default-image

রাজবাড়ি সড়কের একটি মুদিদোকানে দেখা হয়ে গেল যশেশ্বর চাকমার সঙ্গে। ৫৫ বছর বয়সী এই সাদামাটা গৃহস্থ ধরনের মানুষটিকে দেখে কে বলবে এককালে দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন যশেশ্বর! কে বলবে দুর্গম পাহাড়-অরণ্যের অন্ধকারে কেটেছে তাঁর তারুণ্যের দিনগুলো। ২২ বছর আগে অস্ত্র সমর্পণ করে ফিরে এসেছিলেন স্বাভাবিক জীবনে। এখন এই দোকান, ব্যবসা আর সংসারের ব্যস্ততার মধ্যে বৃত্তবন্দী হয়ে পড়েছেন তিনি। খুব বেশি চাওয়া-পাওয়াও নেই। জানতে চেয়েছিলাম, ‘২২ বছর আগে যে স্বপ্ন নিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন, সেই স্বপ্ন কতটা পূর্ণ হয়েছে?’

সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘আমরা চাই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হোক।’ বুঝলাম কথাবার্তার ব্যাপারে এখন অনেক সংযত ও সতর্ক এককালের বেপরোয়া তরুণটি।

শুধু যশেশ্বর নন, রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো পার্বত্য চুক্তির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যাপারে কথা বলার ক্ষেত্রে কেউই তেমন খোলামেলা নন, বরং অনেকটা কূটনীতিসুলভ উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যেতে চান বিষয়টা। আর যাঁরা মুখ খুলেছেন, তাঁদের মধ্যেও পাওয়া গেল মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

ভেদভেদী এলাকার ব্যবসায়ী জ্ঞানপ্রিয় চাকমা (৪৫) বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তির সুফল তো আছেই। আগে পাহাড়িরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত না, পথেঘাটে তল্লাশি করা হতো। এখন লেখাপড়া করতে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য করা এগুলো অনেক সহজ হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের একজন কর্মকর্তা অনেক অসংগতির কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তির পর একটা বাধা সরে গেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চিন্তার বহুমুখিনতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা-ব্যবসা-কৃষিসহ আর্থসামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।’ জেলা পরিষদের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘১৯৯৭ সালের আগে বেইন টেক্সটাইল নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমি পাহাড়িদের তেমন ব্যবসায়িক উদ্যোগ দেখতে পাইনি, এখন অনেকেই এ ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন। এই ব্যাপারগুলো অবশ্যই ইতিবাচক। তবে...।’

এই ‘তবে’ শব্দটির সঙ্গে কিছু দ্বিধা-সংশয় ও সন্দেহ-অবিশ্বাস যেন জড়িয়ে আছে। জানতে চাইলাম, ‘তবে কী?’

কর্মকর্তা বলেন, পার্বত্য চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি যেটা, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন জেলা পরিষদ—এগুলোকে কার্যকর না করলে এই চুক্তির প্রকৃত সুফল কিন্তু পাওয়া যাবে না। তাঁর এই কথারই প্রতিধ্বনি যেন শোনা গেল পার্বত্য নাগরিক কমিটির সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানের কণ্ঠে। তিনি আফসোস করে বলেন, চুক্তির পর ২২ বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু এখনো পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও তিনটি জেলা পরিষদে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলো না। নির্বাচন না হওয়ায় আঞ্চলিক পরিষদে বছরের পর বছর জনসংহতি সমিতির লোকজন এবং জেলা পরিষদগুলোতে সরকারের পছন্দের ব্যক্তিরা আছেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে জবাবদিহির সৃষ্টি হয় না এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও থাকে না।

চুক্তি অনুযায়ী ভূমি, বন ও পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা প্রভৃতি বিভাগকে জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়া হয়নি উল্লেখ করে গৌতম দেওয়ান বলেন, এখন সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে এটা বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু চুক্তিতেই তো আছে প্রয়োজনে আইনের সংশোধন, সংযোজন-বিয়োজন করা হবে।

পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন জেলা পরিষদে ২২ বছরেও নির্বাচন না হওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। নির্বাচন না হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা একটি সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়ন করতে না পারা। পার্বত্য চুক্তিতে উল্লেখ আছে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা করতে হবে। এই স্থানীয় বাসিন্দা কারা—তা নিয়েও আছে বিভ্রান্তি। চুক্তি অনুযায়ী এখানকার বাসিন্দা উপজাতীয় ও অউপজাতীয় উভয়েই ভোটার হতে পারবেন। তবে যাঁরা উপজাতীয় নন, তাঁদের ক্ষেত্রে বৈধ জায়গা-জমি, বসতির নির্দিষ্ট ঠিকানা—এই ব্যাপারগুলো দেখতে হবে। এই হিসাবে ১৯৭৮ সালের পর যাঁদের অন্য অঞ্চল থেকে এনে এখানে পুনর্বাসন করা হয়েছে, তাঁরা ভোটার হতে পারেন না। কিন্তু ৪০ বছরেরও বেশি সময় এ অঞ্চলে যাঁরা বাস করছেন, তাঁদের পক্ষেও এখানকার বাঙালি সংগঠনগুলো সোচ্চার, সব মিলিয়ে নানাভাবে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।

একদিকে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় একধরনের অপ্রাপ্তির বোধ আছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে, আবার অন্যদিকে আঞ্চলিক দলগুলো বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে যেভাবে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে নতুন করে অশনিসংকেত যেন পাচ্ছে তারা। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাবেই।

১৯৯৮ সালে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) থেকে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেছিল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। পার্বত্য চুক্তিতে পাহাড়িদের স্বার্থরক্ষা হয়নি দাবি করে চুক্তির বিরোধিতা করেছিল তারা। ২০০৯ সালে আরও একদফা ভাঙনের মুখে পড়ে সন্তু লারমার দল। জেএসএস (এমএন লারমা) নামে পৃথক একটি দল গড়ে ওঠে। এদিকে ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে এসে একটি অংশ গড়ে তোলে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক। এরপর এই দল–উপদলগুলোর মধ্যে শুরু হয় সংঘাত। গত ছয় বছরে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পরস্পরবিরোধী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই শতাধিক কর্মী-সমর্থক।

এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের কারণ নিয়ে দুই রকম বক্তব্য আছে। কেউ মনে করেন এই সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধ-বিভেদ জিইয়ে রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায় কোনো কোনো মহল। অন্য পক্ষের ধারণা, এই দলগুলোর চাঁদাবাজি এখন রাখঢাকহীন একটি বিষয়। চাঁদাবাজির এলাকা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েই তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত। আবার উভয় কারণই সমানভাবে ক্রিয়াশীল মনে করেন, এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

গত ২৭ নভেম্বর রাঙামাটি সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেছেন, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধান হবে না।

উল্টো দিক থেকে রাঙামাটির সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেছেন, ‘২২ বছরেও পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন হলো না, এটা নিয়ে আমাদেরও অতৃপ্তি আছে। কিন্তু এর জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। চুক্তির অধিকাংশ ধারাই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে পাহাড়ে সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে চুক্তি বাস্তবায়নে গতি নেই।’ স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একটি অংশ চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে না বলে দীপংকর তালুকদার উল্লেখ করেন।

২২ বছর আগে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান হয়েছিল। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে তার একটি সরাসরি প্রভাবও লক্ষ করা গিয়েছিল। কিন্তু দিন যতই গড়িয়েছে আশা-নিরাশার এক দোদুল্যমানতার মধ্যে দুলেছে পাহাড়িদের ভাগ্য। একদিকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন, অভ্যন্তরীণ শরণার্থীদের জন্য টাস্কফোর্স, পার্বত্য অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাদের মনে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি জোগায়, অন্যদিকে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী দুই পক্ষের পরস্পরের প্রতি আস্থার অভাব, সন্দেহ-অবিশ্বাস ইত্যাদি হতাশার সৃষ্টি করে। অস্ত্র, রক্ত ও অশ্রুর দিনগুলো পেরিয়ে এসে যখন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল এ অঞ্চলের মানুষ, তখন সশস্ত্র উপদলীয় কোন্দল আবার ভীতিকর অতীতকে ফিরিয়ে আনছে তাদের সামনে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্য-পাহাড়-লোকালয়ে ধ্বনিত হচ্ছে একটাই প্রশ্ন—শান্তি কত দূর?

বিশ্বজিৎ চৌধুরী: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক
bishwabd@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0