default-image

ঢাকার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি পুরো শিক্ষকসমাজকে হতাশ করেছে। ১৮ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিটি চোখে আঙুল দিয়ে বলে যে শিক্ষকের মর্যাদা ও পাওনা আসলে কত নিচে? সেখানে একজন নিরাপত্তাকর্মী ও একজন কম্পিউটার অপারেটরকে শিক্ষক পদের চেয়ে কম যোগ্যতা নিয়েও অপেক্ষাকৃত বেশি বেতনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার একটি সামগ্রিক বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদার সঙ্গে কাজের আন্তরিকতা ও উৎপাদনশীলতার এক গভীর যোগসূত্র বিদ্যমান। একজন কর্মজীবীকে সন্তোষজনক মর্যাদা না দিয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল প্রতাশা করা যায় না। আমাদের শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে একরাশ বেদনা ও গ্লানি অতিনিবিড়ভাবে জড়িত। এখন আমরা এমন একসময়ে এসে পৌঁছেছি, যখন মানুষ শিক্ষকতা পেশাকে আর পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছে না, বরং বিকল্প সুযোগ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। আমাদের শিক্ষকতা পেশায় সুযোগ-সুবিধা অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম ও ক্ষেত্রবিশেষ হতাশাজনকও।

বাংলাদেশে ৬৫ হাজার ৯০২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, যেখানে ৩ লাখ ২৫ হাজার সহকারী শিক্ষক ও ৪২ হাজার প্রধান শিক্ষক কর্মরত। এটি সন্দেহাতীতভাবে সত্য, কেবল এই ৩ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষকই পারেন পুরো বাংলাদেশকে বদলে দিতে। বাংলাদেশকে রঙিন করে তুলতে। অথচ সেই শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা না দিয়ে, অধিকন্তু অধিকারবঞ্চিত করে কোনো অবস্থাতেই যৌক্তিক, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। অথচ আপাত সেই অসম্ভবের পথেই হাঁটছি আমরা। একসময় আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মর্যাদা পেতেন। আন্দোলন করে তাঁরা তাঁদের মর্যাদা আদায় করেছেন। বর্তমানে তাঁরা ১১তম গ্রেডে কর্মরত। অন্যদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা এখন ১৪ ও ১৫তম গ্রেডে অবস্থান করছেন। বেশ কিছুদিন ধরে তাঁরা বেতন–বৈষম্য নিরসনে আন্দোলনে নেমেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় তাঁরা এখন কর্মবিরতি পালন করছেন। তাঁদের দাবি, জাতীয় বেতন স্কেলে ১১তম গ্রেড। এই দাবির পক্ষে তাঁরা বেশ কিছু যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন।

অ. তাঁরা দাবি করছেন, ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের সময় তাঁদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকদের বেতনের পার্থক্য ছিল মাত্র ১০ টাকা। তাঁরা ঠিক প্রধান শিক্ষকের বেতনের পরের ধাপেই অবস্থান করতেন। ফলে আজকের বেতন–কাঠামো বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আ. ১৯৭৭ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারীদের মধ্যে বেতনে পার্থক্য ছিল ৩টি ধাপ। ২০১৪ সালের ৯ মার্চে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির ফলে পার্থক্যটা আরও ২ ধাপ বেড়ে যায়। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকেরা ১১তম, প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকেরা ১২তম, সহকারী শিক্ষকেরা ১৪তম ও প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকেরা ১৫তম গ্রেডে অবস্থান করছেন। যা সুস্পষ্টভাবে তাঁদের তুলনামূলকভাবে অবনমিত করেছে।

ই. ইতিমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের যোগ্যতা বেড়েছে। আগে এইচএসসি ও এসএসসি পাস করেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতা বেড়ে হয়েছে স্নাতক। ফলে যোগ্যতা বাড়িয়ে, বেতন ও সামাজিক মর্যাদা কমানো অযৌক্তিক ও অসম্মাজনক; এবং একই সঙ্গে এই পেশাকে নিরুৎসাহিতকরণের শামিল। ফলে শিক্ষকতা পেশায় মানুষ নিরুৎসাহিত হবে, এবং মেধাবীরা এই পেশা ছেড়ে পালাবে। ফলে হুমকির মধ্যে পড়বে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা।

ঈ. প্রধান শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়ানো যথার্থ। কিন্তু তার সঙ্গে সমন্বয় করে সহকারী শিক্ষকদেরও মর্যাদা ঠিক করা যৌক্তিক। মনে রাখতে হবে, কাউকে সুবিধা দেওয়ার অর্থ তুলনামূলকভাবে অন্যকে বঞ্চিত করা। ফলে বঞ্চিতজন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।

উ. জাতীয় বেতন স্কেলের ১৪ ও ১৫তম ধাপে বেতন পান সব বিভাগের অফিস সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও সাঁট–মুদ্রাক্ষরিকেরা। বিনির্মাণের একজন কারিগর শিক্ষকের মর্যাদা কোনো অবস্থাতেই এই স্তরে মানানসই নয়; বরং অসম্মানজনক।

ঊ. ইতিমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে একমত হয়ে প্রধান শিক্ষকের বেতন ১০ম গ্রেড ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের বেতন ১২তম গ্রেড নির্ধারণের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় তা গ্রহণ করেনি, ফেরত দিয়েছে। ফলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই একাত্মতাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে। যদিও আন্দোলনকারীরা প্রধান শিক্ষকের বেতন ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকের বেতন ১১তম গ্রেড নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন।

ঋ. আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে তাঁরা দাবি করছেন, তাঁদের দাবি পূরণ করা হোক।

বেতনকাঠামো, আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে আমাদের শিক্ষকসমাজ অনেকাংশেই বঞ্চিত ও অবহেলিত। ফলে প্রতিদিন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। একদিন এর দায় হয়তো কাঁধে তুলে নিতে হবে বাংলাদেশকে। মেধাশূন্য শিক্ষকসমাজ দিয়ে মেধানির্ভর, উন্নত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র বির্নিমাণ কার্যক্রম নিশ্চই হুমকির মধ্যে পড়বে। শিক্ষকদের অধিকারের নিশ্চয়তা না দিয়ে, কোনো রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। ইতিমধ্যে সহকারী শিক্ষকেরা ক্লাস বর্জন করেছেন, মহাসমাবেশেরও ডাক দিয়েছেন। শিক্ষকেরা রাজপথে থাকলে, কাজে উদ্দীপনা না পেলে, নিশ্চিতভাবে বিনষ্ট হবে শিক্ষার পরিবেশ। আমরা কোনো অবস্থাতেই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারি না। দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের শিক্ষকসমাজের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো আবশ্যক। তবে যতক্ষণ তা সম্ভব হচ্ছে না, ততক্ষণ তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষার মূলভিত্তি। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে উদাসীনতা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।

শিক্ষক: অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
faruque1712@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0