default-image

বাংলাদেশে শীতের মৌসুমে রাজনীতি জমে ওঠে। নেতারা শীতের আড়মোড়া ভেঙে লম্বা পাঞ্জাবির ওপর চাদর এলিয়ে বিকেলে ময়দানে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান। সরকারি দলের নেতারা বিরোধী দলের এবং বিরোধী দলের নেতারা সরকারের সমালোচনায় মুখর হন। কিন্তু করোনাকালে রাজনীতির উত্তাপ একেবারে অনুপস্থিত।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-১৮-এর উপনির্বাচনের দিনে কিছুটা উত্তাপ দেখা গেল বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায়। তা-ও একটি-দুটি নয়, ১১টি বাসে আগুন দেওয়া হলো। কারা দিল, কেন দিল, উপ নির্বাচনের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেসব প্রশ্নই এখন ঘুরেফিরে আসছে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন অনুষ্ঠিত অন্যান্য নির্বাচনে যেমনটি হয়ে থাকে, এখানেও তার ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বড় দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা পাড়ায় পাড়ায় পোস্টার ছড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করেছেন। এরপর দলের মনোনয়ন নিয়ে তাঁরা দৌড়ঝাঁপ করেছেন। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ড্রয়িং রুম ধরনা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগে প্রার্থী মনোনয়ন শান্তিপূর্ণ হলেও বিএনপিতে গোলমাল ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে মহাসচিবের বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়া ও বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটল।

ঢাকা-১৮-এর উপনির্বাচন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল একে অপরকে দোষারোপ করে চলেছে। আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল লোকদেখানো। নির্বাচনে অংশগ্রহণের নামে তারা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি দল মিলে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। তারা মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। তবে সবচেয়ে মোক্ষম কথাটি উচ্চারণ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। উপনির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আমেরিকা বাংলাদেশের নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিতে পারে। যেখানে আমেরিকায় নির্বাচনের ফল দিতে ৪-৫ দিন লেগে যায়, সেখানে তাঁর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন পাঁচ মিনিটে ফল ঘোষণা করে দেয়।

সমালোচকেরা বলেন, সিইসি যে কায়দায় নির্বাচন করছেন, তাতে ফল প্রকাশে পাঁচ মিনিট কেন, এক মিনিটও লাগার কথা নয়। ভোটের ফল তো আগেই ঠিক করা থাকে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে সব সময় উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হতো। নির্বাচন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকেরাও আগ্রহ দেখাতেন। সরেজমিনে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করতেন। আর এখন সাংবাদিকেরা গেলে ভোটারদের ফটোসেশন করানো হয়।

ঢাকা-১৮-এর নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, জনগণ যে বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তা আবারও প্রমাণিত হলো। কিন্তু ভোটের ফলাফল প্রমাণ করে না যে ভোটাররা আওয়ামী লীগকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ঢাকা-১৮ উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৮৬ শতাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রেই যাননি। এর আগে ঢাকার আরেকটি উপনির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬ শতাংশ। সিইসি যখন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমেরিকাকে শিক্ষা নিতে বলেছেন, তখন আরেক কমিশনার মাহবুব তালুকদার মন্তব্য করেছেন, নির্বাচনের মান ২০১৮ থেকেও নিচে নেমে এসেছে।

উপনির্বাচনের দিন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ১১টি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটল তা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বিএনপির নেতারা বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি ২০১৩ সালের মতো আবার আগুন-সন্ত্রাস করেছে। বাস পোড়ানোর ঘটনার ভিডিও ফুটেজ আছে, সবই পুরোনো ও চেনামুখ।

যেকোনো অপরাধের বিচার করতে হলে তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন। আর সেটি করতে প্রয়োজন সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। কিন্তু নেতারা তদন্তের আগেই যেভাবে ‘অপরাধী’ চিহ্নিত করে ফেলেছেন, যেভাবে গয়রহ মামলা হচ্ছে, তাতে তদন্ত সুষ্ঠু হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখি না।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একটি টিভি চ্যানেলে খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে সরকারি দলের ছাত্রলীগের এক ছেলেকে গতকালের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে বলেছে, তাকে পয়সা-টয়সা দিয়ে নিয়ে এসেছে আওয়ামী লীগের লোকেরা।

যেকোনো অপরাধের বিচার করতে হলে তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন। আর সেটি করতে প্রয়োজন সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। কিন্তু নেতারা তদন্তের আগেই যেভাবে ‘অপরাধী’ চিহ্নিত করে ফেলেছেন, যেভাবে গয়রহ মামলা হচ্ছে, তাতে তদন্ত সুষ্ঠু হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখি না।

বাসে আগুনের ঘটনায় রোববার প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল: ‘মামলার কথা বাদীই জানেন না’। মামলার কথা যদি বাদী না জানেন কী করে অভিযোগ দায়ের হলো, আসামিদের নামধাম এল? খিলক্ষেত এলাকায় একটি মিনিবাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় বাসের মালিক দুলাল হাওলাদার বলেছেন, তিনি মামলা করেননি। তাঁর কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নিয়েছে খিলক্ষেত থানার পুলিশ। তারপর খিলক্ষেত থানায় বাসমালিক দুলাল হাওলাদারের নামে করা মামলায় উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীরসহ ১১৪ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। অথচ দুলাল হাওলাদার বলেছেন, তিনি বিএনপির নেতা-কর্মী কাউকে চেনেন না। বাসে আগুন দেওয়ার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। তাহলে বিএনপির ১১৪ জন নেতা-কর্মী আসামি হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি বাসে আগুনের ঘটনায় আসামি করা হয়েছে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক হোসেনকে। করোনার কারণে তিনি আইসোলেশনে আছেন। মামলায় আসামি হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সহসাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার মাশুকুর রহমান, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন, ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুল রহমান, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনসহ ৬৪৭ জন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার ও তাদের ২৭ জনকে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে নেওয়ার পর আসামিদের কাছ থেকে সম্ভবত স্বীকারোক্তিও বের করে আনা হবে। যেখানে পুলিশের রিমান্ডের ভয়ে জীবিত মানুষ মৃত হয়ে যায়, সেখানে বাসে আগুন দেওয়ার স্বীকারোক্তি আদায় করা মোটেই কঠিন কাজ নয়। কিন্তু তাতে সত্য বেরিয়ে আসবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

রাজধানী ঢাকায় একই দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১১টি বাসে আগুন লাগানো হলো। অথচ সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো টের পেল না। একটি বাসের ঘটনা ছাড়া কোনোটিতে ভিডিও ফুটেজেও কারও হদিস পাওয়া গেল না। এটা কী করে সম্ভব হলো? অতীতে বাসে বোমা হামলা ও আগুন দেওয়ার যত ঘটনা ঘটেছে, কোনো না কোনো কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। সেটি হতে পারে বিরোধী দলের অবরোধ-হরতাল কিংবা সমাবেশ। সরকার কর্মসূচি পালন করতে বাধা দেয়। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান নাশকতা করে। কিন্তু বৃহস্পতিবার কোনো দলের কোনো কর্মসূচি ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো দলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালানো হয়নি। তাহলে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা কারা ঘটাল?

দুর্বৃত্তরা ১১টি বাসে আগুন দিয়েছে। আশপাশেও এমন কাউকে পাওয়া যায়নি, যিনি বা যারা বলেছেন, তাদের দেখেছেন। পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকেও কেউ দাবি করেননি, তারা দেখেছেন। কিন্তু বাস তো পুড়েছে। অগ্নিদগ্ধ বাসগুলো যদি সাক্ষ্য দিতে পারত!

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

sohrabhassan55@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0