খোলাচোখ

প্রথম আলোর শক্তি

বিজ্ঞাপন

যেকোনো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি বড় লক্ষণ হলো সব প্রধান জাতীয় প্রশ্নে অব্যাহত সংলাপ। সরকার যে দল বা মতের হোক না কেন, জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহে নীতিনির্ধারণের সময় ব্যাপক মতবিনিময় ও তর্কবিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের আদি যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই মতবিনিময়ের প্রধান ক্ষেত্র হলো আইন পরিষদ। যে আইন পরিষদ যত বেশি প্রতিনিধিত্বশীল, অর্থাৎ যেখানে দেশের বিভিন্ন দল ও মতের প্রতিনিধিরা সর্বোচ্চ সংখ্যায় উপস্থিত, সে দেশের গণতন্ত্র তত বেগবান ও কার্যকর। নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো সরকার তার প্রস্তাবিত আইন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে নিতে পারে। সেটি হয়তো আইনসম্মত (অর্থাৎ ‘লিগ্যাল’) হবে, কিন্তু সে সিদ্ধান্ত সর্বদা নাগরিকদের গ্রহণযোগ্যতা পায়, সে কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ সে সিদ্ধান্ত ‘লিগ্যাল’ হলেও ‘লেজিটিমেট’ হিসেবে স্বীকৃতি না-ও পেতে পারে।
আইনসম্মত বনাম নাগরিক-গ্রহণযোগ্যতার এই দ্বন্দ্ব শুধু তাত্ত্বিক কোনো ব্যাপার নয়। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনের কথা ভাবা যাক। আইনের চোখে সে নির্বাচন অবৈধ ছিল বলা যাবে না। কিন্তু অধিকাংশ বিরোধী দল সে নির্বাচন বয়কট করেছিল, ফলে এক ক্ষমতাসীন দল ও তার সমর্থক ছাড়া সে নির্বাচন কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। প্রবল জনরোষের মুখে ‘আইনসম্মত’ হওয়া সত্ত্বেও সে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ বাতিল হয়ে যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হয়।
আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৯৬ সালের পরিস্থিতি তুলনীয়, তবে বড় তফাত এই যে গত ৫ জানুয়ারি সে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রবল জনরোষের উপস্থিতি নেই। কেন নেই, তার ব্যাখ্যায় না হয় না-ই গেলাম। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে দেশের মানুষ সরকারের প্রতি তাদের আস্থা-অনাস্থা প্রকাশের সুযোগ পায়। সংসদীয় ব্যবস্থায় এই আস্থা বা অনাস্থা প্রকাশিত হয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে সংসদ রয়েছে, তা যে যথাযথ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নয়—এ নিয়ে বড় ধরনের কোনো বিতর্ক নেই।
কার্যকর সংসদের এই অনুপস্থিতিতে একটি অদৃশ্য বা নীরব আইনসভার ভূমিকা গ্রহণ করেছে দেশের সংবাদমাধ্যম। সংসদে সবাই যখন হয় সরকারদলীয় অথবা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেখানে অর্থপূর্ণ সংলাপের সুযোগ কার্যত নেই। এর ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে এগিয়ে এসেছে সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যম। প্রথম আলো দেশের প্রধান সংবাদপত্র হিসেবে এই কাজে নিজের অজ্ঞাতেই নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছে।
‘ওয়াচডগ’ হিসেবে সংবাদপত্র সরকারের অংশীদার নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার ভূমিকা হয় গঠনমূলক সহযোগিতাপূর্ণ অথবা বিরোধিতাপূর্ণ। অনেকেই বলেন, প্রথম আলো প্রথমটির বদলে নিজের জন্য দ্বিতীয় ভূমিকাটি বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ চলতি সরকারের প্রতি তার অবস্থান সমালোচনাপূর্ণ। এই পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হিসেবে আমি এই মতের সঙ্গে একমত। তবে তার সঙ্গে এই কথা যুক্ত করব যে, সমালোচনাপূর্ণ হলেও তা অনিবার্যভাবে বিরোধিতাপূর্ণ নয়। যেমন মুক্তিযুদ্ধ, মৌলবাদ, ঘাতক-দালালদের বিচার বা এমনকি নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচার ইত্যাদি মৌল জাতীয় প্রশ্নে—সরকারের অবস্থানের সঙ্গে প্রথম আলোর ভূমিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। সমস্যা এসব নীতির বাস্তবায়নে। যেকোনো মৌল নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত সুশাসনের প্রশ্ন। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে খামতি যেখানে তা হলো এই সুশাসন বা গভর্নেন্সের ক্ষেত্রে। সুশাসন প্রশ্নে এই সরকারের প্রতি প্রথম আলোর ভূমিকা বহুলাংশেই বিরোধিতাপূর্ণ বা অ্যাডভারসারিয়াল।
শুধু চলতি সরকারের সময়ে নয়, সুশাসনের ব্যাপারে গত সরকারগুলোর ক্ষেত্রে প্রথম আলো বিরোধিতাপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলই প্রথম আলোকে নিজেদের বিরোধী পক্ষ বিবেচনা করে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির যেকোনো নেতাকে জিজ্ঞেস করুন, তাঁরা নির্দ্বিধায় প্রথম আলোকে অন্য পক্ষের সমর্থক বলে রায় দেবেন। ওয়ালটার লিপম্যান একসময় নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর উদাহরণে পত্রিকার এই বিরোধিতাপূর্ণ ভূমিকাকে গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সরকার নিজে যখন তার ভুল বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন সংবাদপত্র ‘দৌবারিক’ হয়ে সে ভুল ধরিয়ে দেয়। প্রথম আলো ক্রমেই
সেই দৌবারিকের দায়িত্ব পালন করছে। এটি প্রথম আলোর এক নম্বর জোর।
অন্য জোর, সে ক্রমেই একটি ‘রেফারেন্স’ মাধ্যম হয়ে উঠছে। এ কথার অর্থ, পাঠক এই পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে আস্থাবান, তাকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে সে নিজের মতামত নির্ধারণ করছে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে সরকারি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে, এমন ঘটনা হরহামেশাই আমরা দেখেছি। অন্য অনেক পত্রিকা অথবা টিভি নেটওয়ার্ক প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, এ-ও নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকি জাতীয় সংসদেও প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করার দৃষ্টান্ত আছে। সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি পাঠকদের আস্থার আরেক প্রমাণ সামাজিক তথ্যমাধ্যমে এই পত্রিকার খবরকে সূত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা।
এর ফলে শ্লাঘা বোধ করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের আস্থা অর্জিত হয় দীর্ঘদিনের সেবায়। ১৬ বছরের পরিশ্রমের সুফল প্রথম আলো পাচ্ছে। কিন্তু এর ফলে তার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বও অর্পিত হচ্ছে। নিজের পরিবেশিত সংবাদের ওপর পাঠকের আস্থা যাতে শিথিল না হয়, রাজনৈতিক ও আদর্শগত আনুগত্যের কারণে তথ্য পরিবেশনায় দ্বিচারিতার অনুপ্রবেশ না ঘটে, সেদিকে নজরদারি রাখা খুব জরুরি একটি কাজ। শুধু সরকারের বেলায় দৌবারিক হলে চলবে না, নিজের বেলাতেও প্রথম আলোকে সেই একই ভূমিকা নিতে হবে।
নিউইয়র্ক, ৩ নভেম্বর ২০১৪
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন