ইদানীং রাজনীতি

ফার্স্ট ক্লাস নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভীষণ বিজয়

বিজ্ঞাপন
default-image

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইদানীংকালের বক্তব্য-ভাষণের কিছু কথাবার্তার ব্যাপারে মনে মনে সমালোচনামূলক চিন্তাগুলো নিয়ে কাগজে–কলম ঠেকাব ঠেকাব করছিলাম। ভাগ্যিস তা করিনি, লিখলে বা তা প্রকাশিত হলে হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেত। অধম যে নিতান্তই অর্বাচীন, একেবারে গোমূর্খ তা প্রথম আলোর পাঠকমাত্রই অতি সহজেই বুঝতে পারতেন। অবশ্য এমন নয় যে পাঠককুল সেটা অনুধাবন করেন না, তবে একটা সান্ত্বনা আছে, যেহেতু অকাঠ মূর্খের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইদানীংকালের নির্বাচনসংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করে কিছু লিখিনি, সেহেতু বোকামিটা কিছুটা আড়াল করা গেছে!
একেবারে সাচ্চা রিপোর্টারের মতো অন্য কারও বক্তব্য হুবহু উদ্ধৃত করার ক্ষমতা বা দক্ষতা নেই। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রচণ্ডভাবে অনুভূতিতাড়িত বক্তব্যগুলোর কথা বলতে গিয়ে কিছুটা এদিক-সেদিক হয়ে যেতে পারে। তবে আসল কথা তুলে ধরতে চেষ্টার কমতি হবে না। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার যে কথাগুলো বলছিলেন তার সারবত্তা ছিল অনেকটা এ রকম—বিএনপি ও তার দোসররা জঙ্গিবাদী। খোদ বিএনপি সরাসরি জঙ্গিবাদী দল না হলেও (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক এভাবে বলেননি, অধম তাঁর মূল কথা ঠিক রেখে নিজের মতো করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলছি) নিঃসন্দেহে জঙ্গিবাদের ইন্ধনদাতা, সাহায্যদাতা, মদদদাতা ইত্যাদি। লোকজন, টাকাপয়সা, অর্থ, বুদ্ধি, সমর্থন, আশ্বাস—সবকিছু দিয়ে বিএনপি জঙ্গিবাদের অহরহ সাহায্য করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল বিএনপির তথাকথিত আন্দোলনের নামে নির্মমতা আর নৃশংসতা নিয়ে। অর্থাৎ পেট্রলবোমায় লোক মারা নিয়ে। বিএনপি আন্দোলনের নামে প্রায় তিন মাস ধরে আগুনে পুড়িয়ে লোক মেরেছে। বীভৎসভাবে, নির্মমভাবে শিশু, নারী, নিরীহ বাসচালক, চালকের সহকারী, যাত্রী—সবাইকে মেরেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রী, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারী—কেউ রেহাই পায়নি। মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে দিনের পর দিন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তাদের অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মার্চ-এপ্রিল মাস বা তারও আগে থেকে বক্তব্যের তৃতীয় অংশ ছিল বিএনপির তথাকথিত অবরোধ-হরতাল-আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতির সমূহ ক্ষতি। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত বাজারে পাঠাতে না পারার কারণে কৃষিজাত পণ্য, উৎপাদনকারী কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী বলেননি, কিন্তু অবরোধের কারণে মক্কেল আসতে না পারার কারণে অধম গোছের আইনজীবীদেরও দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। অবশ্য সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা, অর্থনীতি প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে গিয়েছিল। তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। যা হোক জঙ্গিবাদ, পুড়িয়ে মানুষ মারা, অর্থনীতিকে ধ্বংস করা—এসবের জন্য যারা দায়ী, তাদের তো আর এ দেশের মানুষ—ভোটাররা ভোট দিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বুঝেছিলেন, জেনেছিলেন যে ওদের এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেওয়া, অসাম্প্রদায়িক, অর্থাৎ আপামর ভালো নাগরিক ভোট দেবে না, ভোট দিতে পারে না। পাকিস্তানপন্থী বা পাকিস্তানিদের দালালরা কোনো ভোটারকে প্ররোচিত করতে পারবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের রাজনীতিতে পাকিস্তানপন্থীদের গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে মাঝে মাঝে অঙ্গুলি নির্দেশনা দেন। পুরোপুরি পশ্চিমা না হলেও স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী তো পার হতে চলল। এ দেশে এখনো কারা পাকিস্তানপন্থী? এই যে এক মাস ধরে আমরা ক্রিকেটে পাকিস্তানিদের যে পেদানি দিচ্ছি, তাতে উল্লসিত না হয়ে খেলা শেষে ঘরের দরজা বন্ধ করে পরাজয়ের দুঃখে হু হু করে কেউ কেঁদেছেন বলে তো শুনিনি। অবশ্য পাকিস্তানের পরাজয়ে যাঁরা কান্নাকাটি করেছেন, তাঁরাই বোধ হয় পাকিস্তানপন্থী। পুলিশ, ডিবি, এনএসআই, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআইসহ আরও বহু সংস্থার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় তাঁদের ব্যাপারে খোঁজখবর পান। এই ধরেন মাহমুদুর রহমান মান্না আর সাদেক হোসেন খোকার কথোপকথন, টেলিফোনে ঢাকা থেকে সেই নিউইয়র্ক। এতে বোঝা যায় ষড়যন্ত্র কত গভীর, একেবারে বিশ্বব্যাপী।

২.
আর তাই ঠিকই জেনেছিলেন, বুঝেছিলেন যে ঢাকা আর চট্টগ্রামের ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেবে না। জঙ্গিবাদ, মানুষ পুড়িয়ে মারা, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ব্যাহত করার জন্য হরতাল দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা— এত সব বদকাজ যাদের স্বভাবজাত, সেই বিএনপিকে তো আর বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ ভোট দিতে পারে না। ২৮ এপ্রিলের তিন সিটি নির্বাচনে তা-ই হয়েছে।
যেহেতু ভোটাররা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে আসলেই ভোট দিতেন না, তাই তাঁদের পক্ষ হয়ে আওয়ামী-সমর্থকেরা তাঁদের সেই কাজটি অনেকটাই সহজ করে দিয়েছেন। সবাই তো আর দেশপ্রেমিক না, কিছু লোক এত কিছুর পরও হয়তো বিএনপি মার্কায় সিল মারতেন। তাই তাঁদের মার্কায়ও কিছু সিল মারা হয়েছে। ধারণা করছি, সব কর্মীর সাক্ষরতা জ্ঞান সমান না, তাই হয়তো না বুঝে বিএনপির মার্কায় সিল কিছু বেশিই মেরে দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে সিল মারার ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে একটু সতর্ক হতে হবে। অবশ্য নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল (দাঁড়িপাল্লা থাকবে না, কারণ জামায়াত নির্বাচন করতে পারবে না) ইত্যাদি পুরোনো মার্কা। ভুল হবে না।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভোট পড়েছিল খুবই অল্প, ৫ জানুয়ারি ২০১৪-তে ভোট পড়বে না জেনে নির্বাচনেই আসেনি; আর গত দুই-তিন বছরের অপকর্মের কারণে সিটি নির্বাচনে যে ভোট বিএনপির বাক্সে পড়বে না, সেটা সবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। হয়েছেও তা-ই।

৩.
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশ্লেষণ যদি আমরা বিবেচনায় নিই, যা তিন সিটি নির্বাচনের ফলাফলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে—তাহলে এটা এখন দাবি করার সময় এসেছে যে যদি আমাদের রাজনীতিতে অচিরেই কোনো গুণগত পরিবর্তন না আসে, অর্থাৎ বিএনপির জায়গায় শক্তিশালী কোনো বিরোধী দলের আবির্ভাব না হয়, তত দিন নির্বাচন-টির্বাচনের দরকার নেই। বিদেশিরা আমাদের বাস্তবতা অনুধাবন না করে চেঁচামেচি করবে। হয়তো তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য নির্বাচনের তারিখ-টারিখ দিতে হবে। তবে ফলাফল তো জানা আছে, তাই কর্মীদের দিয়ে নৌকা মার্কাতে সিল দেওয়ার জন্য কেন্দ্র, বুথ ইত্যাদি করতে হবে, প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশ ইত্যাদি নিয়োজিত করতে হবে। একটা নির্বাচন কমিশনও লাগবে। সবচেয়ে ভালো হয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনকেই আরও বছর দশেকের জন্য রেখে দিলে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আর ২৮ এপ্রিলের সুষ্ঠু, সঠিক এবং বিউটিফুল নির্বাচন করার পুরস্কার হিসেবে তারা আরও ১০ বছর থাকতেই পারেন, থাকা উচিত।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফল হয়েছে। কাগজ-কলমে এখনো নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী আছি। কমিশন যেহেতু সুষ্ঠু, সঠিক, ভালো কাজ করছে, সেহেতু তাদের পক্ষে আর ওকালতি করা সাজে না। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে, কমিশনও ইদানীং অধমের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেনি। তাদের আর দরকারও নেই। তাই ইস্তফাপত্রটা পাঠিয়ে দেব।
যেটা বলছিলাম, শুধু স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন নয়, অন্যান্য নির্বাচনেও ভোটাররা তো পাকিস্তানপন্থী, জঙ্গিবাদী, মানুষ পুড়িয়ে মারা, অর্থনীতি ধ্বংস করা, দুর্নীতিপরায়ণ ক্ষমতালোভী জোচ্চরদের ভোট দিতে পারেন না। এই সুবাদে প্রথম আলোর পাঠককুলকে জানিয়ে রাখি, আমাদের বার কাউন্সিলের নির্বাচন ২০ মে। ওই নির্বাচনে সারা দেশের হাজার পঞ্চাশেক আইনজীবী ভোট দিয়ে তিন বছরের জন্য বার কাউন্সিলের ১৪ জন সদস্য নির্বাচিত করবেন। একটা খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখের সমন্বয়ে বিএনপি প্যানেল। অন্যটি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মতিন খসরু, জেড আই খান পান্না, শ ম রেজা প্রমুখের সমন্বয়ে আওয়ামী প্যানেল।
বিজ্ঞ আইনজীবী ভোটাররা যেহেতু শুধু আইন মান্যকারী নন, নৈতিকতা মান্যকারীও বটে, তাই তাঁরা জঙ্গিবাদী, মানুষ পোড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি প্যানেলে তাঁদের ভোট দেওয়ার কথা নয়। তাই প্রত্যাশিত ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে—ডিসি, এসপি, স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হবে। বার কাউন্সিলের নির্বাচন একই দিনে প্রতিটি জেলা বারে হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন। আর প্রয়োজন তরুণ আওয়ামী আইনজীবীদের মধ্যে কিছু ‘সিল মারা বিশারদ’
তৈরি করা। হাতে সময় আছে প্রায় আরও তিন সপ্তাহ।

৪.
কী দাঁড়াল? দাঁড়াল, প্রথমত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দেশের মানুষ কেন কাকে ভোট দেবে, সেটা সবার আগে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে অন্যরাও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই অধমের বুদ্ধিশুদ্ধি
খুবই সীমিত। তাই অনেক দেরিতে হলেও ২৮ এপ্রিলের সিটি নির্বাচনের ফলাফলে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যের যথার্থতা এই অধম বুঝতে পেরেছে।
যেহেতু বিএনপিকে আর কেউ ভোট দেবেন না, সেহেতু ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ‘ম্যানেজড ইলেকশন’ পন্থাটাই বজায় রাখতে হবে। সিটি নির্বাচনের পর এই ‘ম্যানেজড’ পন্থাটা বার কাউন্সিল দিয়ে শুরু করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের বেলায়ও ক্রমান্বয়ে প্রয়োগ করা যায়। দরকার হলে ২০৪১ সাল পর্যন্ত যাতে দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনায় কেউ বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।
সবশেষে তিন সিটির তিন নবনির্বাচিত মেয়রকে অভিনন্দন। হয়তো অনেকে আপনাদের বলতে পারেন বা সমালোচনা করতে পারেন এই বলে যে আপনাদের বিজয়ের আইনি, নীতি, নৈতিকতার ভিত্তি নেই। প্লিজ ওতে দমে যাবেন না বা দুঃখ পাবেন না। কারণ, এ দেশ থেকে আমরা নীতি, নৈতিকতা আর আইনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছি। সব ইলেকশনই ম্যানেজড। সবাইকে অভিনন্দন।
ড. শাহদীন মালিক: অাইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন