এ প্রবন্ধ কেবল প্রাথমিক পর্যায়ের উপবৃত্তি নিয়ে লেখা। আর উপকারভোগীরা সবাই প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। এর বড় অংশটি মেয়ে শিক্ষার্থী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার কমাতে, মেয়ে শিশুদের ক্লাসরুমে ধরে রাখতে ও নারীর ক্ষমতায়নে এসব কার্যক্রম বিশেষ অবদান রাখছে। এমএফএসের মাধ্যমে প্রাথমিক উপবৃত্তির টাকা প্রদানের নানা অভিজ্ঞতার আলোকে, প্রাথমিক উপবৃত্তি কার্যক্রমকে ত্রুটিমুক্ত করতে প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশনা ২০২১ সাম্প্রতিক কালে অনুমোদিত হয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সূত্র, অনুমোদিত এই নির্দেশনা উপকারভোগীবান্ধব। এই নির্দেশনায় উপকারভোগীদের নিজেদের পছন্দের এমএফএস অপারেটরদের বাছাইয়ের স্বাধীনতার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাই এই নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জনস্বার্থে বিশেষ জরুরি। এ প্রবন্ধে সেই পরিপ্রেক্ষিত ও যৌক্তিকতা তুলে ধরার প্রচেষ্টা থাকবে।

বাংলাদেশ নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ও চাহিদাভিত্তিক উদ্ভাবনমূলক কৌশল হিসেবে শর্তসাপেক্ষ নগদ প্রদান কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের এই কর্মসূচি থেকে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশ নিজেরা তা প্রয়োগ করছে।

২০২১ সালে চতুর্থ মেয়াদে পাঁচ বছরের এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রকল্পটি বর্তমানে সম্পূর্ণ রাজস্ব খরচে আনা হয়েছে। দেশের দুই শিক্ষা মন্ত্রণালয় (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা) ২০১৪ সাল থেকে এমএফএস খাত ব্যবহার করে উপবৃত্তির টাকা প্রদান করছে। উল্লেখ্য, এর আগে উভয় মন্ত্রণালয়কে ব্যাংকের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। বর্তমানে তা এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে।

সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য একটি একক গাইডলাইন রয়েছে। সেই গাইডলাইনে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে যে উপকারভোগীরা তাদের নিজেদের এমএফএস অপারেটরদের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করতে পারবে, যাতে করে সংশ্লিষ্ট উপকারভোগী তাদের নিকটবর্তী এমএফএস এজেন্ট পয়েন্ট থেকে সরকারি এই আর্থিক সহায়তার অর্থ গ্রহণ করতে পারে।

২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি এমএফএসের মাধ্যমে শুরু হয়। শুরু থেকেই নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা অগ্রসর হয়েছি। এমএফএসের মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদানের ব্যাপক উপকারের পাশাপাশি, নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমএফএস অপারেট বাছাই প্রক্রিয়াটি ছিল সাবজেক্টিভ। এই প্রক্রিয়াতেও গ্রাহক বা উপকারভোগী মূল স্টেকহোল্ডার হিসেবে নিজেদের মতামত প্রদানের কোনো সুযোগ পায় না।

বর্তমানে প্রাথমিক উপবৃত্তির টাকা এমএফএস অপারেটর নগদের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। বিগত বছরে এমএফএস অপারেটর শিওর ক্যাশের মাধ্যমে (২০১৪-২০২১) দেওয়া হচ্ছিল। এই প্রকল্পের আওতায় উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে শিওর ক্যাশ। গত জুন ২০২১–এ প্রাথমিক শিক্ষার উপবৃত্তি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষার উপবৃত্তি সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিওর ক্যাশকে বাদ দিয়ে নগদকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তির টাকা প্রদানের সার্বিক অভিজ্ঞতা, অর্জন ও শিক্ষণীয় দিকগুলোকে সংক্ষেপে নিচে এক এক করে তুলে ধরছি।

এক. প্রথম পর্যায়ে শুরুতে যখন চাল-আটা দেওয়া হতো, তখন দুটি সমস্যা বা অভিযোগের কথা শোনা যেত। প্রথমত, ওজনে কম দেওয়া। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র শতকরা চল্লিশ ভাগ শিক্ষার্থীদের এই সহায়তা প্রদান করা হয়, যা অপ্রতুল।
দুই. সময় ও অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষা উপবৃত্তি গম–চাল থেকে ক্যাশে চালু (২০১৪) করা হয়। ইতিমধ্যে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে চালু হয়েছে। সরকার শতভাগ শিশুকে এই উপবৃত্তির আওতায় আনে। এই পর্যায়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হতো। এ ক্ষেত্রেও দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। প্রথমত, ত্রৈমাসিক উপবৃত্তির টাকা ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করতে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের প্রায় এক কর্মদিবস সময় নষ্ট হতো। উপবৃত্তির টাকা সংগ্রহ করতে এর এক–তৃতীয়াংশ খরচ হয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, উপকারভোগীরা রিয়েল টাইম সেবা স্থানীয় ব্যাংকের কাছ থেকে পেতেন না।
তিন. ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে উপরিউক্ত দুই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার দিকগুলো বন্ধের সুযোগ তৈরি হয়। এ পর্যায়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরে এসে এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি দেওয়া হয়। যার ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান, নিচে তা তুলে ধরছি—
প্রথমত, এমএফএসের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা রিয়েল টাইম সেবা পাচ্ছেন। উপকারভোগী এমএফএস অ্যাকাউন্টে এই টাকা সরাসরি চলে আসে।
দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা পাঠানোর জন্য একটি একক খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে শতকরা শূন্য দশমিক ৭০ ভাগ, যা উপবৃত্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তৃতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে এমএফএস অপারেটররা কেওয়াইসির মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্ট খুলে থাকে। কাজেই যথার্থ উপকারভোগী নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা টাকা পায়।
চতুর্থত, এমএফএস অপারেটরদের মাধ্যমে উপবৃত্তি দেওয়ায় ঝামেলাবিহীনভাবে সবকিছু স্বচ্ছতার সঙ্গে করা সম্ভব হচ্ছে।
পঞ্চমত, দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের হাতে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছানোর ব্যাপারটি প্রশাসনের জন্যও সহজ হয়েছে। ফলে মূল্যবান সময় ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি হয়েছে আরও দ্রুত ও নিরাপদ।
এ প্রসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতি আবেদন থাকবে, সমাজের পিছিয়ে পড়া ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এই কার্যক্রমের আওতায় ভবিষ্যতে শতভাগ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি এমএফএসের মাধ্যমে শুরু হয়। শুরু থেকেই নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা অগ্রসর হয়েছি। এমএফএসের মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদানের ব্যাপক উপকারের পাশাপাশি, নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমএফএস অপারেট বাছাই প্রক্রিয়াটি ছিল সাবজেক্টিভ। এই প্রক্রিয়াতেও গ্রাহক বা উপকারভোগী মূল স্টেকহোল্ডার হিসেবে নিজেদের মতামত প্রদানের কোনো সুযোগ পায় না।

উপকারভোগীদের স্বার্থে কয়েকটি প্রধান বিষয় বা সূচক বিবেচনায় রাখা দরকার। ক. সহজলভ্যতা, অর্থাৎ হাঁটা পথের দূরত্বে যেন এজেন্ট পাওয়া যায়, খ. প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা, গ. রিয়েল টাইমে উপকারভোগীদের টাকা উত্তোলনের সুযোগ প্রদানের সক্ষমতা, ঘ. সাইবার সিকিউরিটি ও মানি লন্ডারিংয়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ উদ্যোগী ও সার্বক্ষণিক সতর্কতা। এই চারটি সূচক প্রাথমিক বাছাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেই বিগত দিনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশনা ২০২১ একটি উপকারভোগীবান্ধব নির্দেশনা। এর বাস্তবায়ন হলে দেশের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষা খাত উভয় উপকৃত হবে।

পরিশেষে বলব, প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করছে উপবৃত্তির মাধ্যমে। শিক্ষা উপবৃত্তির উপকারভোগীদের স্বার্থ, অংশগ্রহণ ও পছন্দকে প্রথমে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উপকারভোগীদের জন্য স্বাধীনভাবে নিজেদের এমএফএস অপারেটরদের সেবা বাছাইয়ের সুযোগ রাখার বিষয়টি একটি ভালো সিদ্ধান্ত।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তকে (প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশনা, ২০২১) আমি অভিনন্দন জানাই। ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এই নির্দেশনা অনুমোদিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক, সাবেক শিক্ষাসচিব ও এটুআইয়ের প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে জনস্বার্থে তাই নির্দেশনা দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রইলাম।

এন আই খান, সাবেক মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন