বর্ষবরণের এই অভিনব আয়োজন সবারই দৃষ্টি কেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ আয়োজন প্রশংসায় ভাসছে। করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়েছে সীমিত পরিসরে। এবারও উৎসব নিয়ে শঙ্কা কম ছিল না। উৎসবের আগে নানা ইস্যুতে সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিতর্ক, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্রের সতর্কতা—এসব কারণে উৎসব কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্‌যাপিত হবে, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সব শঙ্কা, সন্দেহকে পেছনে ফেলে উৎসবপ্রিয় মানুষ এই বৈশাখের প্রাকৃতিক রুদ্র রূপ আর সামাজিক বিভাজনের খরতাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আঁটসাঁট ‘রণসজ্জা’ উৎসবের স্বতঃস্ফূর্তভাবে নষ্ট করেছে। কিন্তু সারা দেশের মানুষ, বিশেষ করে কিশোর ও তরুণেরা নড়াইলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের মতো নানা বর্ণিল আয়োজনে নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপন করেছে। এর মধ্যে ছিল আলপনা আঁকা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, জারি-সারি-পালাগান ও গ্রামীণ মেলার মতো আয়োজন।

সংস্কৃতি চিরকালীন বিষয় নয়, আবার চাপিয়ে দেওয়া বিষয়ও নয়। শত শত বছরের নানা উপকরণ তাতে যুক্ত হয়। সময়ের প্রয়োজনে আবার অনেক উপকরণই বিযুক্ত হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা একটা বৈশ্বিক বিশ্বে বাস করছি। ফলে নানা মত, পথ, চিন্তা ও উপকরণ এসেও যুক্ত হচ্ছে উৎসবের অনুষঙ্গে। সভ্যতা ও সংস্কৃতি মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়। সংস্কৃতির কোনো একক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়।

ধর্মীয় হোক কিংবা সামাজিক, উৎসব এলেই সামাজিক অস্থিরতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি যেন একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কয়েক দিন আগে ঢাকায় পুলিশের এক কনস্টেবল কপালে টিপ পরায় এক নারী শিক্ষককে হেনস্তা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য যখন এমন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন এ ধরনের পেশায় তাঁর থাকার মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি করে পুলিশ। কিন্তু বিষয়টি পরে আর পুলিশ ও নারী শিক্ষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি করে। টিপ কিংবা পোশাক পরা বা নারী হওয়ার কারণেই বাংলাদেশে নারীরা রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহনে হেনস্তা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই এক নারীর হেনস্তা সামষ্টিক নারীর প্রতিবাদের বিষয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিপ পরা ছবি দিয়ে কিংবা টিপ পরার স্বাধীনতার পক্ষে অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিষয়টিকে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের বাইনারি বিষয় হিসেবে কেউ কেউ ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে দেখা দেয় বিভাজনের রাজনীতি, প্রকাশ পায় ঘৃণা, যা পরবর্তীতে জন্ম দেয় আরও সামাজিক অস্থিরতা।

প্রায় একই সময়ে মুন্সিগঞ্জে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল এবং নওগাঁর সহকারী প্রধান শিক্ষক অমোদিনী পালকে নিয়ে দুটি ঘটনা। দুটি ঘটনাতেই অর্থনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের কারণে দুজন শিক্ষককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়। হিন্দু শিক্ষক হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার কার্ড খেলে স্বার্থান্বেষী মহল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি ঘটনা নিয়েই উত্তেজনা ছড়ানো হয়। প্রকৃতপক্ষে ঘটনা কী ঘটেছে, সেটার জন্য অপেক্ষা না করেই ঘৃণা আর বিভেদের বিষবাষ্প ছড়াতে থাকে অনেকে। পরে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসে। কিন্তু নববর্ষ পর্যন্ত এই উত্তেজনার রেশ থেকেই যায়। এ পরিস্থিতিতে আশঙ্কা ছিলই, এবারের বর্ষবরণ কি স্বতঃস্ফূর্ততা হারাবে? না, সে আশঙ্কা সত্যি হয়নি। বরং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারোসহ অপরাপর জাতিসত্তার বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির নববর্ষের সঙ্গে মিলে উৎসবকে উচ্চতর মাত্রা দিয়েছে।

default-image

বৈষু, বিঝু, বিহু, বিষু, সাংগ্রাই, চাংক্রান—এসব উৎসবের বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক বর্ণিলতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণেই এখন আমরা ব্যাপকভাবে জানতে পারছি। দেশে বাঙালি বাদেও পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে আরও প্রায় ৪০টি জাতিসত্তা রয়েছে। আমরা ভাগ্যবান যে প্রতিটি জাতিসত্তারই নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও উৎসবের ভিন্নতা রয়েছে। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে একই সময়ে তাদেরও উৎসব হওয়ায় পড়শি জাতিসত্তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু পাহাড় নয়, ইট-কংক্রিটের নগর ঢাকার বুকে তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্ণিল পিনোন-হাদি ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকে পাহাড়ি বিভিন্ন জাতিসত্তার নারী-পুরুষ ও শিশুরা নেচে-গেয়ে তাদের উৎসব উদ্‌যাপন করছেন। পারস্পরিক এই জানাবোঝা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সামাজিক সেতুবন্ধ তৈরি করছে। আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে যে পাহাড়সম বৈষম্য, তা ঘোচানোর প্রশ্নটিও সামনে আসছে।

বৈষু, বিঝুর মতো উৎসব ত্রিপুরা, চাকমা ও অন্যান্য জাতিসত্তার প্রধান উৎসব। কিন্তু এ সময় ক্লাস-পরীক্ষা থাকা, কর্মক্ষেত্রে ছুটি না থাকায় অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকমা, মারমাসহ অন্যান্য জাতিসত্তার শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাতে সমর্থন জানিয়েছেন বাঙালি শিক্ষার্থীরা। এ উৎসবের সময় যাতে পরীক্ষা না রাখা হয়, তাঁরা যেন ছুটি পান, সে বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ শুধু বাঙালির রাষ্ট্র নয়; বহুজাতিক ও বহুভাষিক রাষ্ট্র। ফলে অপরাপর জাতিসত্তা যাতে কোনোভাবেই বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা সরকার ও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

অন্য যেকোনো উৎসবের মতো নববর্ষ উৎসবে অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলো চাঙা হয় মূলত উৎসবকে ঘিরে। এতে লাভবান হয় আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি। দুই ঈদ উৎসবের পরেই আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব নববর্ষ। দুই বছর করোনার কারণে নববর্ষ উৎসবে অর্থনীতি গতি স্তিমিত ছিল, কিন্তু এবারে অর্থনীতির পালে হাওয়া ফিরে আসে।

সংস্কৃতি চিরকালীন বিষয় নয়, আবার চাপিয়ে দেওয়া বিষয়ও নয়। শত শত বছরের নানা উপকরণ তাতে যুক্ত হয়। সময়ের প্রয়োজনে আবার অনেক উপকরণই বিযুক্ত হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা একটা বৈশ্বিক বিশ্বে বাস করছি। ফলে নানা মত, পথ, চিন্তা ও উপকরণ এসেও যুক্ত হচ্ছে উৎসবের অনুষঙ্গে। সভ্যতা ও সংস্কৃতি মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়। সংস্কৃতির কোনো একক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। সেখানে নতুন নতুন বিষয় যেমন যুক্ত হবে, আবার পুরোনো বিষয়গুলোও অনেকে আঁকড়ে ধরে রইবেন। উৎসব যেমন পালন করার অধিকার আছে, আবার উৎসব না পালন করারও অধিকার রয়েছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে এই ঐক্যই বাস্তবতা। কিন্তু উৎসবকে ঘিরে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর অধিকার কারও নেই। মানুষের বেঁচে থাকার জন্যই উৎসব দরকার।

মানুষ উৎসবপ্রিয়। এবারের বাংলা নববর্ষ এবং বৈষু, বিঝু, বিহু, বিষু, সাংগ্রাই, চাংক্রান উৎসবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চিরকালীন সেই বার্তাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ঘৃণা-বিদ্বেষ হটিয়ে, করোনা মহামারির কান্না-মৃত্যু-দীর্ঘশ্বাস পেরিয়ে নববর্ষের এই প্রাণময়তায় আমাদের সামনে এগোনোর পথ তৈরি করছে। বর্ষবরণে শেষপর্যন্ত উৎসবই জিতেছে।

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন