default-image

ফেসবুক খুলে অবাক হয়ে যাই! দেখি, সবাই মিলে একই আচরণ করছে! সবাই কেমন করে জানি একই রকম হয়ে গেছে! সবাই অনুসরণ করছে সবাইকে! একই সঙ্গে একইভাবে পরিবেশিত হচ্ছে একটি সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ! সবাই একই কথা লিখছে! সবাই একই সঙ্গে দুঃখিত কিংবা সুখী! সবাই একইভাবে একই কথার প্রচারক! সবাই একই কথার বক্তা—যেন কোনো শ্রোতা আর নেই! অবাক হয়ে এই আজব কাণ্ড দেখতে থাকি আর ভাবতে চেষ্টা করি, কেন এমনটি হচ্ছে! যখন বিখ্যাত কারও অসুস্থতার সংবাদ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সবাই যেন সেই মানুষটির মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ থাকে! খুব ভয়াবহ এই অপেক্ষা! কারও আবার এই অপেক্ষা সহ্য হয় না! সাম্প্রতিক সময়ে কারও মৃত্যুর আগেই মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হয়েছে এই ফেসবুকে! একাধিকবার! মৃত্যুসংবাদটিও পরিবেশন করতে হবে সবার আগে, এই প্রতিযোগিতা প্রবণতা থেকেই অস্থির কেউ কেউ এই কাণ্ড করছেন!

সবাই এখন সবার আগে সবকিছু জানাতে চায়! মানুষের মৃত্যু বা ক্রিকেট স্কোর যা-ই হোক না কেন! কোনো কিছুর সঙ্গে আর কোনো কিছুর পার্থক্য নেই! ‘আমি আগে জানাতে পারলাম’, এটাকেই কৃতিত্ব ভাবছে অনেকে! প্রথম ঘোষণার যোগ্যতা! সবাই এখন একইভাবে এবং এককভাবে সবকিছুর প্রথম প্রচারক হতে চাইছে! প্রথম হতে গিয়ে সবাই যে একই রকম হয়ে যাচ্ছে, সেই খেয়াল নেই! সবাই অন্য কাউকে না দেখে কেবল নিজেকে দেখছে! ফেসবুক এখন সবার একই সঙ্গে একই রকম সত্য-মিথ্যার প্রচারভূমি হয়ে উঠেছে! মিথ্যা সংবাদের (ফেইক নিউজ) রমরমা বাজার এভাবেই কি তৈরি হলো?

অবাক লাগে ভাবতে, ফেসবুক সবাই মিলে একই আচরণ করার এক সম্মিলিত সফলতা নাকি ব্যর্থতার নাম হয়ে উঠছে! ভাবি, একটা অনগ্রসর সমাজে ব্যক্তি তার মৌলিকত্ব হারালেই বোধ হয় এ রকম হয়! দ্রুত অন্যের অনুকরণ করতে গিয়ে সবাই নিজের বোধ-বিশ্লেষণ-অনুভূতির জায়গাটা হারিয়ে বসে আছে! কী এমন পিছিয়ে পড়ার ভয় আমাদের? একটু দেরি হলে কিছু কী হারিয়ে ফেলব? আমাদের নাম-ধাম-ইজ্জত-সম্মান-অস্তিত্ব আর থাকবে না? এই গণ-অনুকরণের মনস্তাত্ত্বিক-সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কী? আনন্দিত হওয়ার বা ভয় পাওয়ার বা ঘৃণা প্রকাশের এমন হুজুগে প্রবণতা খুঁজে পাওয়া যাবে কি আর কোনো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে?
ফেসবুকে আমরা যা করি, আমাদের বাস্তবটা তার চেয়ে খুব দূরের কিছু না! সম্ভব নয় ফেসবুককে আমার জীবন থেকে আলাদা করা! ফেসবুক এই কারণে সমাজবিজ্ঞানের নতুন এক গবেষণাগার হয়ে উঠেছে! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ব্যক্তি-সমাজকে জানারও অন্যতম প্রকাশ্য-প্রমাণিত উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একটু নজর দিলেই দেখব যে আমরা অনুভূতিপ্রবণ হওয়ার চেয়েও প্রতিক্রিয়াপ্রবণ হয়ে গেছি বেশি!

অল্প সময়ের ব্যবধানে কারও মৃত্যুসংবাদ প্রচার হচ্ছে, কাউকে প্রশংসা-ভর্ৎসনা করা হচ্ছে এবং সেই একই ব্যক্তি প্রায় একই সময়ে একগাদা খাবারের ছবিও পোস্ট করছেন! লক্ষ করলেই দেখা যায়, সারা দিন বিচিত্র-বিপরীতমুখী কর্মকাণ্ড-প্রচারণায় সবাই ব্যস্ত! কোনো কিছুতেই যেন আমরা তৃপ্ত হচ্ছি না! আমাদের অস্থিরতা-অস্বস্তির এক ভয়াবহ মূর্তরূপ হয়ে গেছে সামাজিক মাধ্যম! হতেই হবে এ রকম! বাস্তব থেকে আলাদা করা সম্ভব নয় ভার্চুয়াল!

আসলে একটা উদ্দেশ্যহীন জীবন এই রকম তাৎক্ষণিকতা নিয়েই বাঁচে! আদর্শহীন জীবনে টিকে থাকতে হলে প্রতিদিন অনেক কৃত্রিম উত্তেজনার প্রয়োজন হয়! জীবন লক্ষ্যহীন হলেই তাতে একটু পর পর জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করাতে হয়! জীবন থেকে যখন জীবনের আসল অর্থটা হারিয়ে যায়, তখন অর্থহীন ঘটনা সৃষ্টি করেই মানুষকে বাঁচতে হয়! এই রকম অন্তঃসারশূন্য জীবনের আবার ফেসবুক পেজ বানাচ্ছেন কেউ কেউ- সেই কৃতী (!) জীবনকে (?) পছন্দ করার জন্য নিজেই বন্ধুদের কাছে প্রেরণ করছেন নিজেকে নিয়ে বানানো নিজের পেজের লিংক! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘যা কিছু করতে পারা’র স্বাধীনতা মানুষকে একাধারে লোভী-বোধহীন-লজ্জাহীনও করে তুলেছে কিছুটা! সমাজ-সভ্যতা ভেদে এর চর্চা-চালচিত্র দেখছি আমরা বিনা খরচে!

এখন বোধ হয় সামগ্রিকভাবেই মানব সভ্যতায় সংকট-খরা যাচ্ছে! একচেটিয়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভোগী-বাজার সংস্কৃতি মানুষকে খুব খণ্ডিত-তাৎক্ষণিক-স্থূল-প্রচারমুখী বানিয়ে ফেলেছে! এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে আমাদের মতো দেশের পিছিয়ে থাকা অবিকশিত সমাজের যাবতীয় হীনম্মন্যতা আর ভারসাম্যহীনতার ব্যক্তি-বিকৃতি! এ সবকিছুর প্রতিক্রিয়া-প্রতিবিম্ব-পার্শ্বফল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের প্রোফাইল আর দিনমান কর্মকাণ্ড! মানুষের বিচ্ছিন্ন আচরণটি কিন্তু তার সামগ্রিক সত্তারই প্রতিফলন! সবাই যা করছে, আমাকেও তা করতে হবে না! বরং সবাই মিলে যখন বিভ্রান্ত হবে, তখন সেই বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকতে প্রয়োজনে আমাকে একা থাকা শিখতে হবে! জানতে হবে, অনেকগুলো অনির্দিষ্ট মানুষের বোধহীন জটলায় যোগ দেওয়ার চেয়ে নিজেকে স্পষ্ট-স্বচ্ছ-প্রতিশ্রুত রেখে অপেক্ষমাণ রাখাটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ! অসক্রিয়তাও হতে পারে জীবনের একটা পর্যায়ের সচেতন সক্রিয়তা! সবার একই রকম ভুল-ভ্রান্তি কাজ-আচরণে নিজেকে বিযুক্ত রাখাটাও কখনো জীবনের প্রধান একটি কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

মনজুরুল আজিম পলাশ: সাংস্কৃতিক সংগঠক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0