default-image

১৯৭১ সালে এপির পক্ষে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সুযোগ এল। সারা দেশ জ্বলছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা। আমি জানতে পারলাম, ঢাকা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এক গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা চালিয়েছে। একটি গাড়ি নিয়ে আমি দ্রুত ছুটে চললাম ঘটনাস্থলে। সঙ্গে আমার ড্রাইভার। রাস্তা প্রায় জনশূন্য। দূর থেকে দেখলাম গ্রামটি জ্বলছে আর কালো ধোঁয়া আকাশ ছেয়ে দিয়েছে। মূল সড়ক থেকে এই দৃশ্যস্থল প্রায় এক মাইল দূরে। ধানের খেতের মধ্যখানে মাটির উঁচু আল সেখানে যাওয়ার একমাত্র পথ।

আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম এবং ধোঁয়াচ্ছন্ন গ্রামের দিকে দ্রুত পা বাড়ালাম। ওই আলে দাঁড়িয়েই দেখলাম, পাকিস্তানি সৈন্যের একটি দল ওই গ্রাম থেকে হেঁটে আসছে। তাদের হাতে রয়েছে রেডিও, বিছানাপত্র, ঘড়ি এবং ঘরের সামগ্রী। আমার বুঝতে কষ্ট হলো না, এগুলো ওরা ওই গ্রাম থেকে লুট করে নিয়েছে। আমি দ্রুত তাদের এড়িয়ে হাঁটতে থাকলাম। কারণ ভয় ছিল, আমাকে দেখে ফেললে হয়তো ওই গ্রামে যেতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তারা আমাকে লক্ষ করতে পারল না। গ্রামটিকে তারা তছনছ করে দিয়েছে।

জীর্ণ কুটির পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনোটা ক্ষতবিক্ষত। ঘরের নানা সামগ্রী মাটিতে পড়ে আছে। আমি একজনকে দেখতে পেলাম একটি কুটিরের দরজার মুখে তিনি পড়ে আছেন। মারাত্মক জখমের চিহ্ন সারা শরীরে। আমি হাঁটু গেড়ে তাঁর কাছে নিচু হলাম। দেখলাম একজন মহিলা তাঁকে ধরে আছেন। ছবি তোলা থেকে আমি নিজেকে নিবৃত্ত করলাম। মহিলা ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি আহত মানুষটিকে সামনের দিকে এগিয়ে দিলেন, যাতে আমি ভালোভাবে তাঁর ছবি তুলতে পারি। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। হয়তো এটা আমার অনধিকারচর্চা। আমি তাঁর ছবি তুললাম এবং দ্রুত গাড়িতে ফিরে এলাম, যাতে ঢাকায় ফিরেই সচিত্র প্রতিবেদন পাঠাতে পারি।

এক নিঃশ্বাসে ওপরের কথাগুলো বললেন প্রবীণ মার্কিন সাংবাদিক আরনল্ড জিটলিন। এপিতে দায়িত্ব পালন করেছেন কখনো সংবাদদাতা হিসেবে আবার কখনো ব্যুরোপ্রধান হিসেবে। সাংবাদিকতায় নৈতিকতা এবং অনুসন্ধানী রিপোর্টিং প্রসঙ্গে আরনল্ড কথা বলেন। তখনকার ওই ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি কি ওই দিন ঠিক কাজটি করেছিলাম? নাকি আমার ওই আহত লোকটির শুশ্রূষার জন্য কিছু করা উচিত ছিল?

বিজ্ঞাপন

এই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর জীবনসায়াহ্নে আজও সেদিনের ঘটনাটি আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি বোধ হয় ঠিক কাজ করিনি। আপনি হলে কী করতেন?’ জানতে চান আরনল্ড। তাঁর কষ্ট ছিল অন্তরছোঁয়া। জবাবে বললাম, পেশাগত দায়িত্বের বিবেচনায় আপনি সেদিন ঠিক কাজটিই করেছিলেন। ওখানে ওই আহত ব্যক্তির জন্য আপনার করার সুযোগ ছিল কম। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে দ্রুত সংবাদ পাঠানো ছিল আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সংবাদ বিশ্ববাসী জানতে পেরে একটা ধারণা লাভ করতে পেরেছে যে পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপরে কী ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে। আরনল্ড তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুড়ি থেকে আরেকটি কাহিনি তুলে ধরলেন।কেভিন কার্টারের প্রসঙ্গ টানলেন আরনল্ড। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বলতে শুরু করলেন:

কেভিন কার্টার (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-২৭ জুলাই ১৯৯৪) ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার একজন ফটোসাংবাদিক। সুদানে ১৯৯৩-এর দুর্ভিক্ষের ওপর ছবি তোলার জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি নিজের জীবন নিজেই কেড়ে নেন। পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির নাম ‘শকুন এবং ছোট্ট মেয়েটি’। এই ছবিটি ‘লড়াইরত মেয়েটি’ নামেও পরিচিত। বিখ্যাত এই ছবি প্রথমে ১৯৯৩-এর ২৬ মার্চ ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত হয়। এটি ছিল সর্বনাশা দুর্ভিক্ষের সময়ের ছবি। প্রথমে এই বালককে একটি কন্যাশিশু ভাবা হয়েছিল। সে এক দীর্ঘ গ্রীবাবিশিষ্ট শকুনের সামনে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ে। আর অদূরে দণ্ডায়মান শকুনটি তার দিকে শ্যেনদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল। সুদানের আয়োদে প্রায় আধা মাইল দূরে জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তাকেন্দ্র। এই কেন্দ্রে খাবার সংগ্রহের জন্য যাওয়ার চেষ্টা করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই এলাকা এখন দক্ষিণ সুদান বলে পরিচিত। এটা ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। ১৯৯৪ সালে ফিচার ফটোগ্রাফি শ্রেণিতে ছবিটি পুলিৎজার পুরস্কার পায়। এই পুরস্কার পাওয়ার ৪ মাস পর কেভিন আত্মহত্যা করেন। ছবি তোলার পর তিনি শকুনটিকে তাড়িয়ে দিয়ে জাতিসংঘের ত্রাণ বিমানে এলাকা ছেড়ে চলে যান।

ছবিটি ছাপা হওয়ার পর জনপ্রতিক্রিয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়ে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’, বিশেষ করে তারা বাচ্চার অবস্থা জানতে চেয়ে অনেক প্রশ্ন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সালের ৩০ মার্চ বিশেষ সম্পাদকীয় ছাপা হয়। অনেকে বাচ্চাটির পরিণতি জানতে চায়। তবে সে জাতিসংঘের ত্রাণকেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছিল কি না, তা অজানাই থেকে যায়।

১৯৯৪ সালের ২৭ জুলাই কেভিন কার্টার একটি খেলার মাঠ এবং পাঠাগারের কাছে পার্কমোর এলাকায় যান। এখানে তিনি শৈশবে খেলা করতেন। এই জায়গাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন নিজের জীবন নিজের হাতে শেষ করার স্থান হিসেবে। তিনি গাড়ি পরিষ্কার করার পানির নলের একটা দিক তাঁর পিকআপ ভ্যানের এগজস্ট পাইপের সঙ্গে টেপ দিয়ে বেঁধে দেন এবং অন্য প্রান্ত চালকের দিকের জানালার দিকে তাক করে রাখেন। আর এভাবে এই গাড়ি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষাক্ত গ্যাসে আত্মহত্যা করেন; তাঁর আত্মহননের সংক্ষিপ্ত বিবরণে তিনি লেখেন:

‘আমি সত্যি সত্যি মর্মাহত। জীবনের ব্যথা আনন্দের সীমানাকে ছাপিয়ে আমাকে এমনভাবে গ্রাস করছে যে সেখানে আমি আনন্দের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাই না...। হতাশা শুধুই হতাশা... ফোন নেই...ঘরভাড়া দেওয়ার টাকা নেই। অসহায় শিশুর সাহায্যে এগিয়ে আসার অর্থ নেই...ঋণ শোধের অর্থ নেই...অর্থ অর্থ অর্থ!!! আমাকে একটা দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে...হত্যাযজ্ঞ...লাশ আর লাশ। ক্রোধ...ব্যথা-বেদনা...ক্ষুধার্ত শিশুর যন্ত্রণা...আহত শিশুর কষ্ট...আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কখনো কখনো পুলিশ, হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ডদাতা...।’

এ পর্যন্ত বলে বিরাম টানলেন আরনল্ড জিটলিন। তারপর আবার শুরু করে বলেন, ‘নাইজেরিয়ার ঘটনা। রক্তগরম এক তরুণ লেফটেন্যান্ট। তিনি বেসামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে গুলি করে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন, ওই ব্যক্তি বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর এক সদস্য। বেসামরিক পোশাকের ছদ্মবেশে পালিয়ে যাচ্ছেন। নাইজেরীয় সেনাবাহিনীর এই তরুণ লেফটেন্যান্টের ভাগ্য ছিল খারাপ। তিনি যখন গুলি করে ওই লোকটিকে হত্যা করেন, তখন সে দৃশ্য ব্রিটিশ আইটিএনের একটি ক্যামেরা ক্রু দল ক্যামেরায় বন্দী করে। আইটিএন দ্রুত এই গুলির দৃশ্য বিশ্বব্যাপী প্রচার করে। এই দৃশ্য বিদ্রোহীদের জন্য শাপেবর হয়। তারা বিশ্বব্যাপী এই কথা প্রচার করতে থাকে যে নাইজেরিয়ার সরকার বিদ্রোহীদের দমনের নামে দেশে গণহত্যা শুরু করেছে।

‘এ ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের খবর যেসব বিদেশি সাংবাদিক সংগ্রহ করতেন তাঁদের একটি নির্জন খোলা মাঠে আনা হয়। সেখানে সেই লেফটেন্যান্টকে কয়েকজন সৈন্য টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসে। সেই লেফটেন্যান্ট তখন ছিল অচেতন, নিসাড়। স্বভাবতই তাঁকে মাদক দিয়ে অচেতন করা হয়েছে। তাঁকে এনে একটি গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়।

গাছের সামনে বন্দুক হাতে একটি ফায়ারিং স্কোয়াড গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে তাঁর অপরাধ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এই তরুণ সেনা কর্মকর্তা বেসামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন। সে জন্য তাঁর বিচার হয়েছে সামরিক আদালতে। এখন এই বিচারের রায় অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে।” সাংবাদিকেরা ফায়ারিং স্কোয়াডের দুদিকে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন।’ এ পর্যন্ত বলে আরনল্ড একটু দম নিলেন।

বিজ্ঞাপন

স্মৃতির পাতায় চোখ বুলিয়ে আবার বলতে থাকলেন, ‘আমি ফায়ারিং স্কোয়াডের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হাতে নিক্কন ক্যামেরা তুলে নিলাম। উদ্দেশ্য, ফায়ারিংয়ের মুহূর্তটিকে ছবিতে ধারণ করা। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁর হাত তুললেন। সৈন্যরা রাইফেল তাক করলেন। ‘প্রস্তুত...লক্ষ্য ঠিক করুন...’ তিনি নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বিবিসির সংবাদদাতা নিচের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। দেখলেন, তাঁর প্লাগ ক্যামেরা থেকে আলাদা হয়ে গেছে। তিনি নিজের অজান্তেই চিৎকার করে বললেন, “একটু অপেক্ষা করুন...।” ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁর আদেশ বাক্য শেষ করলেন না। বিবিসির সংবাদদাতা প্লাগটি ঠিক করে লাগালেন। বললেন, ‘এবার ঠিক আছে।’ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গর্জে উঠলেন, ‘‘ফায়ার!’’মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। লেফটেন্যান্টের অচেতন দেহটা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। কিন্তু তখনো মৃতদেহটা গাছের সঙ্গে বাঁধা।’

আরনল্ড এবার আমার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘বিবিসির ওই সংবাদদাতার এই প্লাগ লাগানোর কাহিনি কি আপনি রিপোর্টে উল্লেখ করতেন? নাকি এটিকে নিছক কারিগরি ত্রুটি হিসেবে উপেক্ষা করে নিতেন?’ তাৎক্ষণিকভাবে আমি কোনো জবাব দিতে পারলাম না। আরনল্ড তাঁর ভারী কণ্ঠে চমৎকার ইংরেজিতে বললেন, ‘আমার কাছে এটি একটি জীবনের পরিহাস বলে মনে হয়েছে। যে কারণে আমি আমার রিপোর্টে উল্লেখ করেছি। কারণ, এই লেফটেন্যান্ট যে লোকটিকে মারছিলেন সেটি ঘটনাচক্রে ব্রিটিশ ইলেকট্রনিক মিডিয়া ধারণ করে। আর সে কারণেই তাঁকে এই পরিণতির দিকে যেতে হয়। ভাগ্যের কী পরিহাস, সেই পরিণতি আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যামেরায় ধারণ করা হয় বিশ্ববাসীকে দেখানোর জন্য। এপি এই দিকটি রিপোর্টে উল্লেখ করার পরের দিন বিবিসি থেকে ওই সংবাদদাতাকে তিরস্কার করা হয়। বলা হয়, “আপনার এই আচরণের ফলে পাঠকদের মনে এই ধারণার জন্ম হয়েছে যে বিবিসি সম্ভবত এই ফায়ারিংয়ের নেপথ্যে কাজ করেছে।’’


সিরাজুল ইসলাম কাদির রয়টার্সের সাবেক ব্যুরোপ্রধান এবং বর্তমানে আমেরিকান চেম্বার্স জার্নালের নির্বাহী সম্পাদক
serajulquadir26879@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0