বিজ্ঞাপন

আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। সরকারের কর্তারা আগে প্রবোধ দিতেন—করোনায় আমাদের কিছু হবে না। এখন তাঁরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। শেষমেশ দোষটা গিয়ে পড়ছে আমজনতার ঘাড়ে—তারা অবুঝ, অসচেতন, গোঁয়ার। কথা শোনে না, স্বাস্থ্যবিধি মানে না। বলার জন্য অনেক কিছুই বলা হয়। অন্যান্য দেশের মতো আমরা এখানে লকডাউন বা শাটডাউন শব্দগুলো ব্যবহার করছি না। আমরা কখনো বলছি সীমিত বিধিনিষেধ, কখনোবা কঠোর বিধিনিষেধ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পাবলিক সরকারের কথা শুনছে না, বিশেষজ্ঞদের কথা মানছে না। কেন শুনছে না বা কেন মানছে না, তা জানার চেষ্টা তেমন নেই।

এর মধ্যে একটা বড় ঘটনা ঘটে গেছে। সমাজের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এদের বলা হচ্ছে নতুন দরিদ্র। তাদের জন্য সমাজপতিদের প্রেসক্রিপশন হলো—ঘরে থাকো। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তারা খাবে কী? জীবন আগে না জীবিকা আগে, এ নিয়ে মহা তোলপাড়। মহাজনেরা বলছেন, আগে তো জীবন বাঁচুক। প্রশ্ন হলো, জীবন বাঁচবে কীভাবে—হাওয়া খেয়ে?

দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী-পেশাজীবী। তাঁদের কোনো স্থায়ী আয় নেই, নিয়োগপত্র নেই, চাকরিবিধিতে তাঁরা পড়েন না, বেতন-ভাতা জোটে না। অফিসে না গিয়েও যাঁরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, তাঁরা খুব সহজেই ‘শাটডাউনের’ ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। তাতে তাঁদের গায়ে আঁচড়টিও লাগবে না। কিন্তু যাঁদের দিন এনে দিন খাওয়া জীবন, তাঁদের চলবে কীভাবে? কেন তাঁরা শুনবেন? এটা বুঝতে পারাটাই রাজনীতি। মানুষকে বাদ দিয়ে তো রাজনীতি নয়। সমাজের চার-পাঁচ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতের চাকরিজীবীকে দিয়ে তো আর দেশটা চলবে না!

নতুন আরেকটি তর্ক উঠেছে—দেশ চালাচ্ছেন কারা—আমলারা নাকি রাজনীতিবিদেরা। এ নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছে। এ বিষয়ে কথা হচ্ছে অনেক। একটি রাজনৈতিক সরকারের আমলে এ রকম প্রশ্ন তো ওঠার কথা ছিল না!

করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য মানুষের অবাধ মেলামেশায় রাশ টানতে হবে—এ নিয়ে মোটামুটি মতৈক্য আছে। কিন্তু মানুষ যে পেটের তাগিদে পথে বের হয়, তা কীভাবে ঠেকানো যাবে। কারও কারও কথা শুনলে মনে হয়, মানুষ বুঝি ফুর্তি করার জন্য রাস্তায় নামে, শহর ছেড়ে গ্রামে বা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে। মানুষের এই অভ্যাস, সংস্কৃতি ও চাহিদা কোনো টেকনিক্যাল কমিটি দিয়ে সামাল দেওয়া যাবে না। সমাজটাকে বুঝতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বুলেটিনে সমাজতত্ত্বের কোনো জায়গা নেই। আমাদের কাজ হলো অনেকটা এ রকম—ও অপরাধ করেছে, ওকে জেলে ঢোকাও। ও বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেছে, ওকে জরিমানা করো। এই জরিমানা নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে যে গরিবেরাই এর ভুক্তভোগী। এ নিয়ে বাণিজ্যও হয়েছে বেশ।

আগে তো নির্বাচনের জন্য হলেও মাঝেমধ্যে জনগণের কাছে যেতে হতো, তাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে হতো। এখন তো আর সে বালাই নেই। ‘জনপ্রতিনিধি’ শব্দটি শুনলে অনেকেই ফিক করে হেসে ফেলেন। অ, তিনি কীভাবে আমাদের প্রতিনিধি হলেন? আমি তো ভোট দিই নাই?

পশ্চিমের অনেক দেশে লকডাউন বা শাটডাউন বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকার অনেক বেশি কঠোর এবং নাগরিকেরাও অনেক বেশি সচেতন। ফলে সেটা কার্যকর হচ্ছে। তারপরও মানুষ এর বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই ফুঁসে উঠছে। এটা ব্যক্তিগত অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারপরও দেখা যায়, মানুষ দিনের পর দিন ‘গৃহবন্দী’ থাকলেও তার চাহিদাগুলো পূরণে সরকার এগিয়ে এসেছে। পণ্য বা আর্থিক সুবিধা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের দেশে এটি হচ্ছে না।

আমরা একটা দুর্যোগের মধ্যে আছি। দুর্গতদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। কিন্তু কীভাবে? কেউ কেউ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে সমন্বিতভাবে সম্পৃক্ত করা দরকার। কারণ, তারাই জানে কে কীভাবে আছে। এটা শুনতে ভালো শোনায়। আসলে কি রাজনৈতিক দলগুলো সে পর্যায়ে আছে? জনগণের সঙ্গে তাদের সংযোগ কতটুকু?

আগে তো নির্বাচনের জন্য হলেও মাঝেমধ্যে জনগণের কাছে যেতে হতো, তাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে হতো। এখন তো আর সে বালাই নেই। ‘জনপ্রতিনিধি’ শব্দটি শুনলে অনেকেই ফিক করে হেসে ফেলেন। অ, তিনি কীভাবে আমাদের প্রতিনিধি হলেন? আমি তো ভোট দিই নাই?

রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা ত্রাণ বিতরণের অনেক ছবি আমরা টেলিভিশন-পত্রিকায় দেখেছি। এসবের একটা বড় অংশ যে মাঝপথেই লোপাট হয়ে যায়, সে-ও তো গণমাধ্যম সূত্রেই আমরা জানি। বিধবা ভাতা পান ইউনিয়ন পরিষদের সধবা স্ত্রী এবং দুস্থ মহিলা ভাতা পান চেয়ারম্যানের শ্যালিকা। কয়টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চালানো যাবে?

সরকার মনে করেছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গেলে ত্রাণ বিতরণের কাজটি সুষ্ঠু হবে। সচিবদের কথা ডিসি-ইউএনওরা শুনবেন। কিন্তু তৃণমূলে তো ইউএনওদের লোক–লস্কর নেই? তাঁদের সহায় হলো ইউনিয়ন পরিষদ। সেখানেও রাজনীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়-তোষণ। অর্থাৎ রাজনীতিটা ঠিক করতে না পারলে কোনো ভালো উদ্যোগই ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে একসময় এনজিও ও স্থানীয় সংগঠনগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তখন রাজনীতিতেও শুদ্ধাচার ছিল। নাগরিক সমাজের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যেও ছিল সংবেদনশীলতা। বন্যা কিংবা দুর্ভিক্ষের সময় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেই পরিচিত ছবিটি এখন উধাও। স্বাধীন নাগরিক উদ্যোগ আর দেখা যায় না। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের গিবত করা নিয়ে মহা ব্যস্ত।

মিলিটারি-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে করোনা মোকাবিলা করা যাবে না। মানুষের ঘরে সেবা পৌঁছে দিতে হবে। তাহলে মানুষ ঘরে থাকবে। তারপরও যারা ঘরে থাকবে না, তাদের বোঝাতে হবে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা তাঁদের জনপ্রিয়তার এত বড়াই করেন, তাঁদের কথা মানুষ শুনবে না কেন? যে মানুষ শেরেবাংলা ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে আসত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ-বৃষ্টিতে বসে থাকত, তারা এখনকার নেতাদের কথা শোনে না কেন? উত্তরটাও আমরা জানি।

এই অতিমারির সময় সবচেয়ে বেশি দরকার সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার প্রতি সম্মান দেখানো। আমরা এখনো তার থেকে যোজন যোজন দূরে। ‘প্রজ্ঞাপন’ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ‘প্রয়োজন’টাও দেখতে হবে। নাগরিকদের প্রতি সম্মানবোধ ও দায়িত্ববোধ থাকলে পুলিশ-মিলিটারি নামানো লাগে না। অমুক দেশের চেয়ে আমরা ভালো আছি কিংবা সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে—এসব ছেঁদো কথায় কাজ হবে না। এখন সত্যিকারের কাজের সময়। মানুষ সবই দেখছে। সময়মতো তার হিসাবটা চুকিয়ে দেবে।

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন