বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাল না ছেড়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বার্ক) খ্যাতনামা এক গবেষকের শরণাপন্ন হলে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে প্রবন্ধ লেখার বিভিন্ন দিক শেখালেন, ইংরেজিও ঠিকঠাক করলেন। অগ্রজের কথামতো বিভাগীয় সাময়িকীতে জমা দেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় বিশেষ কোনো পর্যবেক্ষণ ছাড়াই প্রত্যাখ্যাত। বার্কের গবেষকের দ্বারস্থ হলে তিনি প্রবন্ধটির দুটি নিরীক্ষকের বা রিভিউয়ারের পর্যালোচনা দেখে আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে জমা দিতে বললেন। যেমন কথা তেমন কাজ, মাস ছয় পর নতুন বিশ্লেষণ যোগসহ ইতিবাচক মন্তব্য। সম্পাদক ও দুই নিরীক্ষক মিলে ১০ বার বিভিন্ন উপায়ে পরিবর্তন ও পরিমার্জনের উপদেশ দেন। শেষাবধি ২০০০ সালে গৃহীত হয়, জীবনের প্রথম প্রবন্ধ, আকাশে-বাতাসে আনন্দ দেখে কে! সাহস ও সহায়তার জন্য দুজনকেই ধন্যবাদ জানাই।

চলুন ফিরি লেখার শিরোনামে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রতিটি বিভাগ বা অনুষদে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের অন্তত একটি সাময়িকী রয়েছে। পশ্চিমা ধাঁচে শুরু হলেও কালের পরিক্রমায় বেশির ভাগেরই ‘মুমূর্ষু’ অবস্থা। মোটাদাগে এসব সাময়িকীতে প্রবন্ধ ছাপানোর জন্য দরকার ‘নিজস্ব’ মানুষ বা সম্পাদনা পরিষদে ‘কাছের কেউ’। পরিষদের ব্যক্তিরা কিন্তু কিছু সুবিধাসহ মাঝেমধ্যে আপ্যায়িত হতেন বা হন। যেমন পরিষদের কেউ যদি দূরবর্তী জেলার বাসিন্দা হন, তবে ষাণ্মাসিক/বার্ষিক মিটিংয়ে যোগদানে কর্মস্থল থেকে ছুটিসহ যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া বাবদ সম্মানী পেতেন বা পান।

তা ছাড়া, স্নাতকোত্তর শেষ বা নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত যাঁরা প্রবন্ধ লিখতে ইচ্ছুক, তাঁদের কাছ থেকে অনবরত ‘সুন্দর’ বিশেষণ বা ‘অন্য কিছু’ তো আছেই। মানের দিক থেকে এমন সব প্রবন্ধ ছাপানো হয়, যেগুলোর বেশির ভাগই ‘মানহীন’ বললে অত্যুক্তি হবে না। দেশের সাময়িকীগুলোয় প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো যেমন নিজ বিভাগ/অনুষদের অনেকেই পড়েন না, তেমনি নিজেরা উদ্ধৃতিও করেন না। কেননা, ‘বিশেষ’ উদ্দেশ্যে লেখা। যেহেতু সাময়িকীগুলোর নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া প্রধানত মুদ্রিত ভার্সনে, চৌর্যবৃত্তি বা কপি-কাট ধরার সুযোগও কম। তবে প্রযুক্তি বা পারস্পরিক বিদ্বেষ/বিভাজনের কল্যাণে চৌর্যবৃত্তির ঘটনা প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে।

আবার কোনো প্রবন্ধ ছাপার যোগ্য কি না, এ বিষয়ে সম্পাদক পুরোপুরি নির্ভর করেন নিরীক্ষকদের ওপর। প্রবন্ধ জমা থেকে ছাপানো অবধি পুরো প্রক্রিয়া গোপনীয় হলেও শিক্ষকরাজনীতির কারণে গোপনীয়তা নামক বিষয়টি এখন যেমন গৌণ, তেমনি কারও প্রবন্ধ ছাপা হবে কি না, তা অনেকটাই ‘ভোটে নির্বাচিত ডিন/প্রতিনিধি’ বা ‘রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাছাইকৃত সম্পাদক ’নির্ভর। তা ছাড়া মুদ্রিত সংস্করণে প্রবন্ধগুলো বহির্বিশ্বে পড়ার সুযোগ নেহাতই কম, কেউ নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করলে ভিন্ন কথা। অনলাইনে না দেওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে কপি-কাট ধরা পড়ার ভয়! অথচ সাময়িকীগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় মুদ্রণ, কাগজ ও সম্পাদনা পরিষদ বাবদ প্রতিবছর প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।

একটা লেখা যদি কেউ না পড়ে, কেউ উদ্ধৃতি বা অন্যকে পড়তে উৎসাহিত না করে, তাহলে তার সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কোথায়? বলা বাহুল্য, শিক্ষায় সম্মান অর্জনের বড় উপায় হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে গুণগত প্রকাশনা। মূলত, ‘রাজনৈতিক’ বা ‘পদোন্নতির’ আউটলেট বলে পরিগণিত বিভাগীয় বা অনুষদের প্রকাশনায় শুধু সময়ই নষ্ট হয় না, হয় জনগণের অর্থেরও অপচয়।

২০০১ সালে পিএইচডি করতে গেলে তত্ত্বাবধায়ক ও বিদেশি গবেষকদের জিজ্ঞাসা করতে কেউই বিভাগের অগ্রজের তথ্যমতে আন্তর্জাতিকভাবে ‘খ্যাত’ দেশের দুটি সাময়িকীর নাম শোনেননি—এ কথা জানালে একটু হোঁচট খেলাম। তখন ইন্টারনেটের অবস্থা এমন ছিল না যে মুহূর্তেই বের করা যাবে। তাই গ্রন্থাগারের শরণাপন্ন হলে তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে যে দু-একটা সাময়িকী আসে, সেখানে তোমার ‘দুটি’ নেই বা কখনোই ছিল না। পিএইচডিকালে আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশনা বাধ্যতামূলক থাকায় নিজের বিষয়ের জার্নালগুলোয় প্রকাশনা করতে প্রতিবারই ছিল ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, কত নির্ঘুম রাত কেটেছে। নিদেনপক্ষে দাখিলকৃত গবেষণাটির আন্তর্জাতিক গুরুত্বের প্রমাণ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

যাক, পিএইচডি শেষে কর্মস্থলে ফিরলে বিভাগীয় সাময়িকীটির একটা প্রবন্ধ আসে নিরীক্ষণের জন্য। সদ্য ফেরত বলে প্রবন্ধটির সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ছিল। তাই নিরীক্ষা শুরু করতেই দেখি, বিদেশি অনেক প্রবন্ধের ‘হুবহু’ কপি যেমন রয়েছে, তেমনি গবেষক(গণ) চেষ্টা করেছেন আগপিছ মেলানোর, তবে শেষ পর্যন্ত ‘খিচুড়িও’ হয়নি। যাক, সম্পাদককে বললাম, প্রবন্ধটিতে অনেক কপি-কাট আছে, রয়েছে গবেষণাপদ্ধতির ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা। যেহেতু বিভাগের শিক্ষকই সম্পাদক, কিছুদিন পর তিনি বললেন, ‘দেখো না কোনোমতে পার করা যায় কিনা?’ দৃঢ় চিত্তে না করলাম। এরপর সম্পাদক প্রবন্ধটি পড়ে বললেন, ‘লেখাটি আদতে বস্তা কাইটা বস্তা সেলাই’। তিনি আমাকে বিষয়টি বোঝালেন আর হতাশার সুরে বললেন, প্রবন্ধটি না হলে ‘প্রধান লেখক এগোতে পারবে না’। তা ছাড়া লেখক(বৃন্দ) ‘রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী’, তাই ‘সম্পাদক না চাইলেও সম্পাদনা পরিষদ ছাপাতে আগ্রহী’। অনুধাবন করলাম, দেশি সাময়িকীগুলো কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত নয়।

কারও প্রতি বিরূপ বা অশ্রদ্ধা থেকে নয়, একটা লেখা যদি কেউ না পড়ে, কেউ উদ্ধৃতি বা অন্যকে পড়তে উৎসাহিত না করে, তাহলে তার সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কোথায়? বলা বাহুল্য, শিক্ষায় সম্মান অর্জনের বড় উপায় হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে গুণগত প্রকাশনা। মূলত, ‘রাজনৈতিক’ বা ‘পদোন্নতির’ আউটলেট বলে পরিগণিত বিভাগীয় বা অনুষদের প্রকাশনায় শুধু সময়ই নষ্ট হয় না, হয় জনগণের অর্থেরও অপচয়। আমাদের স্বপ্ন সীমাহীন, কিন্তু ক্ষমতা সীমিত। আর সীমিত সম্পদের মধ্যে কারও ছোট্ট কিন্তু ভালো একটা পদক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম, বদলাতে পারে প্রচলিত ব্যবস্থা। ‘ভালো অভ্যাস করুন, কারণ আমাদের অভ্যাস একসময় মর্যাদায় পরিণত হয়’—মহাত্মা গান্ধীর বিখ্যাত উক্তিটি মনে রাখলে যুগ যুগ বাঁচতে পারেন কর্মের মাধ্যমে। তা ছাড়া বস্তা কেটে বস্তা সেলাই করাও নিঃসন্দেহে কষ্টকর!

ড. আশরাফ দেওয়ান স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন