একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম এবং গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে সংবিধান রচিত হলেও বাংলাদেশের ৫০ বছরে এসে বলা যাবে না যে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই এ আশাবাদ ফিকে হয়ে আসে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে যে একদলীয় সরকার গঠিত হয়, তাকে কর্তৃত্ববাদী ভিন্ন আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। একই বছর আগস্ট ও নভেম্বর মাসে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়; হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ দেশের প্রথম সারির নেতাদের। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সামরিক কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরের ১৫ বছরে দেশ প্রত্যক্ষ করে সেনাশাসন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ও এরশাদের উত্থান। আট বছর ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন ১৯৯০-এর ডিসেম্বর মাসে এরশাদের সামরিক সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলন বাংলাদেশে আবারও আশা জাগায়। সুষ্ঠু নির্বাচন, বাক্‌স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রভৃতি গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভগুলো পালনে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়। ১৯৯১ সালে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর পরের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে ক্ষমতায় আসে। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থা ছোটখাটো কিছু অনিয়ম ছাড়া সুষ্ঠুভাবেই সংঘটিত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করার চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ক্ষমতা রক্ষা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে ক্ষমতাসীন দলগুলো। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তিক্ত শত্রুতা ও ক্ষমতার লড়াই জাতীয় সংসদ থেকে নামে রাজপথে, শুরু হয় সহিংস আন্দোলন। এ তিক্ততা এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয় যে ২০০৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টাকে ক্ষমতাসীন বিএনপি লুকোছাপা করার চেষ্টা করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য লাভ করেন। ১৯৯১ সাল থেকেই দুই দলের মধ্যে সহিংস বিরোধিতা সংসদকে অকার্যকর করে তোলে। গণতন্ত্র সুসংগঠিত করার বদলে ধীরে ধীরে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত শুরু হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হয় দুর্বল আর ‘নিয়মতান্ত্রিক’ভাবেই সব ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন

এত কিছুর পরও যে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত, ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছিল, তার কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে দুই প্রধান জোটের বিরোধিতা চরমে ওঠে। কেননা ইতিমধ্যে বিএনপি এ ব্যবস্থাকে নিজের অনুকূলে ব্যবহারের সাংবিধানিক ব্যবস্থা করেছিল; যার ফলে সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করে দেয়; তৈরি হয় সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যদিও প্রথম দিকে এ সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ছিল, জনসমর্থনও ছিল; কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সংস্কারের নামে বিরাজনৈতিকীকরণ এবং দীর্ঘ মেয়াদ এ সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দেয় এমন সব ব্যবস্থা নিতে, যাতে বিরোধী দলকে দুর্বল করে দেওয়া যায়, নির্বাচনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা যায় এবং একটি ভয়ের সংস্কৃতি চালু করা যায়। রাজনীতিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনতে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রমাণিত কার্যকর ব্যবস্থা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বাতিল করে দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার সমালোচকদের দমনে আইনগত ও আইনবহির্ভূত ব্যবস্থা নিতে থাকে। বিশেষ করে দুটি নিপীড়নমূলক আইন, ২০১৩ সালে সংশোধিত ২০০৬-এর তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ব্যবহার করে সরকারের সমালোচকদের গ্রেপ্তার করে ও নানা মেয়াদে দণ্ড প্রদান করে। এ আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার সমালোচনার মতো নাগরিক অধিকারকে ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করেছে। এ ছাড়া মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’–এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১ হাজার ৯২১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং ১০৯টি গুমের ঘটনা ঘটে।

বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার ব্যাপারে আদালতের নির্দেশ এবং ২০০৭ সালে গৃহীত ব্যবস্থা সত্ত্বেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রশ্ন আছে, তা বোঝা যায় সম্প্রতি অবসর গ্রহণের আগে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দারের কথা থেকে। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে বিচার বিভাগ স্বাধীন। কিন্তু বাস্তবে কতটুকু, তা আমরা সকলেই জানি এবং বুঝি।’ নিম্ন আদালতে নিয়োগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও অপসারণের ক্ষমতা কার্যত নির্বাহী বিভাগের হাতেই সোপর্দ করা আছে; ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ইমপিচ করার ক্ষমতা হাতে তুলে নেয়। এ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ের কারণে ২০১৭ সালে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

গত বছরগুলো, বিশেষ করে ২০১১ সালের পর থেকেই বিরোধী মত ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইন এবং আইনবহির্ভূত ব্যবস্থা নিতে আওয়ামী লীগ সরকার কুণ্ঠিত হয়নি। তাই ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবিশ্বাস্য ব্যবধানে জয় তেমন কাউকে অবাক করেনি। ২০১৪ সালে বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জনের ফলে বেশির ভাগ আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সফল হয় এবং দলটি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনকে নিউইয়র্ক টাইমস ‘প্রহসনমূলক’ এবং দ্য ইকোনমিস্ট ‘স্বচ্ছ জালিয়াতি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এ দুটি নির্বাচনকে সাজানোর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল একটাই—সংসদে কোনো কার্যকর বিরোধী দল না রেখে আইন প্রণয়ন বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীন করা।

বিজ্ঞাপন

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করতে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান সরকার এমন একটি অবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য নেই। তাই সরকারের বা সরকারি দলের সমালোচনা করা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সমালোচনা আর রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়কে একই কাতারে বিবেচনা করা হচ্ছে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে পরপর দুটি নির্বাচনে কারচুপি, বাক্‌স্বাধীনতা খর্ব করতে আইন প্রণয়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ—এসব ঘটনা খুব স্পষ্টভাবেই আমাদের দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশ স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে কতটা দূরে সরে গেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনায় সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে আইনসভার যে স্বাধীনতা থাকার কথা ছিল, জবাবদিহির যে ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেগুলো তো হয়ইনি, উল্টো নির্বাহী বিভাগের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র এখন সংসদ নয়, জনগণের সম্মতি শাসনের ভিত্তি নয়, শাসনের ভিত্তি হচ্ছে বলপ্রয়োগ।

নিয়ম রক্ষার নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দল ও গণতন্ত্র রক্ষার বাকসর্বস্ব বুলি নিয়ে বাংলাদেশে এখন কেবল গণতন্ত্রের একটি খোলস পড়ে রয়েছে। অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা, তা থেকে দেশ এখন অনেক দূরে।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

সাইমুম পারভেজ: নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। তিনি সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব সিডনি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি সন্ত্রাসবাদ, ডিজিটাল মিডিয়া ও বাংলাদেশ রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন