default-image

কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে না; মূলত প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধের মতো অ-অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর ওপরও নির্ভর করে। রাজনৈতিক ব্যবস্থা অর্থনৈতিক বিকাশের গতি ও দিকনির্দেশনায় মৌলিক ভূমিকা পালন করে।

দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে বিনিয়োগে সহায়তা করে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে নাগরিকেরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে খুব একটা উৎসাহিত হয় না, যেহেতু তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িত থাকে।

তবে উন্নয়নশীল বিশ্বে নাগরিকেরা অনেক আর্থসামাজিক সমস্যার মধ্যে থাকে। তারা সমস্যার সমাধানের জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক রাজনৈতিক দল এবং উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। তারা ধর্মঘট, বিক্ষোভ, অবরোধ ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের দাবিদাওয়া উপস্থাপন করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টির পাশাপাশি পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াকে অচল করে দিতে পারে।

পাকিস্তানসহ এই উপমহাদেশের দেশগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ খুব সাধারণ ঘটনা। পাকিস্তানে ধর্মঘট, বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি ইত্যাদির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ধর্মঘট, বিক্ষোভের অধিকারকে সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো আদায়ের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে দাবি উত্থাপনের সুযোগ দেয়। তবে এসব কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে স্থবির করে দেয় এবং প্রায়ই সহিংসতা উসকে দিয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পদত্যাগের দাবিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আজাদি মার্চ গত ২৭ অক্টোবর শুরু হয়েছে। করাচি থেকে শুরু হয়ে এই মিছিল গত বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে প্রবেশ করে। বেনজির ভুট্টোর পিপিপি ও মুসলিম লিগ, মুসলিম লিগসহ (নওয়াজ) বেশ কয়েকটি দল এই মার্চে যোগ দিয়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকে ‘আজাদি মার্চ’-এর গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে কি?

‘দ্য ইকোনমিক কস্ট অব জেনারেল স্ট্রাইকস ইন নেপাল’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো এক বছরে সাধারণ ধর্মঘটের প্রত্যক্ষ ক্ষতি নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছিল এবং এ কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। অন্য একটি সমীক্ষা দেখায় যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের কারণে পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম গড়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।

বিক্ষোভের ফলে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, রপ্তানি কমে যায়, নিরাপত্তার জন্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে যায়, পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং পরিবহন খাত রাজস্ব হারায়। পাকিস্তানের শ্রমশক্তির দুই-তৃতীয়াংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছে। বিক্ষোভ, ধর্মঘটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এরা একটা পর্যায়ে বেকার হয়ে যায়। ধর্মঘট-বিক্ষোভে প্রতিবছর জিডিপির ২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। এই প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি দেশের সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়ের তুলনায় তিন গুণ বেশি (জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে)। এই পরিমাণ অর্থ যদি দরিদ্র লোকজনের জন্য বিনিয়োগ করা যায়, তবে পাকিস্তান সহজেই দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিরসন করতে পারে।

পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যেখানে উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি কোনোভাবে এ দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়, তবে মানবসম্পদ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তা অল্প সময়ের মধ্যে দেশের চেহারাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। তাই পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ধর্মঘট, অবস্থান কর্মসূচি, আন্দোলন না করে এমন কোনো বিকল্প খুঁজে বের করা, যা দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে।

দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
নাসির ইকবাল: পাকিস্তানের বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রামের গবেষণা পরিচালক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0