default-image

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান বিষয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘নিকট প্রতিবেশী মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আর সাংবিধানিক পন্থা সমুন্নত থাকার প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ, আর বন্ধুপ্রতিম দেশ হয়ে বাংলাদেশ সে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দেখতে চায়।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন একটি প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘ক্ষমতায় যে-ই থাক, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যেন না পেছায়’ (আল-জাজিরা)।

এই প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আকাঙ্ক্ষা, মিয়ানমারের মানুষের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন-পরবর্তী প্রত্যাশা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ায় আসিয়ানভুক্ত ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর হতাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তবে খুব ভালো বিষয় যে বাংলাদেশ তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের স্বতঃপ্রণোদিত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

মিয়ানমারে জান্তাকে ক্ষমতায় রেখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আদৌ সম্ভব কি না, সেটা এক বড় প্রশ্ন। কেননা, রোহিঙ্গা উচ্ছেদের মূল হোতাই হচ্ছে সামরিক জান্তা। তারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাষ্ট্র ও সমাজের অংশই মনে করে না। ফলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া চলে না; বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পূর্ণ নিশ্চয়তার শর্তে সু চির এনএলডির প্রতি উচ্চকণ্ঠ সমর্থনই এখানে ন্যায্য অবস্থান। মিয়ানমার জান্তার ক্ষমতা অধিগ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উচিত কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা।

প্রথমত, প্রায় দেড় মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করলেও আরও প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা মিয়ানমারের আরাকানে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কিংবা স্থায়ী-অস্থায়ী আবাসনে অবস্থান করছে। তাদের ওপর নতুন করে কোনো নির্যাতন যাতে না হয়, তার আহ্বান জানানো। এ ধরনের কোনো ঘটনাকে যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে চীন, আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরদাশত না করে। এটা অমূলক নয় যে এই অস্থির সময়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে নির্যাতনের ক্ষেত্র তৈরি করে মিয়ানমার জান্তা নির্বাচনী ফলাফল ও ক্যু বিষয়ে নাগরিকদের নজর ঘোরানোর চেষ্টা করবে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের ব্যাপারে কৌশলগত সমঝোতায় বাংলাদেশ যাতে অক্ষম পক্ষের পেছনে সময় নষ্ট না করে। মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে ভারত ও জাপানের মতো পক্ষগুলোর সম্পর্ক ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগনির্ভর বই বেশি কিছু নয়। জাপান ও ভারত মিয়ানমারে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়াতে প্রত্যাশী একটি পক্ষ ভিন্ন কিছু নয়। কিছু বিশ্লেষক জাপান-ভারতের অবস্থানের দিকে দৃষ্টি দিতে পরামর্শ দিয়েছেন সরকারকে। আমি মনে করি, এটা শুধু পর্যবেক্ষণমূলক হতে পারে। বাংলাদেশের বরং সরাসরি চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়া চাই। চীন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ব্যাপকভাবে সরাসরি জড়িত সর্বোচ্চ পক্ষ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অর্থসাহায্য দানকারী পক্ষ। আসিয়ান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে নিষ্পত্তিকারী আলোচনার পক্ষ। ভারতসহ অন্য দেশের ভূমিকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে ম্রিয়মাণ, অস্পষ্ট এবং কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের সরাসরি বিপরীতও। জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। তাই অযথা পক্ষের পেছনে ঘুরে বাংলাদেশের সময় নষ্ট করা উচিত হবে না।

তৃতীয়ত, খোদ ক্যু পরিচালনাকারী শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। বাংলাদেশের পরিষ্কার দাবি করা উচিত, যেহেতু এই ব্যক্তির ওপর রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রাথমিক প্রমাণ মার্কিন বাহিনীর কাছে আছে, তাই ব্যক্তি নয় বরং তাঁর পুরো সামরিক প্রশাসনের ওপর ‘রোহিঙ্গা’ প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক অবিলম্বে। একইভাবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ানভুক্ত দেশের প্রতিও মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসনের ওপর কার্যকর বাণিজ্য ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার ডাক দিতে পারে।

চতুর্থত, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে চাইলে বাংলাদেশকে সসম্মানে ‘নিরপেক্ষ’ থাকতে হবে। কেননা, প্রতিবেশী দেশে সামরিক অভিযান হলে দীর্ঘ মেয়াদে এই অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি হবে। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুধু বিলম্বিত নয়, বরং নতুন করে আরও রোহিঙ্গার বাংলাদেশের দিকে আসার ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চীনসহ আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের দীর্ঘ তিক্ততার সূত্রপাত হতে পারে।

পঞ্চমত, একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রক্রিয়াকে চলমান রাখার বিষয়ে অং সান সু চিকে সমর্থনের কোনো বিকল্প নেই। অং সান সু চি রোহিঙ্গা গণহত্যাকে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে অস্বীকার করে যে কুখ্যাতি কুড়িয়েছেন, সেটাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় হিসেবে দেখাই ভালো। ক্ষমতায় যে-ই থাক বা আসুক, বিবেচনা করা অর্থহীন। বরং নির্বাচনে জয়ী দলের ক্ষমতা গ্রহণ বিষয়ে মিয়ানমারের মানুষের ম্যান্ডেটকে বাংলাদেশের সম্মান করা চাই।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, জান্তার ক্যু চীনের ইচ্ছায় হয়ে থাকতে পারে। এতে মার্কিন নতুন প্রশাসন চীনের পরিবর্তে মিয়ানমারকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে বেশ কিছুদিন। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, চীন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধানতম মিত্র হলেও চীনই যে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে, তার অভিযোগ করেছেন খোদ মিয়ানমার জান্তা।

মিয়ানমারের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব গভীর, সু চির চেয়ে জান্তা সব সময়ই সমাজ ও রাজনীতিতে বেশি প্রভাব রেখেছে। সু চি এই ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিরোধে না যাওয়ার নীতিতে চলে বরং ভুলই করেছেন। তাঁর নির্বাচিত সরকারকে একাধিকবার উৎখাতের মধ্য দিয়ে এটাই বারবার প্রমাণিত হয়েছে। রোহিঙ্গা বিষয়েও জান্তার প্রতি উচ্চকিত সমর্থন, গণহত্যার বিষয় অস্বীকার, হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জান্তাকে বাঁচিয়ে দেওয়া যুক্তি ও বক্তব্য তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল করেছে। তাঁর সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে, তিনি হারিয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার। দেশটিতে গণতন্ত্রের জমিন শক্ত হতে দিতে চান না জেনারেলরা, সেনাদের পেছনে রয়েছে বৌদ্ধধর্মীয় গুরুদের সমর্থন এবং আঞ্চলিক মদদও। রোহিঙ্গা বিষয়কে কেন্দ্র করে সু চির বরং এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টার প্রয়োজন ছিল।

বিজ্ঞাপন

মিয়ানমারে সংসদে সেনাদের ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত আসন থাকে, যেগুলোয় নির্বাচনই হয় না, সেখান থেকেই তিনজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নির্ধারণ করাও বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি রয়েছে সেনা-সমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউএসডিপি, যারা সদ্য নির্বাচনে মাত্র ৭১টি আসন পায় (যা গতবারের চেয়ে ৪৬টি কম)। মিয়ানমারজুড়ে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোয় ভোট হয় ১ হাজার ১৭১টি আসনে এবং তাতে সু চির দল একাই পেয়েছে ৯২০ আসন, যা গতবারের চেয়েও ৬৬টি বেশি। (আলতাফ পারভেজ, প্রথম আলো, ১ ফেব্রুয়ারি)। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে ‘তাতমা-দৌ’ নামে পরিচিত মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অনেক কমে যায়।

এই প্রথম মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত ও রাজনৈতিক সমর্থিত দলের মিলিত আসন এতটাই কমেছে যে রাজনীতিতে আগের মতো নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ফুরিয়ে যাওয়ার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। তারপরও সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের অবসরে যাওয়ার সময় আসন্ন। এ অবস্থায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে সেনাবাহিনীর দুর্বল রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁকে আগের মতো সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হবে বলেই অভ্যুত্থানে প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। তাই মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানে চীনের জড়িত থাকার বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো উপসংহার টানা ঠিক হবে না; বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করতে হবে। এদিক-ওদিক নয়, বরং চীনের ওপরই দায়িত্ব বর্তিয়ে নতুন চাপ তৈরি করতে হবে। আর এ কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও কৌশলগতভাবেই নিতে হবে।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ গ্রন্থের লেখক।
faiz.taiyeb@gmail.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন