default-image

বিজিবির একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭ জানুয়ারি ২০১৫ পার্বত্য চুক্তি–পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ১১টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ৫ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘কোন দেশি-বিদেশি ব্যক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাৎ কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে’—এর অর্থ দাঁড়ায় যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো আদিবাসী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে, কিংবা সেখানে বৈঠক করতে চাইলে, অথবা আদিবাসীর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে চাইলে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন বা সেনাবাহিনী/বিজিবির প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে কথা বলতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষায় ‘উপজাতি’, আমাদের ভাষায় আদিবাসী। আদিবাসীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে এটা করতে হবে, কিন্তু যদি ওখানে বাঙালির সঙ্গে কথা বলতে যান কিংবা মৌলবাদী সংগঠন সম-অধিকার আন্দোলন বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান, তাহলে কারও উপস্থিতি বা মনিটরিং লাগবে না। এটা তো অ্যাডলফ হিটলারের সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে কোনো ইহুদি কোনো জার্মানের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না। কতটা সাম্প্রদায়িক হলে এ রকম নির্লজ্জ একটা নির্দেশনা আসতে পারে।
বৈষম্য এখানে কতটা প্রকট, তা এই সিদ্ধান্তে সহজে অনুমেয়। দেশপ্রেম কি শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা সেনাসদস্য বা বিজিবি সদস্যদের আছে? আদিবাসীদের কি দেশপ্রেম নেই? মানবাধিকার নিয়ে আমরা যাঁরা কাজ করি, আমাদের নেই? ৬ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সঙ্গে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বয় সাধন করে কাজ করবে। তার মানে স্পষ্টভাবেই সেখানে সিভিল প্রশাসন সেনা প্রশাসনের অধীনস্থ হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এমন একটা অঞ্চল, যেখানে ১৯৭২ সাল থেকে কার্যত সেনাশাসন বিরাজ করছে। প্রিয় পাঠক, একবার ভাবুন দেশে সেনাশাসন কদিন থাকলে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই এবং তার বিরুদ্ধে জনগণ মাঠে নেমে পড়ে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন চলছে সাড়ে চার দশক ধরে!
বিজিবির সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে ৭ নম্বর সিদ্ধান্তে। অরক্ষিত সীমান্তে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পদক্ষেপ নিতে বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নে নিশ্চয়ই কারও আপত্তি থাকবে না। সীমানা সুরক্ষিত হোক কিন্তু যদি সেখানে আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ করে বিজিবির স্থাপনা তৈরি করা হয়, তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। চুক্তি অনুযায়ী আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার সমাধান না করে বর্তমানে বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ হচ্ছে, দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ২১টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ করে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় দখল করে বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রুমা উপজেলার পাইন্দু মৌজা, পলি মৌজা, চান্দুপাড়া ও চাইপোপাড়ার ৫০০ মারমাকে উচ্ছেদ করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন, রোয়াংছড়ি উপজেলার রামজাদিতে জায়গা দখল করে বিজিবির ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৪৭৯ কিলোমিটার সীমান্ত রক্ষার জন্য আদিবাসীদের গ্রাম উচ্ছেদ করে সীমান্ত চেকপোস্ট স্থাপন অগ্রহণযোগ্য; কিন্তু সিদ্ধান্ত ৯ ও ১০ এ রকম নির্দেশনার ইঙ্গিতবাহী। আমরা মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টিকে নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখে আনাচকানাচে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ না করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে স্থায়ী সমাধানের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
সিদ্ধান্ত ৩-এ পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। সিএইচটি কমিশনের জন্ম হয়েছে ইউরোপে, ১৯৯২ সালে; প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সামরিক শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামে একের পর এক যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্মীয় নির্যাতন হয়েছে এবং এসব বিষয়াদি জাতিসংঘে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত হয়েছে, তার পরিপ্রেিক্ষতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গড়ে উঠেছে। উক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ কতখানি গ্রহণযোগ্য? এটা কি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত? বলা হয়েছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘উপজাতীয়দের’ আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা করাই ওই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য। আদিবাসীদের আদিবাসী বলাটাই তো সংগত। সারা পৃথিবী যখন বলছে, তখন আমরা কেন বলব না?
সিদ্ধান্ত ১-এ বলা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউএনডিপির উন্নয়ন প্রকল্প মনিটরিং করতে হবে। নিশ্চয়ই। সব দেশীয়, আন্তর্জাতিক সংস্থারই মনিটারিং দরকার; কিন্তু শুধু ইউএনডিপির পার্বত্য চট্টগ্রামের কার্যক্রমকে কেন মনিটরিং করতে হবে? সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার মনিটরিং করাও জরুরি।
সিদ্ধান্ত ৪-এ আছে: এখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের জন্য বিদেিশদের অন্তত এক মাস আগে অনুমতি নিতে হবে এবং কূটনীতিকগণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি নেবেন। যখন চুক্তি সম্পাদিত হয় তখন বিএনপি-জামায়াত বিরোধিতা করেছিল এই অজুহাতে যে বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং বলেছিল সেখানে যেতে পাসপোর্ট লাগবে।
প্রশ্ন জাগে, সরকারি কর্মকর্তারা কি বিএনপি-জামায়াতের সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের দ্বার উন্মোচন করছেন? সারা দেশে যে মৌলবাদী তৎপরতা আছে, এর বিপরীতে বরং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো দরকার। আমরা মনে করি, এই উল্টো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য ‘ডিপ্লোমেটিক আইসোলেশন’ তৈরি করবে। বিদেিশ নাগরিকদের জন্য ‘কোড অব কন্ডাক্ট’–এর যে কথা এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে তা বিরোধাত্মক। আমাদের প্রতীতি, এসব সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামকে চুক্তিপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
সিদ্ধান্ত ১১-এ আছে, পার্বত্য জেলাসমূহে পুলিশ/আনসার বাহিনীতে কর্মরত সাবেক শািন্তবাহিনীর সদস্যদের অন্য জেলায় বদলি করা হবে। এটা সুস্পষ্টভাবে চুক্তির লঙ্ঘন। এই সিদ্ধােন্তর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিকে অসম্মান ও অস্বীকার করা হয়েছে। আমরা বরং ‘মিশ্র পুলিশিং’-এর পক্ষ। কারণ, পার্বত্যাঞ্চলে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক, ভাষাভাষী ও ধর্মগোষ্ঠীর পুলিশ মোতায়েন করলে পুলিশ কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট সমাজ, সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারবে। বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে পুলিশ গঠন করা হলে তা আদিবাসী এলাকায় উত্তেজনা ও অবিশ্বাস কমাতে ভূমিকা রাখবে। আর সরকারের তরফ থেকে এখন ঠিক তার বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে চুক্তি বাস্তবায়ন কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো নিয়ে সংশোধনী আনার বিষয়ে সরকার এবং জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। পার্বত্য ভূমি কমিশনের সভা আয়োজনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যখন চুক্তি বাস্তবায়নের পদক্ষেপে স্বস্তি পাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও হতাশ হয়েছি।
মনে হচ্ছে সরকারের ভেতরেই একটা শক্তি আছে, যারা প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে যে চুক্তি সই হয়েছে, তাকে সফল হতে দিতে চায় না। এটা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নয়, এটা জাতীয় সমস্যা। যে সিদ্ধান্তগুলো এসেছে, সেটা শুধু পার্বত্য চুক্তিবিরোধী নয়, এটা সংবিধানবিরোধী। এই সার্কুলারের মাধ্যমে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮, ৩৬ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। সংসদে কোনো আলোচনা ছাড়াই শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত দেশের সব মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে একটি কায়েমি গোষ্ঠী সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। আমরা মনে করি, মন্ত্রণালয়ের পদেক্ষপগুলো আদিবাসীর সঙ্গে বাঙালির দূরত্ব বাড়াবে। ধর্মীয় উন্মাদনা যেভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক সেভাবে উগ্র বাঙালিত্ব ও উগ্র মুসলমানিত্ব আদিবাসী ও সংখ্যালঘুর জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক এই নির্দেশনা নাগরিক সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে।
আমরা মনে করি, এসব নির্দেশনা বৈষম্যমূলক এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। জাতীয় জীবনের দুর্ভাগ্যের সাক্ষী এই নির্দেশনা। রাষ্ট্র আদিবাসীদের সঙ্গে কী সাম্প্রদায়িক আচরণ করছে—এই নির্দেশনার মধ্যে দিয়ে তা বেরিয়ে এসেছে। যাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পরাকাষ্ঠার আড়ালে নিজেদের সাম্প্রদায়িক অবয়বকেই প্রকাশ করেছেন। আমরা অত্যন্ত লজ্জিতবোধ করছি যে, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এই নির্দেশনার মাধ্যমে সেই বাংলাদেশ এখন জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার কদর্য পথেই পা বাড়িয়েছে। আমরা অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনাটি প্রত্যাহারের দাবি করছি।
লেখকেরা: মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন