দেশভাগের সময় শেখ আবদুল্লাহ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে পারতেন। তিনি যখন বুঝলেন, স্বাধীন থাকা সম্ভব নয়, তখন তিনি ইসলামি পাকিস্তানের চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সঙ্গে থাকাই শ্রেয় বোধ করেন। কাশ্মীরিরা সুফিবাদের অনুসারী ছিলেন, তারা ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গেই আত্মীয়তা বোধ করেছিলেন তখন। ওদিকে শেখ তাঁর রাজ্যের জন্য বিশেষ মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিলেন। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ—এই তিন ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে কাশ্মীরের রাজ্যসভার সম্মতি ছাড়া লোকসভা কাশ্মীর-বিষয়ক আইন প্রণয়ন করতে পারে না।
তখন যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার পবিত্রতা ছিল, ভিন্ন চিন্তার মানুষ তা ভঙ্গ করতে পারেন না। এমনকি কাশ্মীর তার স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে কোনো আপস করবে না, সেটা পরিষ্কার করার জন্য তারা নিজেদের রাজ্যের জন্য আলাদা সংবিধানও প্রণয়ন করেছিল। এখন সেই স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করা মানে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ নয়াদিল্লির ওপর যে আস্থা স্থাপন করেছিল, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। কোনো পরিবর্তন করতে গেলে সেটা তাদেরই করতে হবে। রাজ্যটি ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল। এখন ভারতীয় ইউনিয়ন কাশ্মীর-বিষয়ক তার ক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে চাইলে রাজ্যের মানুষের সম্মতি ছাড়া তারা সেটা করতে পারে না।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধের দায় তৎকালীন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর বর্তানো হয়। এটা সঠিক। কারণ, তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, তিনি শান্তি বিঘ্নিত করতে চাননি | আর এই অবস্থানের জন্য তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলেও তিনি নিজের অবস্থান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধে যেতে হয়।
ভুট্টোকে এ ব্যাপারে আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজের ভূমিকার কথা অস্বীকার করেননি। আত্মরক্ষায় তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, তিনি ভেবেছিলেন, ভারতকে পরাজিত করতে সেটাই ছিল পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সময়। তিনি বলেছিলেন, ভারতের তখন হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি ছিল, আর ‘মার্কিন সামরিক সহায়তার কারণে আমরা তখন এ ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম।’
পাকিস্তানের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা লে. কর্নেল বারনার্ড ই অ্যান্ডারসন। তিনি টাইমকে লেখা এক চিঠিতে ১৯৬৫ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন, ‘এপ্রিলে আমি পাকিস্তান থেকে ফিরে আসি। আমরা সবাই জানতাম, সামনে এক যুদ্ধ হতে যাচ্ছে: পাকিস্তানিরা গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্টগুলো যুদ্ধের ধূসর রঙে সাজাচ্ছিল, যদিও এগুলোর মূল রং ছিল হলুদ। আর তারা তাদের বিমানের জন্য সংরক্ষণ দেয়াল বানাচ্ছিল।’
১৯৬৫ সালে সেই যুদ্ধে পাকিস্তান আক্রমণ শুরু করে শত শত মুজাহিদকে কাশ্মীরে ঢুকিয়ে দিয়ে। ভারতীয় গণমাধ্যমে এই অনুপ্রবেশের খবর প্রথম ছাপা হয় ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট। একই দিনে এই খবরও আসে যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সে দেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার কেওয়াল সিংয়ের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন। আর সে অনুষ্ঠানে তিনি এও বলেন, ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পাকিস্তান ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় একই পদক্ষেপ নেবে। কাশ্মীরে সেই অনুপ্রবেশের ঘটনাকে জায়েজ করতে তিনি এও বলেন, কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ আর ভারতের অনুপ্রবেশ একই ব্যাপার নয়। স্থানীয় কাশ্মীরিরা অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তা না করায় পাকিস্তান যে ‘বিদ্রোহ’ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, সেটা তারা করতে পারেনি। ফলে রেগেমেগে ভুট্টো অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে তাদের শ্রমিক বলে ভর্ৎসনা করেছিলেন।
আমি যখন ভুট্টোর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘একসময় সামরিক সহায়তা পাওয়ার কারণে বড় আক্রমণ করা ও অস্ত্রভান্ডারের সাপেক্ষে আমরা ভারতীয়দের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সে অবস্থা বজায় ছিল। আর এখন কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমাদের দোষ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে এটা জরুরি, আর সেটা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান না হওয়ায় আমাদের দোষারোপ করা হচ্ছে।
‘ফলে দেশাত্মবোধের প্রজ্ঞা থেকে এটা বলা ভালো, আসুন সমস্যা মিটিয়ে ফেলি, মতৈক্যে আসি, মীমাংসা করি। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার। সে কারণে যেহেতু ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমরা ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম, সেহেতু ভেবেছিলাম, এই কথা বলে তা নৈতিকভাবে জায়েজ করা যাবে। আর ভারত আত্মনিয়ন্ত্রণে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল, সেই পরিস্থিতি ছিল, তাই তেমন ভাবনা আমাদের মাথায় এসেছিল। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। আমি জানি, সেই পরিস্থিতি নেই। অন্য কারও চেয়ে আমি ভালো জানি, সেই পরিস্থিতি নেই, আর ভবিষ্যতে কোনো দিন তা আর আসবেও না।’
১৯৬৫ সালের এই যুদ্ধই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। তার আগ পর্যন্ত দেশ দুটির মধ্যে দূরত্ব ছিল, কিন্তু বৈরিতা ছিল না। আটারি-ওয়াগা সীমান্তে বড় যুদ্ধফটক নির্মাণ করা হয়। এর ফলে ভিসাব্যবস্থা আরও কঠিন করা হয়, এমনকি সীমান্তে যে সীমিত পরিসরে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য হতো, সেটাও বন্ধ হয়ে যায়।
যারা ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করতে আন্দোলন করছে, তারা বুঝতে পারছে না, এর ফলে কাশ্মীরের ভারতে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নটি আবার নতুন করে উঠবে। জম্মু ও কাশ্মীরের গণপরিষদ এই বিশেষ মর্যাদার ভিত্তিতেই এটি অনুমোদন করেছিল। কোনো সংশোধনী আনতে হলে সেটা রাজ্যের গণপরিষদকেই আনতে হবে। রাজ্যসভা বা লোকসভা—কেউই গণপরিষদের ক্ষমতা জবরদখল করতে পারে না। এখন নয়াদিল্লি কি আরেকটি গণপরিষদ গঠন করে রাজ্যটির মর্যাদাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে আগ্রহী, যেটা আবার অবৈধও বটে?
এর মধ্যে কাশ্মীরিদের মধ্যে ভিন্ন চিন্তার উদ্রেক হয়েছে। তারা চায় না ভারত বা পাকিস্তান কেউ তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা হোক। তারা কোনটার উপযোগী, সেটা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়। মৌলবাদীরা সেখানে শক্তিশালী হলেও কাশ্মীরের জনগণ চায়, সেখানকার পণ্ডিতেরাও তাদের সংস্কৃতির অংশ হোক, যেটা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছিল।
জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ মধ্যপথ ধরেছেন। তিনি হিন্দু-অধ্যুষিত জম্মুকে রাজ্য পরিচালনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় তিনি মুসলমান-অধ্যুষিত কাশ্মীর ও হিন্দু-অধ্যুষিত জম্মুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন।
শেখ আবদুল্লাহর মতো বড় নেতা লাদাখসহ পুরো রাজ্যের সমর্থন পেতে তা করতে পারতেন। আজকের পাতিনেতারা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে শান্ত করার সূত্র খুঁজতে পারেন, কিন্তু একসময় যে বহুত্ববাদী পরিবেশ সেখানে ছিল, সেটা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা তাদের নেই। কাশ্মীর উপত্যকায় মুসলিম মৌলবাদ শক্তিশালী হয়েছে, আর জম্মুতে হয়েছে হিন্দু মৌলবাদ। এর কারণ হচ্ছে, সুফি আদর্শ দূষিত হয়ে গেছে।
ভারতের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার আগে শেখ তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেশটির নাড়ি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এরপর তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, বহুত্ববাদই তাঁর দেশের জনগণের জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা। তিনি নাকি আবার এ কথাও বলেছিলেন, পাকিস্তানে মুসলমানরা সংখ্যায় অনেক বেশি, সে কারণে তিনি সেই দেশটিকে পছন্দ করেন না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0