মতামত

কোভিড-১৯ মহামারি: পুরোনো দুনিয়া আর নেই

বিজ্ঞাপন
default-image

কোভিড-১৯–এর ডেকে নিয়ে আসা সংকট কেবল জনস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমিত নয়। তা কেবল নয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিস্ময়কর অযোগ্যতা ও অদূরদর্শিতার বিষয়। চিন্তার সংকট কিংবা নেতৃত্বের বা কৌশলগত পরিকল্পনার কিংবা বৈশ্বিক সহযোগিতার অভাব দিয়েই একে বোঝা যাবে না। করোনা–পরবর্তী সময়ের প্রধান ঘটনা কেবল অর্থনৈতিক মন্দাতেই সীমিত নয়। আমরা এখন যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, তার গোড়ায় রয়েছে অর্থ ও সংজ্ঞার সংকট।

পাশ্চাত্যে আমরা অনেক দিন ধরে চামড়ায় বাঁধানো একটা অভিধান ব্যবহার করে আসছি। এটা সংকলিত হয়েছিল সোভিয়েত বলয় ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার শীতল যুদ্ধের পরে। এখন আমাদের সেই অভিধানে আগুন ধরে গেছে। তড়িঘড়ি করে যতটুকু পারা যায়, ততটুকু বাঁচাতে আমরা ছুটে গেছি। কিন্তু ইতিমধ্যে সূচির অনেক পৃষ্ঠা পুড়ে গেছে। হঠাৎ করে আমরা বুঝতে পারলাম, এটায় আর চলছে না। আমাদের মৌলিক ধারণাগুলো নতুন করে চেনা আর সংজ্ঞায়িত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যেমন কাকে বলে গণতন্ত্র? আমরা ভেবেছিলাম এর উত্তর আমরা জানি। এর অর্থ আমরা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত এখন আর তা বলা যাবে না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিকতা কাকে বলে? কাকে বলে সুখ? কোন কোন মূল্যবোধ সামনে রেখে আমরা এগিয়ে যাব: উচ্চাভিলাষী বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো, আর্থিক খাতের উদারীকরণ, পরিবেশ ধ্বংসকারী ও প্রাণিজগতের সহাবস্থান নষ্টকারী মুনাফামুখী ব্যবসার মডেল? নাকি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাত, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি, আমাদের প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য অনুকূল আদান–প্রদান এবং বৃহত্তর উদ্দেশ্যমুখী ব্যবসা অর্থাৎ যাতে লাভের পাশাপাশি বৃহত্তর মানবকল্যাণ হয়; সেসবের দিকে যাব?

আমরা একটা সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছি। আগের দুনিয়া আর নেই। দলবাজি থেকে শুরু করে সাংবাদিকতার ওপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণ, যুক্তরাষ্ট্রের অধঃপতন ও অবক্ষয় উদ্বেগজনক। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ‘কেন্দ্র’ ও ‘প্রান্তের’ ফারাক সবার সামনে খোলা হয়ে পড়েছে। ইতালির দিকে নজর ফেলুন। অতিমারির আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছে দেশটি। সেই অবস্থায় তারা দেখেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসের এলিটেরা তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। এরই অভিঘাতে দেশটিতে হুজুগে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটবে বলে ভয় আছে। চীনও অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারি মোকাবিলার ব্যর্থতা থেকে যদি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বায়নের উল্টো যাত্রা চলে, তাহলে চীনের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পুরোনো দুনিয়া বিদায় নিয়েছে। অথচ আমরা এখনো জানি না ভবিষ্যতে কেমন নতুন দুনিয়া আমরা চাই। এটা এক অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় ভরপুর সময়। এমন অবস্থা উসকানিমূলক গণবক্তাদের বাগাড়ম্বর আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির উর্বর মৌসুম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের সামনে এখন দুটি পথ, আর বেছে নিতে হবে কোনো একটা। একদিকে রয়েছে জাতীয়তাবাদ, সংরক্ষণবাদ—‘আমরাই সেরা’ এমন মনোভাব। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, হাঙ্গেরি, ব্রাজিল, ভারত ও ফিলিপাইনে এ মনোভাবের লোকেরা করোনাজনিত বিপর্যয়কে তাদের ক্ষমতা অটুট করায় কাজে লাগাচ্ছে। তারা নাগরিক সমাজের টুঁটি চিপে ধরছে আর পা বাড়াচ্ছে বিচ্ছিন্নতার দিকে। অন্যদিকে রয়েছে আরেকটি পথ। এ পথ গেছে আগামীর সম্ভাব্য মহামারি মোকাবিলা থেকে শুরু করে জলবায়ুজনিত জরুরি অবস্থা, সাইবার-সন্ত্রাসবাদ ঠেকানো থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তির অন্ধকার দিক সামলানোর মতো প্রধান প্রধান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার দিকে। ভুল পথ বেছে নিলে শুধু আজকের আমরাই ভুগব না, আগামীর অনেক প্রজন্মকে তার দায় শুধতে হবে।

ব্রিটেনের নিউ স্টেটসম্যান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।

এলিফ শাফাক: তুর্কি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নারী লেখক। দ্য ফর্টি রুলস অব লাভসহ অনেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উপন্যাসের রচয়িতা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন