মোদি মুসলমান নারীদের ‘পাশে দাঁড়াতে’ তিন তালাককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন তৈরি করেছেন। কিন্তু শিগগিরই তাঁর ভণ্ডামি ধরা পড়ল। তিনি যে মুসলমান মেয়েদের ‘বেহেন-বেটিয়া’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, শাহিনবাগ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় তাঁদেরই তিনি ‘বিদেশি মদদপুষ্ট দেশদ্রোহী’ বলতে এক মুহূর্ত সময় নেননি। পরে তিনি প্রতিবাদী কৃষকদের ‘আন্দোলনজীবী’ ও পরজীবী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

মোদির লাখ লাখ অনুগামী এই যুক্তি দিয়ে থাকেন যে প্রতিটি খারাপ কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা উচিত হবে না এবং হিন্দুত্ববাদী ধর্মগুরুরা প্রতিনিয়ত যে ঘৃণা ও বর্বরতার প্ররোচনা দিয়ে থাকেন, তার প্রতিটি অংশের সঙ্গে তাঁকে জড়ানোটা প্রত্যাশিত হতে পারে না। কিন্তু দিন শেষে সত্যটা হলো, ভারতে এখন মুসলমানবিদ্বেষ প্রবলভাবে ছড়ানো হচ্ছে।

পাকিস্তানে জিয়াউল হকের স্বৈরশাসনের মধ্যে ফয়েজের ‘হাম দেখেঙ্গে’ নজমটির জন্ম হয়েছিল। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পুরোটা সময় ফয়েজ জেলে ছিলেন এবং জেলে থাকা অবস্থায় তিনি ‘আজ বাজার মে...’ লিখেছিলেন। এই দুটো নজমেই তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বাণী দিয়েছেন।

হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ভারতবর্ষে মুসলমান শাসকদের গণহত্যা চালানোর মতো একটা ইতিহাসের দরকার ছিল। কিন্তু সে ধরনের ইতিহাস নেই। সে কারণেই আওরঙ্গজেব ও সুলতান মাহমুদ গজনবীর উৎপীড়নের কিছু অসমর্থিত গল্প সামনে এনে কট্টর ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ রচনা করে যাচ্ছেন। যে টিপু সুলতান সর্বশক্তি দিয়ে, এমনকি নিজের জীবন দিয়ে ব্রিটিশদের প্রতিহত করেছিলেন, তাঁকেও এই দক্ষিণপন্থীদের অপমান থেকে রক্ষা করা যায়নি। তাঁদের অনেকে দাবি করা শুরু করেছেন, তাজমহল এবং কুতুব মিনারের স্থলে ‘হিন্দু মন্দির’ ছিল এবং সেগুলো ভেঙে তার স্থলে এসব মুসলিম স্মৃতিসৌধ বানানো হয়েছে।

এই পটভূমিতে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের নজম (নজম হচ্ছে উর্দু ভাষায় লেখা কবিতার একটি বিশেষ আঙ্গিক) পর্যন্ত এখানে নিষিদ্ধ হচ্ছে। পাকিস্তানে জিয়াউল হকের স্বৈরশাসনের মধ্যে ফয়েজের ‘হাম দেখেঙ্গে’ নজমটির জন্ম হয়েছিল। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পুরোটা সময় ফয়েজ জেলে ছিলেন এবং জেলে থাকা অবস্থায় তিনি ‘আজ বাজার মে...’ লিখেছিলেন। এই দুটো নজমেই তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বাণী দিয়েছেন।

ভারতের বর্তমান মোদি সরকার সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিসিএ) পাঠ্যপুস্তক থেকে এই নজমগুলো সরিয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে এই সরকারের অধীনে কোনো ধরনের প্রতিবাদই অনুমোদিত নয়। আমি ভাবছি, এ দেশে কেউ কি এই ভয় পাচ্ছে যে এই কবিতাগুলো আমাদের দেশের কারারুদ্ধ বুদ্ধিজীবী, অধিকারকর্মী এবং শিক্ষাবিদদের সরকারবিরোধিতায় উজ্জীবিত করবে? নাকি ফয়েজ পাকিস্তানি, শুধু সে কারণে তাঁর কবিতা বাদ দেওয়া হলো? পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘হাম কে থেহরে আজনবি...’ নজমটি অপসারণ করা খুবই বিস্ময়কর। কারণ এটি ফয়েজ লিখেছিলেন ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষতে মলম দেওয়ার জন্য, সেখানে নুনের ছিটা দেওয়ার জন্য নয়। নতুন জন্ম নেওয়া দেশ বাংলাদেশে সফরে গিয়ে সেখানে তিনি এই নজমটি লিখেছিলেন। স্কুলিং বোর্ডের যে কর্তাব্যক্তিরা এই কবিতাগুলো নিষিদ্ধ করেছেন, তাঁরা আদৌ কবিতাগুলো বুঝতে পেরেছেন কি না, তাই ভেবে আমি সত্যিই অবাক হই।

ফয়েজের কবিতা বাতিলের শুরু করেছিলেন আইআইটি কানপুর কলেজের পর্ষদের একজন সদস্য। তিনি প্রথম অভিযোগ তোলেন, ‘সাব তাজ উছালে যায়েঙ্গে, সব বুথ উখাড়ে যায়েঙ্গে’ কথাগুলোর মধ্যে সুলতান মাহমুদ গজনবীকে মহিমান্বিত করার দ্যোতনা নিহিত আছে। এটি তাঁকে সংক্ষুব্ধ করেছে। এই ধরনের অদ্ভুত কল্পনাশক্তির একজন মানুষ কী করে আইআইটিতে এলেন, সেটি আমার কাছে আরও বিস্ময়কর মনে হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ‘হাম দেখেঙ্গে’ নজমটি (যেটি ইকবাল বানু গেয়েছিলেন) মুসলমানদের বিক্ষুব্ধ করতে উসকানি দিয়েছে বলে বলা হচ্ছে। অথচ পাকিস্তানে জিয়াউল হকের সময় এই গানটিকে সেখানকার ইসলামপন্থীরা মুসলমানবিরোধী ও কমিউনিস্টপন্থী গান বলে মনে করত।

আমার আশঙ্কা হচ্ছে, শিগগিরই আমাদের দেশে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ অথবা অন্য যেকোনো উর্দু ভাষার কবির কবিতা বা সাহিত্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হতে পারে। আমার ভয় হচ্ছে কবে জানি কোনো কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রশ্নকর্তাকে প্রশ্ন করতে শুনব,‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা’ গানটি কার লেখা? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাকি মুন্সী প্রেমচান্দের? (প্রকৃতপক্ষে এর রচয়িতা আল্লামা ইকবাল)।’

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নাসিরুদ্দিন শাহ বলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন