বর্জ্য বিক্রি করেও আয় বাড়ানো যায়

বিজ্ঞাপন
default-image

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম সেদিন আমাদের একটি গোলটেবিল বৈঠকে জানালেন, রাজশাহীর একজন তাঁদের কাছ থেকে প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য নিতে চান। শুনে আমরা তো অবাক। যেখানে আমরা বর্জ্য দূর দূর করে ফেলতে ব্যস্ত, সেখানে কে আবার ফেলনা জিনিস লুফে নিতে চায়! করপোরেশন নিশ্চয়ই মাগনা দেবে না। বিক্রি করবে। তাতে করপোরেশনের আয়ও হবে, আবার মেয়র সাহেব ভারমুক্তও হবেন। কারণ, প্রতিদিন দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার এক-দেড় কোটি মানুষ যদি কম করে হলেও দিনে ১০-১২ ছটাক বর্জ্য উৎপাদন করে, তাহলেও এই মহানগরীতে প্রতিদিন অন্তত ৬ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। 

এ তো এলাহি কাণ্ড। সামলানোই মুশকিল। সেখানে কেউ যদি কিনতে চান, তাহলে সিটি করপোরেশন তো ভালো ব্যবসা করতে পারে। এখন এই ব্যবসাটা জমাতে পারলে মানুষেরও মঙ্গল, পরিবেশের জন্যও ভালো। 

কেউ হয়তো ভাবতে পারেন এর মধ্যে কোনো রহস্য আছে হয়তো। না, সে রকম কিছু নয়। প্রায় ৪০ বছর আগে আমি একবার জার্মানির এক ছোট শহরে যাই। নগর কর্তৃপক্ষ আমাদের এক কারখানায় নিয়ে বলল, এই দেখো, এখানে সারা শহরের বাসাবাড়ির বর্জ্য এনে তাপ উৎপাদন করা হয় এবং সেই তাপ বাসায় বাসায় রুম হিটিংয়ের জন্য সরবরাহ করা হয়। মানুষ সেটা প্রয়োজন অনুযায়ী কিনে নেয়। শীতের দেশ তো, তাই তাদের ঘর গরম রাখতে হয়। সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম। ভাবতেও পারিনি যে ময়লা থেকে এভাবে আয় করা যায়। রাজশাহীর সেই ব্যক্তি হয়তো বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লাভজনক ব্যবসা করতে চান। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। 

বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে নগরে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গোলটেবিল বৈঠকে জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলছিলেন, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষায়িত সংস্থা দরকার। ওরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ তদারক করবে। একমাত্র ডাবের খোসা, প্লাস্টিক স্ট্র আর পলিথিন সরিয়ে রাখতে পারলেও বিরাট কাজ হয়। কারণ ওগুলোই এখন ঢাকার সব ড্রেন জ্যাম করে ফেলেছে। ফলে জলাবদ্ধতা ও ভোগান্তি। স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। এসব বিষয়ে জনসচেতনতা দরকার। স্কুলের শিশুদের পাঠ্যবইয়ে বিষয়গুলো থাকতে হবে। 

ঢাকায় বছরে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার বর্জ্য–বাণিজ্য হয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মীরা প্রতিটি ফ্ল্যাটের ময়লা প্রতিদিন সংগ্রহ করে সিটি করপোরেশনের ট্রান্সফার স্টেশনে নিয়ে ফেলেন। এ জন্য প্রতিটি ফ্ল্যাটবাসীকে মাসে ১০০-১৫০ টাকা দিতে হয়। মার্কেটগুলো দেয় মাসে অন্তত ২ হাজার টাকা। এভাবে একটা অঘোষিত বেসরকারি ব্যবস্থা চলছে। আবার দুই সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতা-কর নেয় মাসে ১৫০ কোটি টাকার বেশি। 

এরপরও আমরা দেখি, ফ্লাইওভারের নিচে খোলা রাস্তায় স্টিল ফ্রেমের বড় কনটেইনার সারি সারি রাখা হয়েছে ময়লা এনে ফেলার জন্য। সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। রোগশোক ছড়ায়। আবার কোথাও দেখা যায় রাস্তার পাশে তিন-চারতলার সমান উঁচু বড় শেডও বানানো হয়েছে, যেখানে ভেতরে কিছু স্টিল কনটেইনারে ময়লা ফেলা হয়, ঠিক তার পাশেই খাট-বিছানা-জামাকাপড়ও দেখা যায়। শেডের বাইরে রাস্তার পাশে বড় বড় স্টিল কনটেইনারেও ময়লা এনে জমা করা হচ্ছে। রাস্তা বর্জ্যে বর্জ্যময়! 

এই চলছে ঢাকায়। এর পরিবর্তন দরকার। শুধু পলিথিন আলাদা করে রাখলেও বর্জ্যদূষণ অনেকটাই কমে। সেই পলিথিন দিয়ে তাপ উৎপাদন করা যায়। অন্যান্য বর্জ্য দিয়ে জমি ভরাট করে সেখানে পরে পার্ক বানানো যায়। বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাসও তৈরি করা যায়। সাভারে ট্যানারি বর্জ্যে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। অথচ সেই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে অনেক দামি রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন করা যায়, যা থেকে তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তাহলে নদীটাও বাঁচে আবার সরকারের কিছু আয়ও বাড়ে। 

রাজউকের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ জানালেন, সখীপুরে মাত্র তিন কাঠা জমিতে প্ল্যান্ট তৈরি করে মানববর্জ্য ও অন্যান্য ময়লা থেকে তৈরি সার ও বায়োগ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। জামালপুরে পলিথিন পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে পলি-ফুয়েল, যা থেকে অকটেন ও কালি পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বললেন, প্লাস্টিক দূষণ আমাদের খাদ্যে ঢুকে যাবে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনবে। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন এককথায় জানালেন, বর্জ্য আসলে বর্জ্য নয়, এটা সোনার খনি! তাঁর কথার ভেতর আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগের আসল সত্যটা রয়েছে। আমরা বাস্তবে সেই বর্জ্যখনির ভেতরে লুকানো কতটা স্বর্ণ উদ্ধার করতে পারি, সেটাই আসল কথা। 

আব্দুল কাইয়ুম প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক
quayum.abdul@prothomalo.com 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন