default-image

ফেসবুক ও তার কিছু করপোরেট সহযোগী প্রতিষ্ঠান এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে এখন বিশ্বের অন্য একটি বিকল্প ক্রিপ্টোকারেন্সি (ইলেকট্রনিক মুদ্রা) দরকার। এটি করতে পারলে তারাই এই ইলেকট্রনিক মুদ্রার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে পারবে। ফেসবুকের এই ভাবনার মধ্য দিয়ে একুশ শতকের আমেরিকান পুঁজিবাদী অর্থনীতির গলদ সামনে চলে এসেছে। 

এই বিকল্প মুদ্রার প্রচলন করার উদ্যোগের সময়টিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। বিগত দিনে প্রচলিত মুদ্রা সম্পর্কে প্রধান অভিযোগ ছিল অস্থিতিশীলতা; অর্থাৎ হুট করেই মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেওয়া। ফেসবুকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতর্কিত স্ফীতির কারণে এই প্রচলিত মুদ্রার ওপর মানুষের আস্থা কমছে। কিন্তু ডলার, ইউরো, ইয়েন এবং রেনমিনবি দীর্ঘদিন স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। আজকের দিনে এসব মুদ্রার স্ফীতি নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই, দুশ্চিন্তার কিছু যদি থেকেই থাকে তবে তা মুদ্রাস্ফীতি অস্বাভাবিক হ্রাস নিয়ে থাকতে পারে। 

এ ছাড়া বিশ্ব এখন লেনদেন ব্যবস্থায় আশাতীত স্বচ্ছতা আনতে সক্ষম হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থাকে এমন একটি জায়গায় আনা সম্ভব হয়েছে যে অর্থ পাচার বা অর্থ জালিয়াতি করা খুবই কঠিন। প্রযুক্তির কল্যাণে আস্থাযোগ্যভাবে লেনদেন করা যাচ্ছে। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি ছাড়াই গ্রাহকেরা পণ্য কিনে এক মুহূর্তের মধ্যে বিক্রেতার হিসাব নম্বরে অর্থ স্থানান্তর করে দিতে পারছেন। এ অবস্থায় অবৈধ লেনদেন ও অর্থ পাচার ঠেকাতে নতুন করে আমাদের কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সির দরকার নেই। বরং এ ধরনের ইলেকট৶নিক মুদ্রা চালু করা হলে অবৈধ অর্থের লেনদেন ও জালিয়াতি বেড়ে যাবে। 

আমাদের বিদ্যমান মুদ্রা ব্যবস্থা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার আসল সমস্যা হলো, লেনদেন নিয়ন্ত্রণকারী কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের অভাব। এর ফলে গ্রাহকদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের যে ব্যয় হওয়া উচিত তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ভিসা, মাস্টারকার্ড, আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যবহার করার মাধ্যমে খরচ করতে হচ্ছে।

ব্যাংকগুলো বাড়তি মুনাফার জন্য গ্রাহকদের ঘাড়ে এই ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডেবিট কার্ডের ফি সহনীয় মাত্রায় রাখার জন্য ডারবিন অ্যামেন্ডমেন্ট নামের একটি সংশোধনী আনা হয়েছিল। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয়নি। কারণ, ক্রেডিট কার্ডের ফি কমেনি। এই ফি হিসেবে আগের মতোই মাত্রাতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকদের কাছ থেকে কেটে নেওয়া হয়। ক্রেডিট কার্ডের ফি কমানোর ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া প্রশংসা করার মতো ভূমিকা রেখেছে। 

এ অবস্থায় ফেসবুক ‘লিবরা’ নামের একটি ইলেকট৶নিক মুদ্রা চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। ফেসবুক বলছে, আন্তর্জাতিক সব মুদ্রার মূল্যমানের সঙ্গে সংগতি রেখে এই মুদ্রার মূল্যমান ধরা হবে। প্রচলিত মুদ্রা দিয়ে লিবরা কেনা যাবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী তাঁর অ্যাকাউন্টে যে লিবরা জমা রাখবেন, তার বিপরীতে ফেসবুক তাঁকে কোনো সুদ দেবে না। কিন্তু ফেসবুক গ্রাহকের জমা রাখা সেই লিবরা বিনিয়োগ করে তা দিয়ে আয় করতে পারবে। কোটি কোটি গ্রাহকের জমা রাখা কোটি কোটি লিবরা লগ্নি করে ফেসবুক আয় করবে, কিন্তু সেই আয়ের কোনো অংশ গ্রাহক পাবে না। যেখানে ইউএস ট্রেজারি বিল বা মানি মার্কেট ফান্ডে অর্থ জমা রাখলে অর্থ বেশি সুরক্ষিত থাকবে, সেখানে বিনা সুদে লোকে কেন ফেসবুকের কাছে অর্থ ফেলে রাখবে? ফেসবুকের এই নীতি আমেরিকার অর্থসংক্রান্ত আইনও সমর্থন করে না। 

এখন পর্যন্ত লিবরা প্রচলন করার বিষয়ে ফেসবুক যেসব তৎপরতা চালিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বিশদভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক খাত যেসব নীতিমালার আওতায় কাজ করে, ফেসবুককে একই নীতিমালার অধীনে আসতে হবে। ফেসবুক তার গ্রাহকদের জমা রাখা লিবরাকে প্রচলিত মুদ্রায় ভাঙিয়ে তা লগ্ন করবে না, সেই প্রতিশ্রুতি তাকে দিতে হবে। 

ফেসবুক নানা কারণে ইতিমধ্যে অনাস্থার কারণ হয়েছে। সে কারণে ব্যাংকিং খাতে তার এই আবির্ভাবকে সহজভাবে আস্থার সঙ্গে নেওয়া কঠিন। ২৪০ কোটি সক্রিয় ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য–উপাত্ত এ মুহূর্তে ফেসবুকের হাতে। অর্থ জালিয়াতিতে এই উপাত্ত ব্যবহৃত হবে না, ফেসবুক সে নিশ্চয়তা দিতে পারবে কি? 

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট


জোসেফ ই. স্টিগলিৎস নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0