default-image

কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে ভৈরব বন্দরের দূরত্ব ৫৬ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে ৯৬ কিলোমিটার। তারপরও জেলা সদরের সঙ্গে ভৈরবের মানুষের যোগাযোগ ক্ষীণ। দাপ্তরিক প্রয়োজন কিংবা মামলা-মোকদ্দমা ছাড়া কেউ কিশোরগঞ্জমুখো হন না। ভৈরব ছাড়া কিশোরগঞ্জের বাকি জনপদ মেঘনার ওপারে।

কিশোরগঞ্জ বাংলাদেশকে তিনজন রাষ্ট্রপতি উপহার দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শেখ হাসিনার আমলের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। শেখ হাসিনার আমলের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের বাড়িও পাশের জেলা নেত্রকোনায়।

ভৈরববাসীর দুঃখ জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও ভৈরবকে জেলা করা যায়নি। যদিও তাঁর সময়ে রাস্তাঘাট অনেক হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের এলাকায় বিপুল উন্নয়নকাজ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ১৯৭০ সাল থেকে যেখানকার জনপ্রতিনিধি, হাওরবেষ্টিত ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম—একসময় ছিল বিচ্ছিন্ন জনপদ। এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায় যেতে নৌকাই ছিল একমাত্র বাহন। মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সেখানে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন সড়ক নির্মিত হয়েছে। সড়ক তিন উপজেলাকে বেঁধে দিয়েছে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জে সরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জিজ্ঞেস করি, ভৈরবের বর্তমান সাংসদ নাজমুল হাসান তো খুবই পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর আমলে এখানে কী কাজ হয়েছে? উত্তরে ভৈরব আওয়ামী লীগের একজন নেতা বললেন, তিনি তো জাতীয় বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। ভৈরবে তেমন আসেন না। ভৈরববাসী মনে করে, ভৌগোলিক কারণে তাঁরা উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে স্থানীয়রা ভৈরবকে জেলা করার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু মেঘনার ওপারের সমর্থন পাননি। তাঁরা ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবেন, তারও উপায় নেই। মাঝখানে নরসিংদী জেলা। ভৈরববাসীর অবস্থা হয়েছে ‘না ঘরকা, না ঘাটকা।’

ভৈরব ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মেঘনার তীরে অবস্থিত ব্যবসাকেন্দ্র। ভৈরব থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে শিমুলকান্দি হাইস্কুল প্রাঙ্গণে বিপ্লবী রেবতী বর্মণের নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিসৌধটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিএনপির আমলে ২০০৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে কারণেই কি না জানি না, বর্তমানে স্মৃতিসৌধটি অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়। জিজ্ঞেস করি, ভৈরবে গর্ব করার মতো কী আছে। তাঁরা বললেন, ভৈরব অবিভক্ত বাংলার অন্যতম প্রধান নৌবন্দর ছিল। এখান থেকে নৌ ও রেলপথে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পণ্য যেত। ভৈরবে উৎপাদিত জুতা আকর্ষণীয় ডিজাইন, কম দাম এবং গুণগত মানের কারণে সারা দেশে জনপ্রিয়। জুতা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুরান ঢাকার পরই ভৈরবের অবস্থান। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০টি গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় মিলিয়ে সাত হাজারের বেশি জুতা তৈরির কারখানা। ভৈরব পৌর এলাকার কমলপুর, জামালপুর, হাজী ফুল মিয়ার পাদুকা মার্কেট, মধ্যেরচর, চণ্ডীবেড়, কমলপুর বাসস্ট্যান্ড, সাদুতলাঘাট, শিমুলকান্দি, বাঁশবাড়ী, গজারিয়া, মানিকদী, কালিকাপ্রসাদসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব কারখানা গড়ে উঠেছে। লক্ষাধিক শ্রমিক এসব জুতাশিল্পে জড়িত। জুতার ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে দুই-তিন হাজার।

১৯ মার্চ জাগরণী শান্তিসংঘ নামে একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে ভৈরবে গিয়েছিলাম। সেমিনারের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘বাঙালির জীবনে রেনেসাঁস’। সংগঠনের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে কথা বলেন রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ, প্রেসক্লাবের সভাপতি শামসুজ্জামান, হাজী আসমত কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোবারক আলী, অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সংগঠনের সদস্য আবুল কাসেম, প্রভাষক কাজী আবু জাফর, আমিরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম ও মুক্তার হোসেন। বক্তারা বলেন, যে সমাজ স্থবির, প্রশ্নহীন; সে সমাজে রেনেসাঁ আসতে পারে না। রেনেসাঁ আনতে হলে সমাজকে চলিষ্ণু হতে হবে। আমরা দেশ বদল করেছি। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু সমাজ বদলায়নি। নারী-পুরুষে সমতা আসেনি। গোত্র-জাতিগত প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। স্বাধীনতার মূল প্রত্যয় ছিল একটি মানবিক মর্যাদাশীল ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যা থেকে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান জাগরণী শান্তিসংঘের কাজে আগ্রহের কারণ প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে তারা পাঁচটি গণপাঠাগার গড়ে তুলেছে। প্রতিটি গণপাঠাগার চলছে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। আলাপ প্রসঙ্গে গণপাঠাগারের স্থানীয় উদ্যোক্তারা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে। তাঁরা এমন বই পড়তেই তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করেন, যা মনোজগতে আলো ছড়ায়, চিন্তা করতে শেখায়।

এর আগে বুধবার রাতে স্থানীয় বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম পালা গীতিনাট্য চন্দ্রাবতী মঞ্চস্থ করেন ভৈরব বন্ধুসভার সদস্যরা। বাংলাদেশের সাহিত্যের আদি নারী কবি চন্দ্রাবতীর শৈশব, প্রেম, প্রেম ও কবিতা রচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে নাটকটি দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়। পালাটি রচনা করেন নয়ান চাঁদ ঘোষ। নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দেন ভৈরব বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমাইয়া হামিদ। নির্দেশনায় ছিলেন প্রথম আলোর ভৈরব প্রতিবেদক সহকর্মী সুমন মোল্লা।

প্রথম আলো বন্ধুসভার যেসব সংগঠন সারা বছরই সক্রিয়, তাদের মধ্যে ভৈরব শাখা সামনের সারিতে। তাদের সদস্য দুই শতাধিক। এর মধ্যে সক্রিয় ৭০ থেকে ৮০ জন। ইকরাম বক্সকে সভাপতি ও প্রিয়াংকাকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি হয়েছে। এই করোনাকালেও তাঁরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক উদ্যোগ, নিয়মিত ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্র, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বই বিনিময় কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। বন্ধুসভার সদস্যরা জানান, করোনার কারণে বন্ধুসভার অফিসটি বন্ধ আছে। ফলে তাঁদের নিয়মিত কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। অফিস অনুমতি দিলে তাঁরা নিজ অর্থায়নেও একটি অফিস নিতে আগ্রহী। বন্ধুসভার তারিফ করলেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। বন্ধুসভার সহযোগিতা ছাড়া ভৈরবে তাঁরা কোনো আয়োজনের কথা ভাবতেই পারেন না। ২৮ মার্চ তাঁরা মহুয়া পালা নিয়ে আসছেন।

বিজ্ঞাপন

ভৈরবে আরেকটি বিষয় দেখে খুব ভালো লাগল। সেখানকার সাংবাদিকেরা আওয়ামী ও বিএনপির গোত্রে ভাগ হয়ে যাননি। সব পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও টিভির সাংবাদিকেরা একই প্রেসক্লাবের সদস্য।

ঢাকায় ফেরার পথে নিরাপদ সড়ক চাই, ভৈরব শাখা কার্যালয়ে গেলাম তাঁদের কার্যক্রম দেখতে। ভৈরবের মতো একটি ছোট্ট শহরে তাঁরা যে বিশাল কর্মযজ্ঞ করে চলেছেন, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। সংগঠনের সভাপতি এস এম বাকি বিল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিনসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কেবল যাত্রী ও চালকদের সচেতন করেই দায়িত্ব শেষ করছেন না, চালক ও সহকারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলাম, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হয়েও এখানে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করছেন। কিন্তু আপনাদের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা তো এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা মৃদু হেসে বললেন, ‘ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে অনেকে অনেক কিছু করে থাকেন। কিন্তু আমরা আন্দোলন করছি মানুষ বাঁচাতে। সড়ক দুর্ঘটনায় যাত্রী-চালক কেউ রেহাই পান না। সাধারণ চালক ও পরিবহনকর্মীরা কিন্তু আমাদের সঙ্গেই আছেন।’

ঢাকায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, করোনা সংক্রমণের কারণে গত এক বছর ঢাকার বাইরে যাওয়া হয়নি। অথচ করোনার আগে সুযোগ পেলেই আমি ঢাকার বাইরে যেতাম, ‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই’-এর মতো করে সেখানকার জনজীবনের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করতাম। প্রতিটি স্থানে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ-পরিচয় হয়। ঢাকার জীবন একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর। প্রতিদিন সেই একই যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ। রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাহাস। তুলনায় গ্রামীণ জনপদ শান্ত-স্থির। আসলে ঢাকার বাইরেই প্রকৃত বাংলাদেশ।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন