>
default-image
উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথমআলো। আজ প্রকাশ করা হলো নবম নিবন্ধটি।

অনেক বিলম্ব এবং প্রকল্প ব্যয় সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানের প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো যে আদৌ পদ্মা সেতু প্রকল্পটি সামাজিক ও আর্থিক বিবেচনায় লাভজনক কি না। কেননা, বাংলাদেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে এমন অনেক বিকল্প পরিবহন প্রকল্প এবং অন্যান্য অনেক প্রস্তাব রয়েছে। ‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ’ প্রকল্প এ দেশকে আরও উন্নত করার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা খোঁজার উদ্দেশ্যে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে থেকে সেগুলোর সমাধান পরীক্ষা করে দেখে। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার ও ব্র্যাকের যৌথ অংশীদারত্বের এই প্রকল্প বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ডজন খানেক অর্থনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়েছে যে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন প্রচেষ্টার পেছনে ব্যয়িত প্রতি টাকায় কীভাবে সর্বোচ্চ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, সে বিষয়ে গবেষণা করার জন্য।

বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বজলুল খন্দকারের নতুন গবেষণায় দেখা যায়, বাজেটের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পদ্মা সেতু প্রকল্পটি এখনো খরচের তুলনায় লাভজনক। সেতুর জন্য ব্যয়িত প্রতি টাকা প্রায় দুই টাকা সমমূল্যের সামাজিক কল্যাণ সাধন করতে পারে।

২০১০ সালে বাংলাদেশের সেতু কর্তৃপক্ষ বিশ্বব্যাংক থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সুদূরপ্রসারী সুযোগ-সুবিধার মূল্যায়ন করে। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে প্রকল্পটি আর্থিকভাবে লাভজনক হবে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার পর এই প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক তাদের সমর্থন সরিয়ে নেয়। এতে প্রকল্পটি বাধাগ্রস্ত হয় এবং এর নির্মাণের সময়সীমা ২০১৫ থেকে ২০১৮ করা হয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সর্বমোট খরচ বেড়ে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০০৭ সালের প্রাথমিক সম্ভাব্য খরচ ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকার প্রায় তিন গুণ।

‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ’ সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে কত খরচ হতে পারে এবং এ থেকে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে, তার একটি হিসাব বের করে। এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ খরচ বৃদ্ধির জন্য মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মূল্যহ্রাস দায়ী। এবং খরচ বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক বিবেচনায় পদ্মা সেতু এখনো লাভজনক। নদীপথের ওপর দিয়ে সড়ক ও রেল পরিবহন নির্মাণের উপকারিতা তিনটি ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। গাড়ি চালানোর খরচ কমে আসে, সময়ের সাশ্রয় হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে জিডিপি বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে নদী পার করার জন্য গাড়িচালকদের বিকল্প পথে দীর্ঘ ও ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। একবার সেতু তৈরি হয়ে গেলে গাড়ি চালানোর খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। সেই সঙ্গে ভ্রমণের সময় যে পরিমাণ বাঁচবে, তা পুরো প্রকল্পের মোট সুফলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বলে বিবেচিত হবে। সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার ৩১ বছরের মধ্যে এ দুই উৎস থেকে রাস্তা ব্যবহারকারীদের সামগ্রিক সুবিধার সম্ভাব্য পরিমাণ হবে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদেরা অনুমান করেন যে তিন দশকের মধ্যে সেতুটি প্রতিদিন ৭৫ হাজার যান চলাচলের জন্য পূর্ণ ধারণক্ষমতায় পৌঁছাতে পারবে। সেই যানবাহনের এক-তৃতীয়াংশ হবে ট্রাক, যেগুলো পণ্য বহন করবে ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে জোরদার করবে। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী মাহমুদুর রহমান ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মো. তারিকুর রহমানের গবেষণায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে যানবাহন চুক্তিগুলো থেকে প্রাপ্য সম্ভাব্য সুবিধাগুলো পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।

বাংলাদেশ এবং এর প্রতিবেশী দেশগুলো অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অস্বাভাবিক যানজট ও পরিবহন অবকাঠামোয় ত্রুটি এই অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। এখন ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে উত্তম সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর একটি সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে প্রায়ই একটি সীমান্তে পৌঁছানোর পর তাদের পণ্য খালাস করতে হয়, যেন অপর পাশের অন্য আরেকটি ট্রাকে পুনরায় পণ্য বোঝাই করা যায়। এটি ব্যয়বহুল ও সরবরাহের দিক থেকে অকার্যকর এবং এ থেকে ঘুষ লেনদেনের আশঙ্কা তৈরি হয়।

এসব কারণে নয়াদিল্লি থেকে একটি ২০ ফুট লম্বা রেল কনটেইনারের ঢাকায় পৌঁছাতে ছয় সপ্তাহের বেশি সময় লাগে। এবং এতে খরচ পড়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে রাস্তা মোটেও সহজ নয়—কনটেইনারটির প্রথমে অবশ্যই নয়াদিল্লি ছেড়ে মুম্বাইয়ের সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে হবে, সেখান থেকে জাহাজে করে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে যাবে। সবশেষে কনটেইনারটি রেলপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছাবে। যদি ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সরাসরি রেলযোগাযোগ থাকত, তাহলে সেই একই কনটেইনারের উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন সময় লাগত এবং মাত্র এক-তৃতীয়াংশ খরচে।

পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি প্রণয়ন ও আন্তসীমান্ত পরিবহন অবকাঠামোর উন্নতি, বাংলাদেশের জন্য প্রতিবছর আনুমানিক ২ শতাংশ হারে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী যান চলাচল বৃদ্ধি করবে। পরিবহন প্রকল্প ও বাণিজ্য চুক্তির সঠিক প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে এই প্রচেষ্টার পেছনে ব্যয়িত প্রতি টাকার বিপরীতে ২-২ দশমিক ৫ টাকার সুফল পাওয়া যাবে।

দেশের সমৃদ্ধিতে সহায়তা করতে আপনি কোন পরিবহন কৌশলগুলো বাছাই করবেন? <https://copenhagen. fbapp. io/transportationinfrastructure>-এর আলোচনায় যোগ দিন, যেখানে আপনি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আরও অন্যান্য উপায় সম্পর্কে পড়তে পারবেন। যেহেতু আমরা অনবরত এ দেশের সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির উপায় খুঁজে চলেছি, তাই আমরা আপনার মতামতও জানতে চাই।

. বিয়র্ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0