মিত, আমাদের দেশের ভেতরের কিছু, হৃদয়েরও তাই। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশাল ও অপূর্ব নির্মাণশৈলী। এই সেতুর সামনে এলে আর মনে থাকে না এর নির্মাণব্যয়, সময়ক্ষেপণ এবং রাজনৈতিক মালিকানাকেন্দ্রিক বিতর্কের কথা। শুধু মনে হয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস আর অর্জনের এক অনন্য বার্তা।

এই সেতুর উদ্বোধন হবে কাল। রাজধানীর সঙ্গে গোটা দক্ষিণবঙ্গের মেলবন্ধন করেছে এই সেতু। মোংলা, পায়রা বন্দর আরও সচল হবে, বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর আরও কর্মচঞ্চল হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি আর সমাজজীবনে বিপুল মাত্রা যোগ করবে এই সেতু। বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের জন্য এটি তাই আনন্দসংবাদ। কিন্তু আমাদের রাজনীতির ভাষায় আনন্দের এই ঐক্যের ছাপ নেই। এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে যে পদ্মা সেতুরও আছে শত্রু-মিত্র, এই সেতুর আনন্দে তাই অংশীদার নয় শত্রুপক্ষ। আসলে কি তাই?

২.

পদ্মা সেতুর আসলে কোনো শত্রু নেই। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি অর্থায়নে এই সেতুর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি হয় ১৯৯৮-৯৯ সালে। এরপর ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি এই সেতুর পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে নানাভাবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সেতুর চারটি সম্ভাব্য রুটের মধ্যে মাওয়া-জাজিরা রুটকে চূড়ান্ত করা, এর ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা। জাইকার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সম্পন্ন এসব কাজের ওপর রিপোর্ট তখনকার পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়। বিডিনিউজের ২০০৫ সালের ১৫ মের সংবাদ অনুসারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর কাজ অবিলম্বে শুরু হবে বলে ঘোষণা দেন। ২০০৬ সালে তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে জমির অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও নেওয়া হয়।

বিএনপি তাহলে এই সেতুর বিরোধী হয় কীভাবে? আমার মনে পড়ে, তখনকার সময় খুব সম্ভবত পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ দিয়ে এই সেতু নির্মাণের জন্য আন্দোলন হয়েছিল। মাওয়া-জাজিরা দিয়ে পদ্মা সেতু হলে ঐতিহ্যভাবে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত অঞ্চলগুলোর লোক বেশি সুবিধা পাবেন এই যুক্তি তখন দেওয়া হয়েছিল। তারপরও সবচেয়ে ভালো রুট হিসেবে একেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল বিএনপির আমলে।

পরে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে এই সেতু নির্মাণকাজটি শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক এই সেতুর জন্য ঋণ বাতিল করলে পরের মাসেই সব প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এই ব্রিজ নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি সেতু নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

পদ্মা সেতু আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অক্ষয় মেলবন্ধন তৈরি করেছে। এই মেলবন্ধন বাংলাদেশের রাজনীতি আর সমাজে সম্ভব না হয়তো। কিন্তু এই সেতু চালু হওয়ার আনন্দে শামিল হতে পারি আমরা সবাই। তাদের নেত্রীকে নিয়ে কটু কথা বলার কারণে পদ্মা সেতুর অনুষ্ঠান বর্জন করেছে বিএনপি। আশা করব তারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে এবং পদ্মা সেতুর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দিত করবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি অসাধারণ স্মারক। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগে এই সেতু নির্মাণের ঋণ বাতিল করে দিলে অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী ও ব্যাংকও সরে পড়ে। যঁাকে নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার থেকে সেই যোগাযোগমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, সংশ্লিষ্ট সচিবকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে। এ নিয়ে সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের নেতারা। এই সমালোচনা অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে, এর মধ্যে বাড়াবাড়ি এমনকি বিদ্বেষও থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ঠিক আগের বিএনপি আমলেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে আওয়ামী লীগ তো বটেই, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও বিএনপি সরকারের কঠোর সমালোচনায় বিন্দুমাত্র পিছপা হতো না।

আওয়ামী আমলে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির প্রসঙ্গে সমালোচনায় তাই নতুন কিছু ছিল না। তবে মূল কথা হচ্ছে, এসব সমালোচনার একটিও পদ্মা সেতুর নির্মাণের বিরোধিতা ছিল না। বাংলাদেশে কোনো দিন কেউ বলেনি, পদ্মা সেতু নির্মাণ করা উচিত নয় বা এটি করা ঠিক হবে না। দুর্নীতির অভিযোগের কারণে যে সমালোচনা, সেই কারণে এই সেতুর কেউ তাই প্রতিপক্ষ হয়ে যেতে পারেন না।

অতীতে যমুনা সেতু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন আওয়ামী লীগ সারা দেশে হরতাল ডেকেছিল। এই আওয়ামী লীগই পরে সেতুটির অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করেছিল, এটির উদ্বোধন করে বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরণ করেছিল। যমুনা সেতু হোক, পদ্মা সেতু হোক, অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়সাপেক্ষ নির্মাণকাজ বিভিন্ন আমলে কমবেশি অব্যাহত থেকেছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর প্রদান করে এ ধরনের যেকোনো নির্মাণের অর্থ জুগিয়েছে সব স্তরের জনগণ, শুধু আওয়ামী লীগ বা শুধু বিএনপির লোকজন নয়। অন্য সব সেতুর মতোই তাই পদ্মা সেতুও বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের, প্রতিটি দল ও মহলের।

৩.

পদ্মা সেতু নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কিছু মনঃকষ্ট থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংক সরে আসার পর সরকারকে অভিযুক্ত করে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, বিশেষ করে সরকার আদৌ এটি সম্পন্ন করতে পারবে কি না, এ নিয়ে যে সন্দেহ বা উপহাস করা হয়েছিল, তাতে বাড়াবাড়ি থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ বন্ধ হওয়ার পেছনে কারও হাত থাকলে সরকারকে তা ক্ষুব্ধও করতে পারে। কিন্তু সত্যি কারও হাত আছে কি না, এর কোনো তদন্ত না করে শুধু আন্দাজে অভিযোগ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় একটি সরকারের জন্য।

সরকারের কাছে বরং অনুরোধ, পদ্মা সেতুর আনন্দে সবাইকে শামিল করুন। এর অংশীদারত্ব, মালিকানা ও উদ্‌যাপনের আনন্দ থেকে বাংলাদেশের একটি মানুষকেও নাকচ করা থেকে বিরত থাকুন।

৪.

পদ্মা সেতু আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অক্ষয় মেলবন্ধন তৈরি করেছে। এই মেলবন্ধন বাংলাদেশের রাজনীতি আর সমাজে সম্ভব না হয়তো। কিন্তু এই সেতু চালু হওয়ার আনন্দে শামিল হতে পারি আমরা সবাই। তাদের নেত্রীকে নিয়ে কটু কথা বলার কারণে পদ্মা সেতুর অনুষ্ঠান বর্জন করেছে বিএনপি। আশা করব তারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে এবং পদ্মা সেতুর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দিত করবে। প্রধানমন্ত্রী ২৫ জুন বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষকে এই সেতুর মালিক ও অংশীদার হিসেবে ঘোষণা করবেন। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমাদের ফেসবুকের টাইমলাইনে থাকবে সেতু উদ্বোধনক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর আনন্দিত মুখ।

এই আনন্দের পাশাপাশি আমরা সবাই মিলে তৎপর থাকব দেশের বানভাসিতে বিপন্ন মানুষের সাহায্যে। দুর্যোগে, উদ্‌যাপনে, অর্জনে যেন একসঙ্গে থাকি আমরা দেশের সব মানুষ।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন