default-image

রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুনর্নির্বাচিত হলে পশ্চিম তীর ও জর্ডান উপত্যকা ‘অ্যানেক্স’ বা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করবেন। এই ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে। কিন্তু এখানে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রযোজ্য নয়। অনাগরিক আরব ফিলিস্তিনিরা এখানে সামরিক শাসনের অধীন। এই ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো এখানে ইসরায়েলি আইন প্রয়োগ করা।

এ বিষয়ে ইসরায়েলি ইহুদিদের মনোভাব জানতে সম্প্রতি একটি জরিপ করা হয়েছে। ৬ মে প্রকাশিত ওই জরিপের চমকপ্রদ ফলাফলে অনেকেই বিস্মিত হবেন। এতে উঠে এসেছে যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইহুদিই চান না পশ্চিম তীরের আলোচ্য অংশবিশেষ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে পরিণত হোক! আরও মজার বিষয় হলো ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি সংগঠন ওই জরিপ করেছে। সংগঠনের নেতা ইসরায়েলি সাবেক উপসেনাপ্রধান। এই সংগঠন নিজেরাও পশ্চিম তীর অন্তর্ভুক্তকরণের পক্ষে নয়।

আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলে যখন ওই জরিপের ফলাফল শেয়ার করলাম, তখন দুজন মন্তব্য করলেন। একজন লিখেছেন, ‘দশকের পর দশক রক্তপাতে এরাও মনে হয় ক্লান্ত।’ আরেকজন কৌতুকের ছলে লিখেছেন, ‘ইহুদিরা ভালো হয়ে গেলে তো সমস্যা, গালি দেব কাদের?’ ইহুদিদের আপাত ‘উদারতা’ দেখেই বোধ হয় অনেকে সেখানে ‘হার্ট রিঅ্যাক্ট’ও দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইসরায়েলের ইহুদিরা রক্তপাত করে ক্লান্তও হননি, আর সেই অর্থে ‘ভালো’ও হননি। তাঁরা স্রেফ কৌশলী হয়েছেন।

এ নিয়ে দ্বিমত নেই যে তেল আবিবের শহুরে বাম ধারার ইহুদিরা অন্যায় বলেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্তকরণের বিরোধী। বলাই বাহুল্য, সামগ্রিক জনসংখ্যার অনুপাতে এই ইহুদিদের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ ডানপন্থীদের মধ্যে আবার এই প্রশ্নে বিরোধ আছে। এক পক্ষ হলো গতানুগতিক ডানপন্থী। তাদের বক্তব্য, এই ভূখণ্ড আমাদের, অতএব এখনই একে ইসরায়েলের মানচিত্রের অংশ করা হোক। অপর দিকে আরেক পক্ষ বামপন্থীদের মতো অন্তর্ভুক্তকরণের বিরোধী বটে, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে।

পশ্চিম তীরের বেশ খানিক অংশ এখন ইহুদি-বসতিস্থলে ভরা। দখলকৃত (occupied) এই ভূখণ্ডকে রক্ষণশীল ইহুদিরা প্রাচীন ইসরায়েলের ‘জুডিয়া ও সামারিয়া’ অঞ্চল আখ্যা দিয়ে একে ইসরায়েলের অংশ করার দাবি জানান। কিন্তু সমস্যাটা হলো কোনো দেশ যখন একটি ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত (annex) করে, তখন ওই ভূখণ্ডের সব অনাগরিক অধিবাসী সেই দেশের নাগরিক হয়ে যান। অর্থাৎ কাগজে–কলমে হলেও পশ্চিম তীরের আরবদের ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্তত সাম্প্রতিক অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক আইনেও সে রকম বলা আছে। কিন্তু ইসরায়েল কবেই–বা আন্তর্জাতিক আইনকে কেয়ার করেছে? সমস্যা হলো এ ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়।

যদি আরবদের নাগরিক বানানো না হয়, তাহলে ইসরায়েলকে ‘জাতি বিদ্বেষী রাষ্ট্র’ আখ্যা না দেওয়ার কোনো কারণ থাকবে না। নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ দাবি করার কোনো মুখ ইসরায়েলের থাকবে না। এখন যদিও বাস্তবে অবস্থা সে রকমই, কিন্তু তখন ইসরায়েল হবে ‘জাতি বিদ্বেষী রাষ্ট্রে’র টেক্সটবুক উদাহরণ।

অর্থাৎ এখানে একটি প্যারাডক্স আছে। এই প্যারাডক্সের কারণেই ইসরায়েলের বেশির ভাগ মানুষ এখনো ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র, অর্থাৎ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থক। ঠিক এই প্যারাডক্সের কারণেই পুরো ফিলিস্তিন এখনো গ্রাস করেনি ইসরায়েল। কেননা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যোগ করলে ইহুদিদের চেয়ে আরবদের সংখ্যা খুব কম নয়। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে জন্মহার বেশি, ফলে খুব দ্রুতই আরবরা সামগ্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। অর্থাৎ যদি ফিলিস্তিন আর ইসরায়েল একীভূত হয়, তাহলে তত্ত্বগতভাবে আরবরা হবে ওই নয়া রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি। এ কারণেই অনেক ফিলিস্তিনি সমর্থক দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বদলে ইদানীং ‘এক রাষ্ট্র সমাধান’–এর দাবি তোলা শুরু করেছেন।

ইসরায়েলি ইহুদিদের এই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে নিউইয়র্ক টাইমসে গোঁড়া ডানপন্থী পর্যবেক্ষক ড্যানিয়েল পাইপসের লেখা এক নিবন্ধে। তিনি মিডল ইস্ট ফোরাম নামে একটি থিঙ্কট্যাংকের প্রেসিডেন্ট৷ পশ্চিম তীর অ্যানেক্সেশন প্রশ্নে স্পষ্ট করে লিখেছেন, তিনি এটি সমর্থন করেন না। কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, ‘পশ্চিম তীর অন্তর্ভুক্ত করার মানে হলো আরও ফিলিস্তিনি হয়তো ইসরায়েলের নাগরিক হওয়ার উপযুক্ত হবেন। এটি হবে গুরুতর এক ভুল। কেননা আমার মতে আরব নাগরিকেরাই ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের চূড়ান্ত শত্রু।’

আরেক ধরনের ইহুদিও আছেন। তাঁরা আরেক কাঠি সরেস। তাঁরা চান ‘জুডিয়া ও সামারিয়া’র মতো ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। অল্প কয়েকজন ফিলিস্তিনিকে নাগরিকত্ব দিলে অসুবিধা নেই। পূর্ব জেরুজালেম তো আগে থেকেই ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত। আর শেষে গাজা ও পশ্চিম তীরের ক্ষুদ্র অংশ মিলিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বানিয়ে ফেরত আসুক ইসরায়েল। এতে সব কূলই রক্ষা পাবে। গাজা ও পশ্চিম তীরের মধ্যে ব্যবধান এত বেশি যে এই নয়া ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কখনোই ইসরায়েলের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

কিন্তু সমস্যা হলো ইসরায়েলের ভেতরই আরব নাগরিকদের জন্মহার ইহুদিদের চেয়ে বেশি। অতএব এখন সংকট কাটানো গেলেও, বহু বছর পর হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্ন উঠবেই। তা ছাড়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভবও নয়। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েল যে ভূখণ্ড দখল করেছে, সেই ভূমি (যেমন: পূর্ব জেরুজালেম) অন্তর্ভুক্ত করলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকৃতি দেয়নি। হালে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করেছেন। কিন্তু ওই দখল করা ভূখণ্ডই নয় শুধু, পরে ফিলিস্তিনি বসতির বেশ গভীরে ইহুদি সেটেলাররা বসতি স্থাপন করেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চৌকির জন্য সামরিক বাহিনী আগে জমি দখল করে। এরপর সেখানে বা আশপাশে সেটেলাররা এসে জড়ো হয়। গাজা থেকে মাত্র আট হাজার সেটেলার সরাতেই ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে বেগ পেতে হয়েছিল। এখন এই হাজার হাজার সেটেলারকে সরানো রীতিমতো অসম্ভব। অতএব তারা যেখানে বসবাস করে, সেই অঞ্চলকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করলেও প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নাগরিক হওয়ার যোগ্য হবেন।

আরও চরম ইহুদিও আছেন। যেমন পোড় খাওয়া রাজনীতিক অ্যাভিগদর লিবারম্যান বলেছেন, নয়া ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত হলে সেখানকার ফিলিস্তিনিদের ভাগিয়ে দিতে হবে। অথবা ইসরায়েলের নাগরিক হতে হলে ‘আনুগত্যের পরীক্ষা’ দিতে হবে। পাস না করলে ভোট দেওয়াসহ কিছু অধিকার থাকবে না।

আরেক নেতা নাফতালি বেনেট ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হতে দিতে চান না, আবার ফিলিস্তিনি সব ভূখণ্ড ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তও করতে চান না। তিনি চান সেটেলার–অধ্যুষিত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করে পশ্চিম তীরের বাকি অংশে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের শুধু ‘স্বায়ত্তশাসন’ দেওয়া হোক। এই স্বায়ত্তশাসন মানে পৌরসভার সুবিধা, অর্থাৎ আবর্জনা সংগ্রহ করাসহ ইত্যাদি ইত্যাদি অধিকার! অথবা সেই ক্ষুদ্র অংশ জর্ডানকে নিতে বলা হোক। আর গাজা দিয়ে দেওয়া হোক মিসরকে। ব্যস, ল্যাঠা চুকে গেল! নতুবা পুরো পশ্চিম তীর অন্তর্ভুক্ত করে, ফিলিস্তিনিদের ভাগিয়ে জর্ডানে পাঠানো হোক। জর্ডানকেই বলা হোক জর্ডান নদীর ওপারে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র করার জায়গা দিতে!

এমন অদ্ভুতুড়ে সব নোংরা চিন্তাভাবনা আছে ইসরায়েলি ইহুদি নেতাদের মনে। তবুও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান যেহেতু এখন মৃতপ্রায়, সুতরাং এক রাষ্ট্র সমাধানের গুঞ্জন ক্রমেই বাড়ছে। যেমন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এর ওপর এক সভা হয়েছে। সেখানে অনেকে দুই ভূখণ্ডকে এক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেডারেল পদ্ধতি প্রয়োগ করে দুই রাজ্য সৃষ্টির কথা বলছেন। দুই রাজ্যে থাকবে আলাদা আইন সভা। ফিলিস্তিনিরা তাদের শরণার্থীদের ফেরত আসার অধিকার পরিত্যাগ করবে। বিনিময়ে বিদেশে জন্ম নেওয়া ইহুদিদের ইসরায়েলের নাগরিক হওয়ার অধিকার রহিত করতে হবে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়। সামরিক বাহিনীর কম হবে? রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা থাকবেন? কার ওপর কে খবরদারি ফলাবেন?

যা-ই হোক, ইসরায়েল জানে এক রাষ্ট্র সমাধান যে রূপেই আসুক না কেন, তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই সমাধানে তাদের ইহুদিত্ব থাকে না। দেশটি সম্প্রতি ‘ইহুদিদের জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতিরাষ্ট্র’সংক্রান্ত আইন পাস করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইহুদিত্ব বনাম গণতন্ত্র—এ দুইয়ের মধ্যে প্রথমটিই বেছে নিচ্ছে ইসরায়েল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন