default-image

মনে পড়ে মস্কোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সভেতলানার তাৎপর্যপূর্ণ একটি ভবিষ্যদ্বাণী। প্রায় ৪০ বছর আগের কথা। ১৯৮৩ সাল। তিনি ক্লাসে সেদিন বলেছিলেন, একুশ শতকে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিস্থাপিত হবে এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরা পোশাকশিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। নারী কর্মীরাই হবেন তৈরি পোশাকশিল্প খাতের প্রাণ।

বাংলাদেশের কয়েকজন তরুণ সেখানে উচ্চশিক্ষার কয়েকটি কোর্সে পড়তে গিয়েছিলেন। আমরা একটু অবাক হলাম। তখন কিন্তু দেশে তৈরি পোশাক খাত বা চলতি ভাষায় পোশাকশিল্পের কথা আমরা তেমন শুনিনি। প্রশ্ন করলাম, কীভাবে? আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীরা তো শুধু সন্তান পালন আর চুলা ঠেলতেই জীবন পার করে দেন। তাঁদের তেমন লেখাপড়াও নেই। তাহলে?

বিজ্ঞাপন

সভেতলানা বললেন, জানি, জানি। কিন্তু শুধু দুটি কারণে তোমাদের দেশের নারীরা পোশাকশিল্পকে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যাবেন। প্রথমত, তাঁরা নকশিকাঁথা বুননে দক্ষ। দ্বিতীয়ত, তাঁরা হাত দিয়ে ভাত খান।

এবার আমরা একেবারে হতবাক। হাতে ভাত খাওয়ার ব্যাপারটি আমরা সাধারণত অনাধুনিক বলেই জানতাম। কিন্তু এর যে আবার ভালো দিক থাকতে পারে, এটা কল্পনারও বাইরে। সভেতলানা বললেন, ভাত খাওয়ার সময় হাতের পাঁচ আঙুলের নিপুণ সমন্বয় সাধন করে মস্তিষ্ক। এবং নকশিকাঁথা বোনার সময়ও চোখ, ডান হাতের তিনটি আঙুল ও বাঁ হাতের তিনটি আঙুলের সমন্বিত কার্যক্রম চালায় মস্তিষ্ক। সেখানে তাদের নতুন নতুন নিউরন সংযোগ তৈরি হচ্ছে। এই দক্ষতা বাংলাদেশের নারীদের খুব উচ্চমানের সম্পদ। তৈরি পোশাক খাত কয়েক বছরের মধ্যেই এই অনাবিষ্কৃত দক্ষতা সামনে নিয়ে আসবে এবং তোমাদের দেশের অর্থনীতিতে এই ঘটনা এক বিপ্লবের সূচনা করবে।

সেদিন আমাদের মনে হয়েছিল সভেতলানা কাগজে–কলমে গবেষণা করে চমকপ্রদ তথ্য হিসেবে এসব কথা বলছেন। কিন্তু আজ তো দেখছি তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই বাস্তবতার গুরুত্ব ঠিকভাবে উপলব্ধি করি? আমরা কি নারী কর্মীদের প্রাপ্য সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করি? ধরা যাক, পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিকদের প্রজনন স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি। একে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, নারী আর মাতৃত্ব আলাদা করা যায় না। প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রতি যদি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তাঁদের উৎপাদনশীলতা অনেক বাড়বে। আর যদি স্বাস্থ্যসেবা না পান, তাহলে শিল্প, শিল্পমালিক ও দেশের অর্থনীতি—সবারই ক্ষতি। আজ তৈরি পোশাক খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশই এনে দিচ্ছে। আর সেখানে নারী শ্রমিকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই তাঁদের স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে সব ঠিক। এটা সাধারণ পাটিগণিতের হিসাব।

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এসএনভি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে তৈরি পোশাকশিল্পে বিশেষভাবে নারী শ্রমিকদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে অনলাইনভিত্তিক একটি ভার্চ্যুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মূলত জোর দেওয়া হয় এর গুরুত্ব সম্পর্কে সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে শিল্পমালিক ও তাঁদের কারখানার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা এবং নারী শ্রমিক নিজেরা কতটুকু সচেতন, সে বিষয়ের ওপর। নারী কর্মীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমস্যা ও সমাধানের উপায় নিয়েও কিছু সুপারিশ করা হয়।

পোশাকশিল্প এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানায় নারী কর্মীদের পাশাপাশি কারখানার মালিকদের করণীয় সম্পর্কেও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এসএনভি কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এসএনভির টিম লিডার ফারথিবা রাহাত খান। তিনি বলেন, তাঁরা বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করে তোলার কাজ করছেন। যেমন ধরা যাক, একজন নারী কর্মী প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসক দেখাতে চান। কিন্তু তাঁর কারখানা ছুটির পর হয়তো ডাক্তারখানা খোলা থাকে না। তখন উপায় কী? তাই সেখানে এমন সুযোগ থাকতে হবে, যেন নারী কর্মীরা ছুটির পরও চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ পান।

তৈরি পোশাকশিল্পের নারী কর্মীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শরীফ। করোনাকালে কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ওষুধ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণে মালিকপক্ষকেও এগিয়ে আসার কথা তিনি বলেন। বিজিএমইএর পরিচালক নজরুল ইসলামও এর বিশেষ গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, নারী কর্মীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা তাঁরা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ভালো থাকলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। এটা মালিক, শ্রমিক ও দেশের অর্থনীতির জন্য খুব দরকার।

বিজ্ঞাপন

অনেক কারখানার কাছেই রয়েছে বেশ কিছু সরকারি–বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। সেখানে পোশাকশ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। আল হেরা হাসপাতালের চিকিৎসক মো. আবুল হোসেন বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারি–বেসরকারি চিকিৎসাসেবার কার্যকর সমন্বয়ের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।

একজন নারী শ্রমিক যদি নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন, তাহলেও অনেক উপকার পাওয়া যায়। প্রতিটি কারখানায় যদি দুপুরে একটি ডিম, একটি কলার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পোশাকশিল্প আরও এক ধাপ ওপরে উঠে যাবে। অনেক কারখানায় এ রকম কিছু ব্যবস্থা ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। এরা বিশ্বমানের স্বীকৃতিও পেয়েছে।

আর একটি কথা। একজন সন্তানসম্ভবা নারী শ্রমিক শিশু জন্মের আগে ও পরে অন্তত চারবার করে গাইনি চিকিৎসকের সেবা গ্রহণ করার সুযোগ পান কি না। এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

এসএনভিকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে হয়, কারণ সংস্থাটি প্রতি মাসে দুবার করে তিন মাসে মোট ছয়টি অনলাইন আলোচনা করার উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা আশা করি এসব আলোচনা নারী কর্মীদের আরও সচেতন করবে। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সব ধরনের সহিংসতা বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশগুলো আমরা সামনে নিয়ে আসতে পারব। আর নারী কর্মীদের কাজের দক্ষতা, সুযোগ আরও বাড়ানোর জন্য প্রথম আলো তো সব সময় এই কথাগুলো ভালোভাবে প্রচার করবেই। সংবাদমাধ্যম হিসেবে এটা আমাদের কর্তব্য।

আব্দুল কাইয়ুম: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক

মন্তব্য পড়ুন 0