প্রথম আলো আশা জাগায়, সাহস জোগায়

বিজ্ঞাপন
default-image

২১ বছর আগে যখন প্রথম আলোর যাত্রা শুরু হয়, সেই সময়ে তার সঙ্গে ছিলাম, আজও আছি। এটি আনন্দময় অনুভূতি। পাঠক হিসেবে, সুহৃদ হিসেবে এত বছর যে পত্রিকাটির সঙ্গে আছি, সেই পত্রিকাটি ‘ভালোর সাথে আলোর পথে’ এগিয়ে চলেছে। ২১ বছর পূর্তিতে প্রথম আলোকে অভিনন্দন।

সেই সঙ্গে পাঠক হিসেবে কিছু কথাও বলা প্রয়োজন বলে মনে করি। প্রথম আলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কেননা এই পত্রিকা গণমানুষের কথা বলে, অন্ধকারের গলি-ঘুপচি থেকে সত্য বের করে আনে, পত্রিকাটি সমাজের অধিকারহারা নিচু তলার মানুষের কথা বলে। প্রথম আলোই কলসিন্দুরের মেয়েদের সামনে তুলে এনেছে; সাত সাহসী নারীর গল্পগুলো শুনিয়েছে, চরে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা পদ্মার ঢেউ উজিয়ে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন, এ রকম অনেক আশাজাগানিয়া খবর আমরা পত্রিকাটিতে পাই। পশ্চিমা দেশগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতিমান মানুষদের রোল মডেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এরাই রোল মডেল।

উচ্চশিক্ষার জন্য, নিজেকে ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জড মানুষগুলোর কঠোর সাধনা ও সংগ্রামের কাহিনিও প্রথম আলোর পাতায় উঠে এসেছে। এসব খবরে আমরা অনুপ্রাণিত হই। আশান্বিত হই। আমরা যারা মাঠে-ময়দানে শিক্ষা নিয়ে কাজ করি, আমরা দেখেছি মানুষ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, চেষ্টা করলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

আবার আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যেসব দুর্বলতা আছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেসব দুর্নীতি চলছে, তা–ও বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রথম আলো তুলে ধরে। কারও কারও কাছে এটি নেতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি, যারা অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, এসব খবর তাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়: তাহলে আমরা কতটা এগোলাম?

আরেকটি ভালো লাগার জায়গা হলো প্রথম আলোর আঞ্চলিক সংস্করণ। ২০ পৃষ্ঠার পত্রিকায় সারা দেশের সব খবর দেওয়া যায় না। এ জন্য প্রথম আলো বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য আলাদা সংস্করণ প্রকাশ করে, যাতে ওই অঞ্চলের খবর বেশি থাকে। আমার জন্মস্থান সিলেটে সাক্ষরতার হার কম, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসেও পিছিয়ে আছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহের প্রবণতাও বেশি। কিন্তু আঞ্চলিক সংস্করণে যে খবরটি পড়ে ভালো লাগল তা হলো ‘চিকিৎসাশিক্ষায় সিলেট এগিয়ে আছে।’

আমাদের দেশে অনেক সমস্যা। এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সব মানুষকে আমরা সাক্ষরজ্ঞান করতে পারিনি। এসব খবর যেমন পত্রিকায় আসে, তেমনি আসে অর্থনৈতিক উন্নতি-অগ্রগতির কথাও। তবে প্রথম আলোসহ প্রায় সব পত্রিকা ও টেলিভিশনের একটি দুর্বলতা দেখি—ফলোআপ খবরের ঘাটতি। কোনো ঘটনা ঘটলে সব সংবাদমাধ্যমই সেটি ফলাও করে প্রচার করে। কিন্তু পরে ফলোআপ না থাকায় আমরা এর পরিণতি জানতে পারি না।

যেদিন আমাদের প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান আইসিসি কর্তৃক দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হলেন, সব পত্রিকারই সেটি প্রধান খবর ছিল। সাকিবের নিষিদ্ধ হওয়ার খবরে আমরা সবাই মর্মাহত। পরবর্তী কয়েক দিনের পত্রিকায় এর ফলোআপ খবরও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সাকিবের খবরটি প্রথম যেদিন প্রকাশ পেল, সেদিন প্রথম আলোর শেষ পাতায় ‘তরুণীর ভাইয়ের হাত ভেঙে দিল বখাটেরা’ শিরোনামেও আরেকটি খবর ছাপা হয়। কিন্তু পরে আমরা এর ফলোআপ দেখিনি। ফলোআপটা দরকার এ কারণে যে সংবাদমাধ্যম ঘটনার পেছন লেগে থাকলে ফল পাওয়া যায়। অপরাধীর বিচার হয়। ফেনীর নুসরাত জাহানের হত্যার পূর্বাপর খবর প্রথম আলোসহ সব পত্রিকাই ধারাবাহিকভাবে ছেপেছে। আমরা বিচার পেয়েছি।

এ প্রসঙ্গ আমি লিমনের কথাও উল্লেখ করতে চাই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লিমনের পায়ে গুলি করে উল্টো তাকেই সন্ত্রাসী হিসেবে জাহির করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম আলোর মাধ্যমে আমরা প্রকৃত খবর পাই এবং শেষ পর্যন্ত লিমন জয়ী হয়।

নুসরাত হত্যার বিচার আমাদের আশ্বস্ত করে। আবার তনু, মাহমুদা, সাগর-রুনি হত্যার বিচার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে যেসব লেখক-প্রকাশক বা অন্য পেশার মানুষ খুন হয়েছে, কম ক্ষেত্রেই আমরা তার বিচার পেয়েছি। অভিজিৎ ও দীপন হত্যার বিচার শুরু হয়েছে মাত্র। এসব অপরাধের পেছনে সংবাদমাধ্যমকে লেগে থাকতে হবে।

 আমরা চাই প্রথম আলো নারী ও শিশু হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার ফলোআপ করবে। শুধু চাঞ্চল্যকর খবরের পেছনে ছুটবে না। প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকেই আমরা জানতে পারি, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় মাত্র ৩ শতাংশ আসামি শাস্তি পায়। এই খবর আমাদের ভীষণ বিচলিত করে। পশ্চিমা দেশেও নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেখানে কেউ দায়মুক্তি পায় না। তবে অপরাধের খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত কিংবা তার স্বজনদের ওপর কী প্রতিক্রিয়া হবে। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি হতাশায় আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।

আমি বলব, প্রথম আলো সড়ক দুর্ঘটনার খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় দিনে কতজন মারা গেল, পত্রিকায় তার হিসাব থাকত। দিনে রোগে আক্রান্ত হয়ে কত শিশু মারা যায় আর সড়ক দুর্ঘটনায় কত মারা যায়, এটি হিসাব নিলেই আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারব। এ ধরনের খবর নিয়মিত প্রকাশিত হলে গণমানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে। আবার কর্তৃপক্ষেরও টনক নড়ে। এর পাশাপাশি প্রথম আলো বাল্যবিবাহ বন্ধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে থাকে।

প্রথম আলো নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম আলোর সহযোগী পত্রিকা হিসেবে কিশোর আলোবিজ্ঞানচিন্তা বের করে তরুণ প্রজন্মকে অনেক ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ‘বই পড়া দিবস’ চালু করা প্রয়োজন। প্রথমা প্রকাশনও কাজটি করতে পারে। তরুণদের বই পড়ার প্রতি, বিশেষ করে আমাদের ও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের লেখার প্রতি আকৃষ্ট করতে পারলে, সাক্ষরতার হার বাড়াতে পারলে পত্রিকার কাটতিও বাড়বে। শিক্ষা নিয়ে কাজ করি বলে আরেকটি বিষয়ে পীড়িত বোধ করি। পাঠ্যপুস্তকে ভুল থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও ভুল শেখে। এটি কোনোভাবে হতে দেওয়া যায় না। প্রথম আলো পাঠ্যপুস্তকের ভুল নিয়ে আরও বেশি বেশি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে আশা করি।

বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যম এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রথম আলোর সামনেও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত আইনি চ্যালেঞ্জ—আইসিটি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সমাজে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। এটি শুধু সরকারের দিক থেকে নয়। সমাজের সর্বত্র অসহিষ্ণুতা প্রকট রূপ নিয়েছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। যুক্তির বদলে জবরদস্তি চলছে। এই পরিবেশে যেকোনো সংবাদমাধ্যমের পক্ষে গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর কাজটি কঠিন। তবে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

এই মুহূর্তে গণমাধ্যমের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার খবরের প্রলোভন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয় না। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও দেখেছি ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল। অথচ যেই শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন করছিল, তাদের কেউ এসব গুজব ছড়ায়নি। সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে যেন আমাদের পেয়ে না বসে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

আমি বলব, প্রথম আলোর সবকিছুই ভালো। তবে সাহিত্যের পরিসর আরেকটু বাড়ানো প্রয়োজন। প্রথম আলো ক্রীড়া ও বিনোদনে যতটা জায়গা দেয়, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ততটা দেয় না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একটি জাতির মানস গঠনে সাহিত্য-সংস্কৃতির ভূমিকাই মুখ্য।

প্রথম আলোর পড়াশোনা পাতা নিয়েও কিছু কথা আছে। পরীক্ষায় পাস নয়, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সময় মনে হয় প্রথম আলোর পড়াশোনার পাতাও পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এটিকে জ্ঞানভিত্তিক করতে হবে। শিশুতোষ জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রও আরও বাড়াতে হবে।

ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম আলো আগের মতোই সোচ্চার থাকবে, এটাই ২১ বছর পূর্তির প্রত্যাশা।

রাশেদা কে চৌধূরী: গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন