বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইসলামের এ প্রথম সামরিক যুদ্ধে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমান বাহিনী বিজয় লাভ করে। মুসলমানদের এই বিজয় অন্যদের কাছে এই বার্তা পৌঁছায় যে মুসলমানরা আরবে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং এর ফলে নেতা হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-এর অবস্থান দৃঢ় হয়।

মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার পুরোনো রাস্তায় গেলে বদরের প্রান্তর পড়ে। নতুন রাস্তা হওয়ায় অনেক কম দূরত্বে, কম সময়ে মদিনা পৌঁছানো যায়। হজের পরে এক শুক্রবার ফজরের নামাজ কাবা শরিফে পড়ে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য, জুমার নামাজ মসজিদে নববীতে আদায় করব। মদিনার যাওয়ার আগে বদরের প্রান্তরে গেলাম।

সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, মদিনা হজ অফিসের গাড়িচালক রিপন আলী, মোহাম্মদ রজব আর আমি। মনে মনে গর্ব বোধ করছিলাম, ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায় যাচ্ছি। বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে গাড়িতে বসে আমরা নিজেদের মধ্যে অনেক আলাপ করছিলাম। বেশ কটি পুরোনো বাড়ি। কোনোটির দরজা আছে ছাদ নেই। আবার কোনোটির ছাদ আছে তো দরজা নেই। গাড়ি বালুময় দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলছে।

default-image

গাড়িচালক বললেন, ‘আমরা এখন আবুজার গাফফার উপত্যকা অতিক্রম করছি।’ এর পরে বদর উপত্যকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে একজন বললেন, ‘এটা মালাইকা পাহাড়।’ সড়কের দুই পাশে দেখা যাচ্ছে আধুনিক দালান। আরও একটু এগিয়ে যেতেই সামনে হাতের বাঁ পাশের একটি বড় শ্বেত পাথর-বদরযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা এখানে খোদাই করে রাখা হয়েছে। দেখা গেল, তালিকায় ১৪ জনের নাম রয়েছে। অনেকেই ছবি তুললেন। যেখানে শহীদদের নামের তালিকার পাথর রয়েছে, তার উল্টো দিকটা বদরযুদ্ধ ক্ষেত্র। ওটাকে দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। গাড়ি এগিয়ে ডান দিকে ঘুরে একটু সামনে গিয়ে মসজিদে আরিস।

মহাসড়কের দুই পাশে ধু ধু বালুর চর, মাঝেমধ্যে বালুর টিলা ও পাহাড়। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই বালুর টিলা, বালুর পাহাড় ও ধু ধু বালুর চরে চোখ আটকে যায়। সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটে চলছে তো চলছে। আরও প্রায় ৩০-৪০ মিনিট পরে গাড়িচালক বললেন, সামনে রয়েছে একটি মিষ্টিপানির কূপ, যার নাম ‘বিরে শিফা’। এটি দূষিত ও বিষাক্ত পানির কূপ ছিল। পরবর্তী সময়ে রাসুল (সা.) এখানে থুতু নিক্ষেপ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করলে এর বিষাক্ত পানি সুপেয় পানিতে পরিণত হয়।
আমরা সবাই নেমে পড়লাম। অনেকেই বোতল নিয়ে পানি পান করছে। আমরাও পানি পান করলাম।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করেন। আল আরিশ পাহাড়ের পাদদেশে মুসলিম বাহিনীর শিবির স্থাপিত হলো। ফলে পানির কূপগুলো তাদের আয়ত্তে ছিল। আর নবী করিম (সা.) সৈন্য সমাবেশের জন্য এমন একটি জায়গা বেছে নেন, যেখানে সূর্যোদয়ের পর যুদ্ধ হলে কোনো মুসলমান সৈন্যের চোখে সূর্যকিরণ পড়বে না। প্রাচীন আরব রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে মল্লযুদ্ধ হয়।

অমুসলিমদের সেনাসংখ্যা ছিল ১০০০। ছিল ১০০টি ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম এবং অসংখ্য উট। অমুসলিমদের সেনাপতি ছিলেন ওতবা বিন রবিআ। যুদ্ধে ৭০ জন অমুসলিম নিহত হন এবং বন্দীও হন ৭০ জন।

এদিকে মুসলিম বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। মুহাজির ছিলেন ৮২ জন। আর বাকি সবাই আনসার। আওস গোত্রের ৬১ জন এবং খাজরাজ গোত্রের ১৭০ জন। মুসলিমদের উট ও ঘোড়ার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭০টি ও ২টি। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন শহীদ হন। এই যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে নবীজি (সা.)-এর প্রধান শত্রু আবু জাহেলের নিহত হওয়া। এ প্রসঙ্গে দুই কিশোরের অসম সাহসিকতা নিয়ে একটি বীরত্বের গল্প প্রচলিত আছে।

তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। চারদিকে শত্রুকে খুঁজছে সবাই। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লক্ষ করেছিলেন, শত্রুকে কীভাবে ঘায়েল করা যায়। তাঁর দুই পাশে এসে দাঁড়াল দুটি বালক। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে তারা বলল, চাচা, আপনি আবু জাহেলকে চেনেন? আমাদের দেখিয়ে দিন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) আবু জাহেলকে দূর থেকে দেখিয়ে দিলেন। ছুটতে ছুটতে গিয়ে আবু জাহেলের সামনে হাজির হলো দুজন বালক। আবু জাহেল ঘোড়ায় চড়ে ছুটছিলেন। বালক দুজনের পক্ষে ঘোড়ায় চড়ে থাকা আবু জাহেলের শরীরে সরাসরি আঘাত করা অসম্ভব ছিল। একজন আক্রমণ করল আবু জাহেলের ঘোড়ায়।

আরেকজন আবু জাহেলের পায়ে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যেই আবু জাহেল মাটিতে গড়িয়ে পড়লেন। মাটিতে পড়েই ছটফট করতে লাগলেন তিনি। বালক দুজন সমানতালে তাঁকে আঘাত করে চলল। তারা আবু জাহেলের শরীরের ওপর চড়ে বসল। তখনো আবু জাহেল মারা যাননি। দূর থেকে বালকদের অভাবনীয় আক্রমণে আবু জাহেলের এই মরণদশা দেখে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এগিয়ে আসেন এবং আবু জাহেলের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। সাহসী কিশোর দুজনের একজনের নাম মাআজ। অপরজনের নাম মুআ ওয়াজ।

বদরের যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক নিদর্শন ও অনুপ্রেরণা লাভের অন্যতম শিক্ষা। এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এটা প্রমাণ করে যে সত্যনিষ্ঠ কাজে বিজয়ের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা, ধৈর্য ও সহনশীলতার বিকল্প নেই। এই রমজান মাসে তাই আমাদের প্রার্থনা, আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে যেকোনো কাজে সফলতা লাভে কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়সংকল্প, ধৈর্য ও সহনশীলতা পোষণের তৌফিক দান করুন, যেভাবে তিনি বদর প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীকে দান করেছিলেন, আমিন।

  • ফেরদৌস ফয়সাল প্রথম আলোর হজ প্রতিবেদক
    [email protected]

মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন