অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে সরকার সর্বশেষ বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করেছে। নতুন বেতনকাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন আকর্ষণীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এর অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে, একটি সহজ ও আকর্ষণীয় পেনশন–ব্যবস্থা প্রবর্তন। একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর সর্বশেষ বেতনের ৯০ শতাংশ পেনশন বা অবসর ভাতা হিসেবে পাচ্ছেন। এই ৯০ শতাংশ অর্থের ৫০ শতাংশ প্রতি ১ টাকায় ২৩০ টাকা হিসাবে এককালীন এবং ৫০ শতাংশ জীবিত অবস্থায় নিজে এবং পেনশনারের অবর্তমানে তাঁর স্ত্রী/স্বামী বা পোষ্যরা পাচ্ছেন। এ ব্যবস্থার ফলে একজন সরকারি চাকরিজীবী অবসরকালে সচ্ছল ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন।

>বর্তমানে পেনশনের আওতা অনেক বৃদ্ধি করে সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য সব স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিকেও পেনশনযোগ্য করা হয়েছে। এভাবে পেনশনের ক্ষেত্রে একটি সমতার নীতি অনুসৃত হচ্ছে

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থমন্ত্রীর আরও একটি মানবিক সিদ্ধান্ত পেনশনধারীদের উপকৃত করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকান্তরে (আলোকিত বাংলাদেশ, ০৬.০১.২০১৭) জানা গেছে, আগে পেনশনের শতভাগ অর্থ নগদ উত্তোলনকারী কোনো পেনশনার যদি সত্তরোর্ধ্ব বয়সী হয়ে থাকেন, তিনি ইচ্ছা করলে পুনরায় পেনশন–ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করতে পারবেন। অর্থাৎ মাসে মাসে তাঁর সর্বশেষ বেতনের প্রাপ্য অংশের নগদ পেনশন-সুবিধা পেতে পারবেন। এ ব্যবস্থার অধীনে কতসংখ্যক লোক উপকৃত হবেন এবং সরকারের মাসে কত টাকা ব্যয় হবে, তারও একটি হিসাব মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রকাশ, দেশে পেনশন-সুবিধার আওতায় ছয় লাখ পেনশনার রয়েছেন। তাঁদের মাত্র ৫ শতাংশ সত্তরোর্ধ্ব বয়সের। বর্তমান শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীকে পুনরায় নগদ মাসিক পেনশনের অন্তর্ভুক্ত করলে তাতে সরকারি কোষাগার থেকে মাসে দুই-তিন কোটি টাকার অধিক অর্থ ব্যয় হবে না। অর্থ মন্ত্রণালয় ‘শতভাগ সমর্পণকারী পেনশনার্স ফোরাম’-এর দাবি বিবেচনা করে এ মানবিক সিদ্ধান্তটি নিয়েছে।
বর্তমান বেতনকাঠামোর আওতায় সৃষ্ট পেনশন–ব্যবস্থা সুষম ও মানবিক ব্যবস্থা হিসেবে একটি সুসংহত রূপ ও কাঠামো পেয়ে গেছে। কিন্তু অতীতে, বিশেষত ১০-১৫ বছর আগে চাকরিকাল শেষ করে বর্তমানে অবসরে আছেন এবং বার্ধক্যের নানা অসুবিধার মধ্যে জীবন যাপন করছেন, তাঁদের অবস্থাটি পুনর্বিবেচনার কিছু অবকাশ আছে এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যালোচনা করাও প্রয়োজন। তাই সত্তরোর্ধ্ব ফোরামের দাবি বিবেচনার সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিকভাবে বিষয়টি দেখার আবেদন করে কিছু বাস্তব বিষয় সরকারের বিবেচনার জন্য তুলে ধরছি।
বর্তমানে পেনশনের আওতা অনেক বৃদ্ধি করে সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য সব স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিকেও পেনশনযোগ্য করা হয়েছে। এভাবে পেনশনের ক্ষেত্রে একটি সমতার নীতি অনুসৃত হচ্ছে। অতীতে তা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহের বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুয়িটি স্কিমের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁরা অবসর গ্রহণকালে এককালীন যা পেয়েছেন, অনেক ব্যাংকে বা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সে অর্থে কায়ক্লেশে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমান ব্যাংকসহ সর্বত্র সুদের হার হ্রাস করায় তাঁরা বর্তমান বাজারে নানামুখী অসুবিধার সম্মুখীন। তাই পেনশন বা অবসর-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছু মানবিকতা ও ন্যায্যতার সঙ্গে ইতিপূর্বে এককালীন সুবিধা নিয়ে যাঁরা অবসরে আছেন, জীবিতকালে তাঁদের একটি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করছি। তাঁদের জীবিতকালে ‘চিকিৎসা ভাতা’ এবং ‘উৎসব ভাতা’ দেওয়ার বিধান করা যেতে পারে।
বর্তমানে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী বয়সনির্বিশেষে এ সুবিধা পেয়ে থাকেন। আগে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুয়িটি স্কিমের আওতায় যাঁরা চাকরিজীবন শেষ করেছেন, তাঁদের একই সুবিধা দিলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ এতে ব্যয় হবে না। কিন্তু পেনশনধারীদের মধ্যে ন্যায্যতার ও সমতার নীতি প্রতিষ্ঠায় এটি একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করবে।
দ্বিতীয় যে আবেদনটি করতে চাই তা হচ্ছে, সত্তরোর্ধ্ব বয়সীদের পেনশন প্রতিস্থাপনের যে সিদ্ধান্তটি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনা করে ওই বয়সসীমা পঁয়ষট্টি বছরে নির্ধারণ করা হোক। এতেও পেনশনারের সংখ্যার খুব বড় বৃদ্ধি ঘটবে না। কারণ, তাঁদেরও সুদের হার হ্রাস হওয়া, বাজারমূল্য বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবায় অনেক বর্ধিত ব্যয় করতে হয়। তাই সত্তর ও পঁয়ষট্টির ব্যবধানটি খুব বড় নয়। একবার চালু হলে প্রতিবছরই এ ক্যাটাগরির পেনশনারের সংখ্যা ক্রমে কমে আসবে। হয়তো ১০-১৫ বছরের ব্যবধানে তা শূন্যে নেমে আসবে। বিধানটি সংশোধন করে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীকে পেনশন–ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন বা পুনর্বহালের বয়সসীমা পঁয়ষট্টি বছরে নামিয়ে আনার সুপারিশ করছি।
তৃতীয় যে বিষয়টি আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ করব তা হচ্ছে, দীর্ঘ মেয়াদে আয়কর–ব্যবস্থার সঙ্গে পেনশন–ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপন করা। দেশে বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত আয়কর প্রদান করে থাকেন। তাঁরা তাঁদের প্রদত্ত আয়করের বিনিময়ে দৃশ্যমান কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। আগামী অর্থবছরে আয়করদাতাদের আয়করের একটি অংশকে ‘পেনশন কনট্রিবিউশন’ হিসেবে গণ্য করে বাষট্টি বছর বয়স অতিক্রমকারী সব নাগরিককে পেনশন–ব্যবস্থার আওতাভুক্ত করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
এ ব্যবস্থা জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তাকৌশলের জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আগামী অর্থবছর (২০১৭-১৮) থেকে বিগত ১০ বছর যাঁরা নিয়মিত আয়কর দিয়ে এসেছেন এবং বয়সসীমা বাষট্টি বছর অতিক্রম করেছেন, সেসব আয়কর প্রদানকারীকে জাতীয় পেনশন–ব্যবস্থার আওতাভুক্ত করার একটি নীতি কার্যকর করা যেতে পারে। এ পেনশন প্যাকেজে তাঁদের জন্য স্বাস্থ্যসুবিধা বা ভাতা, উৎসব ভাতা এবং মাসিক নগদ পেনশন যুক্ত করে একটি প্যাকেজ ঘোষণা করা যেতে পারে। এ ব্যবস্থা আমাদের সংবিধান-নির্দেশিত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ধারণার বাস্তবায়ন এবং আয়কর–ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ এবং সহ–আহ্বায়ক, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা ফোরাম।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন