একটা সরল প্রশ্ন মনে জাগে, আরএসএফের বাংলাদেশের প্রতি এত ‘বিদ্বেষ’ কেন? বাংলাদেশ তাদের কী এমন ক্ষতি করল?

প্রতিবেদনটি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, মিয়ানমারের অবস্থান ২০২১ সালে ছিল ১৪০, সামরিক শাসনের পর সেই মিয়ানমারের অবস্থান এখন নেমে এসেছে ১৭৬-এ। ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমারে সেনাবাহিনী কী পরিমাণ দমন–নিপীড়ন চালিয়েছে, সাংবাদিকদের আটক ও নির্যাতন করেছে, তা আমরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে কিছুটা হলেও টের পেয়েছি। আফগানিস্তানে ক্ষমতায় এসেছে তালেবান, এরপর দেশটি পিছিয়েছে ৩৪ ধাপ। এবারের সূচকে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের অবস্থানও আগের চেয়ে নিচে নেমেছে। ভারত নেমেছে ৮ ধাপ, পাকিস্তান ১৭, শ্রীলঙ্কা ১৯, আর মালদ্বীপ পিছিয়েছে ১৫ ধাপ। ব্যতিক্রম শুধু ভুটান আর নেপাল। দেশ দুটি এগিয়েছে যথাক্রমে ৩২ ও ৩০ ধাপ।

যেকোনো দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির সম্পর্ক থাকে। এ অঞ্চলের যে দেশগুলোতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মান কমেছে, সে দেশগুলোর রাজনীতির গতিপ্রকৃতির খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, তঁাদের কারও কাছে কি মানের এই অবনতির বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হবে? নাকি এই দেশগুলোর সব কটির প্রতিও আরএসএফের বিদ্বেষ আছে? আর প্রেম আছে ভুটান ও নেপালের প্রতি?

বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিপীড়ন ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ব্যাপকভাবে দায়মুক্তি ভোগ করে আসছে বলে তথ্য রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিপীড়ন, হত্যা ও দুর্নীতির খুব কমসংখ্যক ঘটনাতেই তদন্ত ও বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্রিডম হাউসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলের ‘আংশিক স্বাধীন’ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শেষে দিকে। ২০১৭ সাল থেকে পরপর চার বছর ধারাবাহিকভাবে এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি দেখা গেছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ যেখানে ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছিল ৪৭, সেখানে ২০২১ সালে পায় ৩৯। আইনমন্ত্রী তখন বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘রিপোর্টটি অ্যাবসলিউটলি বায়াসড ও আনসাবস্টেনশিয়েটেড (পুরোপুরি পক্ষপাতমূলক ও ভিত্তিহীন)।’ আমাদের জানতে ইচ্ছা করে, বাংলাদেশকে নিয়ে সবাই এমন ‘পক্ষপাতমূলক ও ভিত্তিহীন’ প্রতিবেদন দিতে মুখিয়ে আছে কেন?

প্রশ্ন আরও আছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের ভাষায় যে মহলটি ক্রমাগত ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছে, ধরে নিচ্ছি তারা বিএনপি-জামায়াত, তাদের কথাই কেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুনছে?

বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিপীড়ন ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ব্যাপকভাবে দায়মুক্তি ভোগ করে আসছে বলে তথ্য রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিপীড়ন, হত্যা ও দুর্নীতির খুব কমসংখ্যক ঘটনাতেই তদন্ত ও বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আইনে বলা হয়েছে বিচার বিভাগ স্বাধীন। কিন্তু দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার বিভাগকেও আপস করতে হচ্ছে। এই প্রতিবেদনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মিডিয়া রিপোর্ট এবং কিছু এনজিও থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশের মানবাধিকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করা হয়েছে।’ এর সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, ‘এনজিওগুলো সব সময়ই সব জায়গায় নেতিবাচক জিনিস দেখে এবং অন্য একটি দল আছে, যারা শুধু বিদেশে আশ্রয় চায় এবং সুবিধা পাওয়ার জন্য দেশের নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।’

আর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের প্রতিক্রিয়া ছিল এ রকম, ‘খুবই দুঃখের ও পরিতাপের বিষয় হলো অতীতের বছরগুলোর মতো একটি ধারাবাহিকতা প্রতিবেদনে আছে। একটা গৎবাঁধা বিষয় আছে। বাংলাদেশে সরকারবিরোধী যেসব প্রোপাগান্ডা মেশিন আছে, সে মেশিনগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে তথ্য নেওয়া হয়েছে বলে মনে করি।’

আমাদের আরও জানতে ইচ্ছা করে বাংলাদেশের এত বড় রাষ্ট্রযন্ত্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিদেশে এত মিশন—তারা তবে করছেটা কী? সরকারের কথা বিবেচনায় না নিয়ে কোনো দূতাবাস কেন তাদের বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ‘মিডিয়া রিপোর্ট’ বা কিছু এনজিওর ওপর ভরসা করে? কেন বাংলাদেশের ‘সরকারবিরোধী প্রপাগান্ডা মেশিন’ থেকে প্রাথমিক তথ্য নেয়? আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে কেন সরকারের ভাষ্য বিশ্বাস করানো যায় না? বাংলাদেশ সরকারের তরফে নিয়োগ দেওয়া লবিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তবে কী করছে? সবাই বাংলাদেশের ওপর এত খেপে গেল কেন?

শব্দদূষণে ঢাকা সবার শীর্ষে, বায়ুদূষণে বাংলাদেশ ১ নম্বর, বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে ঢাকার একেবারে নিচের দিকে অবস্থান, প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৫২ জন মানুষ নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ, ন্যূনতম মজুরিতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা, স্ত্রী নির্যাতনে চতুর্থ ও বাল্যবিবাহে বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করা, সুষম উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা, জিডিপির মাত্র ৩ ভাগ খরচ করে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ে বৈশ্বিক ক্ষেত্রে তলানিতে অবস্থান করা, সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্বে ৪ নম্বরে অবস্থান করা বা ডিজিটাল কোয়ালিটি অব লাইফের সূচকে তলানির দিকে থাকা—এগুলো সবই কি এসব জরিপের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর বাংলাদেশ বিদ্বেষের ফল?

আবার অনেক আন্তর্জাতিক সূচকে ভালো করছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ ১০-এর মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বিশ্বে অষ্টম-নবম স্থান ধরে রাখা, চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক বা আয় ও আয়ুতে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকা, মাছ উৎপাদনে সাফল্য—এই সূচকগুলোকে কীভাবে নেব আমরা? এগুলোকে গ্রহণ করব, নাকি একে সূচক তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাগুলোর ‘বাংলাদেশপ্রেমের’ ফল হিসেবে বিবেচনা করব?

ক্ষমতায় থাকলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচক ‘প্রত্যাখ্যান’ আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে বা নিজের সুবিধামতো তাকে ‘গ্রহণ’—এই দ্বিমুখী নীতি থেকে আমাদের রাজনীতিবিদেরা মুক্ত হবেন কবে?

এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন