default-image

মুজিব বর্ষ উপলক্ষে আহূত জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন চলছে। বিভিন্ন দেশে নানা উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হয়ে থাকে। বিদেশি কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মান জানাতেও বিশেষ অধিবেশন বসে। কিন্তু বাংলাদেশে গত ৪৯ বছরে এ ধরনের আয়োজন এই প্রথম। এর মধ্য দিয়ে জাতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ এল। সেই সঙ্গে আত্মজিজ্ঞাসারও।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর প্রস্তাব আনেন এবং এর ওপর সরকারি ও বিরোধী দলের সাংসদেরা আলোচনা করেন। জাতীয় সংসদে যেসব জনপ্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁরা তাঁর রাজনীতি, তাঁর কর্মসাধনা ও মানবিক মূল্যবোধ কতটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। গত কয়েক দিন বিটিভির কল্যাণে সাংসদদের আলোচনা শোনার সুযোগ হয়েছে। আলোচকেরা নিজেদের ব্যর্থতার দায় এড়াতে প্রতিপক্ষকে তুলাধোনা করছেন। এই সাংসদদের অনুরোধ করব পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভা ও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৯৫৫-১৯৫৮ সালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বক্তৃতাগুলো পড়ে নেওয়ার জন্য। তাহলে তাঁরা বুঝতে পারবেন মেঠো বক্তৃতা ও জাতীয় সংসদের আলোচনা এক নয়। সংসদে কথা বলতে হয় যুক্তি ও তথ্য দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বঙ্গবন্ধু স্মারক ভাষণের মাধ্যমে মুজিব বর্ষের বিশেষ অধিবেশন শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা সরকারি ও বিরোধী দলের সাংসদ, সংসদের বাইরে যেসব রাজনীতিক আছেন, তাঁদেরও চিন্তার খোরাক জোগাবে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর জীবনের নানা দিক তুলে ধরার পাশাপাশি বিরোধী দলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর উদার ও সহিষ্ণু আচরণের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। একাত্তরের মতো ঐক্য গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, অগণতান্ত্রিক, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে।’

রাষ্ট্রপতি এমন এক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন এবং সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ার কথা বলেছেন, যখন অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা ব্যাপক রূপ নিয়েছে। পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির হানাও চলছে বিক্ষিপ্তভাবে। সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তিনি সংসদের সব কার্যক্রমে বিরোধী সদস্যদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ন্যাপ থেকে নির্বাচিত তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথা। পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সুযোগ চাইলে সব সময়ই তিনি সুযোগ পেতেন। স্পিকার মাঝেমধ্যে তাঁকে মাইক দিতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু বলতেন, “ওকে সুযোগ দেন, বিরোধী পক্ষের কথা আগে শুনতে হবে।” রাজনৈতিক মতাদর্শের যত অমিলই থাকুক না কেন, বঙ্গবন্ধু কখনো বিরোধী দলের নেতাদের কটাক্ষ করে কিছু বলতেন না, বরং তাঁদের যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। রাজনৈতিক শিষ্টাচার তাঁর জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।’

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দেওয়া বক্তৃতায় সরকারি ও বিরোধী দলের সাংসদেরা স্বাধিকার ও স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নন; সমগ্র দেশের। তাঁকে দলীয় বৃত্তে আটকে রাখা ঠিক নয় বলেও কোনো কোনো সাংসদ মন্তব্য করেছেন। প্রশ্ন হলো জাতীয় সংসদে যাঁরা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন, যাঁরা তাঁর গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা নিয়ে নিয়ত মাঠ গরম রাখেন, তাঁরা নিজেরা কি তা মেনে চলেন? বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করতেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে, আর এখনকার রাজনীতি পরিণত হয়েছে আত্মস্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে।

বঙ্গবন্ধু আমাদের কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রই উপহার দেননি, কীভাবে সেই রাষ্ট্র চলবে সে জন্য মাত্র ১০ মাসে একটি সংবিধানও তৈরি করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সংশোধনীর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদি সংবিধানটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা সংবিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সংবিধানে বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখার বিধান ছিল না। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলেই সংবিধান চার দফা সংশোধন করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইন জারি করা হয়।

আর পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই সেনাশাসক রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোই বদলে দেন। জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে দেন ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আরেক ধাপ এগিয়ে অষ্টম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে ব্যবহার করেই এ দেশের মানুষকে শোষণ করেছিল। এ কারণে বঙ্গবন্ধু ধর্মের নামে রাজনৈতিক দল গঠন করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরই পাকিস্তানি ধারায় ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয় এবং এখনো হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেও জিয়া-এরশাদের সংশোধনী বাতিল করেনি। যদিও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে চার মূলনীতি পুনঃস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। একই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রের কথা আছে। অন্যদিকে দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু আছে। সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনার কথা বলছে। আবার নিবর্তনমূলক আইনগুলোও বহাল রেখেছে। সংবিধান কাটাছেঁড়া করতে করতে এমন জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে যে তার কাঠামোটা থাকলেও নির্যাস নেই। ধড় আছে, প্রাণ নেই।

বিজ্ঞাপন

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে লেখা আছে, ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এখন সেই স্বাধীনতা অধরা মায়ামৃগ হয়ে আছে। তাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না।

রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বিরোধী দলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর সহিষ্ণু মনোভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। সংখ্যায় যত কম হোক না কেন তিনি (বঙ্গবন্ধু) সংসদে বিরোধী দলকে কথা বলতে দিতেন। গণপরিষদ ও প্রথম জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী পড়লে দেখা যাবে, বিরোধী দলের সাংসদেরা কী ভাষায় কথা বলেছেন। বিশেষ করে গণপরিষদে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং গণপরিষদ ও প্রথম জাতীয় সংসদে পাহাড়ি নেতা এম এন লারমা সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে ছাড়েননি। যথেষ্ট সমাজতান্ত্রিক হয়নি বলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাহাত্তরের সংবিধানে সইও করেননি। এম এন লারমা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। এ জন্য সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু তাঁদের দেশদ্রোহী কিংবা বিদেশি এজেন্ট বলে আখ্যায়িত করেননি।

রাষ্ট্রপতি বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কখনো বিরোধী দলকে কটাক্ষ করতেন না। কিন্তু এখন যাঁরা রাজনীতি করেন, সে হোক সরকারি দল বা বিরোধী দল, একে অপরকে নিয়ত কটাক্ষ করে কথা বলেন। তাঁরা নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে অপরের মুখ ম্লান করতেই সচেষ্ট থাকেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি যদি আমরা সত্যিই শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তাহলে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর সারা জীবনের সংগ্রাম, তাঁর মানবিক মূল্যবোধকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। অন্যকে ছোট বা কটাক্ষ করে নিজে বড় হওয়া যায় না, এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা।

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

sohrabhassan55@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0