পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়

বিজ্ঞাপন
default-image

একদিকে করোনাভাইরাসের থাবা, অন্যদিকে কর্মহীন মানুষের আহাজারি। এর মধ্যে ধেয়ে আসছে আরেক উপদ্রব—বন্যা। কয়েক দিন ধরে উত্তরের জনপদে বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, তিস্তার জল বইছে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাষা হলো টেকনিক্যাল। নদীর জল বিপৎসীমার ১০ কিংবা ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে গেলে তাতে আশপাশের মানুষের কী যায় আসে? মানুষের জানা দরকার, তার খেতের ফসল তলিয়ে যাবে কি না। ভিটায় পানি উঠবে কি না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের দেশের প্রতিটি গ্রাম, এমনকি জমির প্রতিটি প্লটের অবস্থান জানা যায়। এ–সম্পর্কিত ম্যাপও আছে। একটি নদীর জলের প্রবাহ বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেলে আশপাশের কোনো গ্রামে কিংবা শহরে কতটুকু জল উঠবে, তা–ও বিস্তারিতভাবে বলে দেওয়া যায়। আমরা কিন্তু সে রকমটি দেখতে পাই না। অপ্রস্তুত মানুষের ঘরবাড়ি হঠাৎ করেই জলমগ্ন হয়। তারপর শুরু হয় কর্তব্যরত ব্যক্তিদের হই-হুল্লোড়। একদিকে মানুষের ভোগান্তি, অন্যদিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে ত্রাণ বণ্টনের প্রচার শাড়ি, লুঙ্গি, বিস্কুট ইত্যাদি। বছরের পর বছর এ দৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ একটা বদ্বীপ। হিমালয় থেকে নেমে আসা জলের সঙ্গে পলি জমে জমে তৈরি হয়েছে এ দেশের একটি বিশাল অংশ। এটি এখনো নিচু। এটাকে তাই বলা হয় প্লাবনভূমি। বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টি হয়। ওই সময় হিমালয়ে গলে বরফ। দুইয়ে মিলে নদীতে জলের প্রবাহ বাড়ে। হঠাৎ করে বেশি জল এলে নদী তা ধরে রাখতে পারে না। দুকূল ছাপিয়ে পানি উপচে পড়ে। ডুবিয়ে দেয় প্লাবনভূমি। বদ্বীপ অঞ্চলে এটা অতি স্বাভাবিক। এটা প্রকৃতি থেকে পাওয়া।

দেশটা ছোট। প্লাবনভূমির যে অংশটি বরাদ্দ থাকার কথা শুধু জলের জন্য, সেখানে হানা দিয়েছে মানুষ। বসতি গড়েছে, চাষবাস করছে। হঠাৎ বেশি পানি এলে তারা পড়ে যায় বিপদে। এটাই বন্যা; মানুষ ভাবে, পানি, তুই এলি কেন? পানি ভাবে, মানুষ আমার জায়গায় তোর তো থাকার কথা নয়? পানিপ্রবাহের জন্য যা স্বাভাবিক, মানুষের কাছে তা উপদ্রব।

১৯৫৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। পূর্ব বাংলায় ফি বছর বন্যা হয়। মানুষের অনেক কষ্ট। তিনি ধরনা দিলেন জাতিসংঘের কাছে। অবস্থা সরেজমিনে দেখার জন্য জাতিসংঘ একটা টেকনিক্যাল মিশন পাঠাল। মিশনের নেতা জে এ ক্রুগ। তাঁরা ঘুরেফিরে দেখলেন। ১৯৫৭ সালে তাঁরা জমা দিলেন একটা প্রতিবেদন। সেখানে নানান সুপারিশ। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

 (ক) কাপ্তাই ড্যাম ও কুষ্টিয়ার গঙ্গা-কপোতাক্ষ বহুমুখী প্রকল্প তাড়াতাড়ি শেষ করা।

 (খ) ওয়ার্কস প্রোগ্রামের অধীনে ছোট ছোট বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানিনিষ্কাশন প্রকল্প হাতে নেওয়া।

 (গ) ভূতান্ত্রিক, আবহাওয়া ও পানিসম্পদ–সম্পর্কিত সব ধরনের জরিপ চালানো এবং এ ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে তথ্যের লেনদেন।

 (ঘ) ড্রেজিং ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো।

 (ঙ) পরিকল্পিত বন্যা এলাকা ফ্লাড জোন রাখা, যেখানে কোনো বসতি বা স্থাপনা থাকবে না।

 (চ) এসব কাজের জন্য মেধাবী লোকদের নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

ক্রুগ মিশনের সুপারিশে ‘ইরিগেশন ডিপার্টমেন্ট’ ভেঙে ১৯৫৬ সালে তৈরি হলো ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ওয়াপদা)। বাহাত্তরে পানি ও বিদ্যুৎ আলাদা হলো। বাংলাদেশ পানিসম্পদ তথা বন্যা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তখন থেকেই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাতে। পরবর্তী সব কর্মকাণ্ড চলেছে ক্রুগ মিশনের পরামর্শ বাস্তবায়নের পরম্পরা থেকে। তার সর্বশেষ সংযোজন হলো বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, যেখানে ২১০০ সাল পর্যন্ত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি রূপকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। ক্রুগ মিশনের প্রতিবেদনে একটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের সব নদীই আন্তর্জাতিক। সীমানার বাইরে এসব নদীর পানি বেড়ে যায়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে পাকিস্তান, ভারত এবং সংশ্লিষ্ট অন্য দেশগুলো এ বিষয়ে একযোগে এবং কার্যকরভাবে উদ্যোগ নেবে। বড় নদীগুলো থেকে উপকার পেতে হলে তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কয়েক দশক ধরে একটা কথা প্রায়ই শোনা গেছে, নদীকে নদীর মতো থাকতে দাও, কোনো বাঁধ দেওয়া যাবে না। মুশকিল হলো যাঁরা এসব বলেন, তাঁরা কেউ গ্রামে থাকেন না। ঘরের মধ্যে মাচা বেঁধে গরু–ছাগল, হাঁস-মুরগি, চাল-ডাল-চুলা নিয়ে ঘরবন্দী থাকতে হয় না তাঁদের। গ্রামের গেরস্তের ভিটা ডুবে যাওয়া মানে তঁার সর্বস্ব চলে যাওয়া। আমরা ফসলি জমি নিয়ে আক্ষেপ করি। ভিটাবাড়ির অর্থনৈতিক গুরুত্ব হিসাব করি না। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, সবজিখেত, ফলের গাছ, পুকুর-এসবের গুরুত্ব গেরস্তের জীবনে অনেক। বন্যায় সব তলিয়ে গেলে গেরস্ত একবারেই পথে বসে যান। কীভাবে তাঁকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে? তাঁকে তো বলা যাচ্ছে না, তুমি বড় শহরে এসে অ্যাপার্টমেন্টে থাকো?

এটা ঠিক যে আমাদের দেশে পানি ব্যবস্থাপনার অনেক ত্রুটি। অনেক অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। তাতে লাভের চেয়ে লোকসান হয়েছে বেশি। আবার ভালো কাজও হয়েছে অনেক। এই যে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ল কয়েক গুণ, তা এমনি এমনি হয়নি। হয়েছে কৃষকের শ্রম, কৃষিবিজ্ঞানীর গবেষণা এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মিলিত চেষ্টায়।

আমাদের দেশের আয়তন দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের মতো। এ অঞ্চলের তিনটি বড় নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র আর মেঘনা অববাহিকার মোট আয়তন ১৫ লাখ ৩৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। আমাদের দেশের প্রায় ১০ গুণ। এই নদীগুলো দিয়ে যে পরিমাণ জল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়, তা যদি ধরে রাখা যেত, তাহলে বাংলাদেশ থাকত ৩৫ ফুট জলের নিচে। প্রায় সবটা জল গড়ায় চাঁদপুর হয়ে মেঘনা দিয়ে। বন্যা হবে না তো কী হবে?

এখন উত্তর থেকে আর পলি আসে না, আসে বালু। নদীর পেটে মাটি আর বালু জমে চড়া পড়ে গেছে। পানি ধারণের ক্ষমতা গেছে কমে। এ ক্ষেত্রে ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই। সর্বশেষ ডেল্টা প্ল্যানে ড্রেজিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কর্তাদের নজর নদী খনন থেকে ড্রেজার কেনাকাটায় বেশি। এ নিয়ে নেপথ্যে অনেক কাণ্ড-কারখানা চলছে। আমাদের যে পরিমাণ ড্রেজিং দরকার এবং তা করতে হবে নিয়মিত, প্রতিবছর, সে জন্য এ দেশে ড্রেজার তৈরির কারখানা থাকা উচিত। কিন্তু সেদিকে কারও মন নেই। আমদানি করলে পকেট ভারী হয়।

বর্ষা মৌসুম সবে শুরু। এখন যে বন্যার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, তা নিতান্তই স্থানীয় বা আঞ্চলিক। একসঙ্গে সব বড় নদীর পানি না বাড়লে বড়সড় বন্যা হবে না। আসাম-মেঘালয়ে কী পরিমাণ বৃষ্টি হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বন্যার সম্ভাবনা থাকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তবে সব বন্যা বন্যা নয়। ঢাকায় কোমরসমান জল হওয়ার কারণ জলাবদ্ধতা। এটি অন্য জিনিস। এর জন্য প্রকৃতি দায়ী নয়। দায় হলো মানুষের—সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা আর তাদের ঠিকাদারদের।

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন