>ভিশন ২০২১ অর্জন করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো প্রথমটি।

আগামী পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের কিছু বড় ধরনের পরিকল্পনা আছে। স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীর আগমনের প্রাক্কালে এবং ভিশন ২০২১-এর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতি আকুলভাবে মধ্যম আয়ের অবস্থা অর্জনের প্রত্যাশা করছে। অর্থনৈতিক লক্ষ্যের পাশাপাশি অন্যান্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা, সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা, সর্বত্র পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং এগুলোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা করা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধন করেছে দারিদ্র্য অর্ধেকে কমিয়ে আনা এবং প্রতিবছর প্রায় ৬ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে। কিন্তু ভিশন ২০২১ বাস্তবায়িত করতে হলে বাংলাদেশকে সেই সমস্যাগুলোও সংশোধন করতে হবে, যেগুলো প্রতিনিয়ত এ দেশের উন্নয়নের প্রচেষ্টাগুলোকে ব্যাহত করে চলেছে। এটি করতে সরকারের অংশীদার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক দাতা থেকে সাধারণ নাগরিকদেরও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সুতীক্ষ্ণভাবে মনোনিবেশ করতে হবে, যা বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি সফল হতে সহায়তা করবে এবং সবচেয়ে ন্যূনতম খরচে।
বাংলাদেশের সামনে এখনো বড় বড় চ্যালেঞ্জ আছে। জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের দুজন পড়তে জানেন না। এ ছাড়া অপর্যাপ্ত ও বিপজ্জনক সড়ক অবকাঠামো থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সীমিত সুযোগ পর্যন্ত আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে।
একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য এখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জকে অপ্রতিরোধ্য মনে হতে পারে এবং আর্থিক তহবিল ও সম্পদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অপুষ্টির শিকার জনগোষ্ঠীকে অনুপুষ্টি প্রদানের প্রচেষ্টার মাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং শিশুর পুষ্টিবিধান করাই কি আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নয়? পরিবহন অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? যেমন, পদ্মা সেতু? হয়তোবা বেতার সংযোগের বিস্তৃতি ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সবচেয়ে মূল্যবান হবে? অথবা হয়তো আমাদের উচিত ছোট মাপের কৃষকদের সহযোগিতা করা, যাঁরা এখনো বহুমুখী শস্য উৎপাদন নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন?
এসব কঠিন সমস্যার জন্য প্রস্তাবিত সমাধানের কমতি নেই। আমরা সরকার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, চিন্তাবিদ এবং শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে ৪০০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি এবং এক হাজারেরও বেশি প্রস্তাব শুনেছি। কিন্তু কোনগুলো সর্বশ্রেষ্ঠ?
বাংলাদেশ অগ্রাধিকার প্রকল্প, ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে, সর্বনিম্ন খরচে কোন সমাধানটি সবচেয়ে ভালো করবে তার উত্তর দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে। সরকারের দ্বারা হোক অথবা আন্তর্জাতিক দাতাদের দ্বারা—ব্যয়কৃত প্রতিটি টাকা—সবচেয়ে ভালো করার সম্ভাবনা আছে এমন সমাধানের ক্ষেত্রে কাজে লাগানোটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সর্বাধিক, আমেরিকানরা যেমন বলে, ‘যথার্থ মূল্য’ পেতে চাই।
আমাদের বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দলগুলো ব্যয়িত প্রতিটি টাকায় কোন সমাধানটি সর্বোচ্চ সুফল বয়ে আনতে পারে, তা খুঁজে বের করতে ১৭টি বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রের মধ্যে ৭৮টি কৌশল পরীক্ষা করে দেখেছে। গবেষণা প্রকল্পটি আমাদের শুধু কোন এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তা-ই বুঝতে সাহায্য করবে না, বরং প্রতিটি এলাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল অনুসরণেও সাহায্য করতে পারে।
আমাদের বিশেষজ্ঞরা একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, যা সীমিত সম্পদ কীভাবে ব্যয় করা যায় তার ওপর গুরুত্বারোপের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে প্রকৃত তথ্যগুলো প্রদান করে: ব্যয়-সুবিধার বিশ্লেষণ। আর তাদের গবেষণাসমূহ শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা এবং ব্যয়ই অন্তর্ভুক্ত করে না—এগুলো সামাজিক, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় রাখার জন্যও পরিকল্পিত।
শুধু আত্মবাদী মানদণ্ড এবং আবেগের ওপর ভিত্তি করে এগুলোকে বাছাই করা ছাড়াও প্রতিটি প্রস্তাবিত সমাধানের খরচ হিসাব করা এবং প্রতিটির জন্য মোট সুফল তুলে ধরার মাধ্যমেও আরও বৈষয়িক পদ্ধতিতে আমরা প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করতে পারি। আমরা বিস্তৃত বিষয়সমূহের তুলনা এবং বৈপরীত্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও বিশ্লেষণটিকে ব্যবহার করতে পারি; শিক্ষা–বিষয়ক সংশ্লিষ্টতা থেকে শুরু করে বায়ুদূষণ পর্যন্ত এবং মধ্যবর্তী সবকিছুর ক্ষেত্রেই।
প্রদত্ত ঝুঁকি থাকলেও এই পদক্ষেপ থেকে একটি অবিশ্বাস্য প্রতিদান পাওয়া যেতে পারে। কিছুটা মঙ্গল করতে পারে এমন মানসম্পন্ন নীতি গ্রহণ করুন। আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে প্রতিটি ব্যয়িত টাকা সাধারণত ৭ টাকার অবদান রাখে। এটি নিঃসন্দেহে মর্যাদাসম্পন্ন। কিন্তু আমরা আরও অনেক বেশি মঙ্গল করতে পারি, যদি আমরা আরও সুনির্দিষ্টভাবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধানসমূহের প্রতি মনোযোগ দিই। ১২০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ এবং বেশ কিছু নোবেল বিজয়ীর দ্বারা করা আগের একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি ব্যয়িত টাকা মাত্র ৭ টাকার পরিবর্তে ৩২ টাকার অবদান রাখতে পারে। ২৪৫ বিলিয়নেরও বেশি টাকার জন্য, যা দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে প্রতিবছর ব্যয় করে, ৬ ট্রিলিয়ন টাকার একটি বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। বস্তুত যেটি দেশের জিডিপির অর্ধেক।
অনুরূপভাবে, ভেবে দেখুন আমরা যদি জাতীয় বাজেটকে আরও সাশ্রয়ী খরচের দিকে পরিচালনায় সাহায্য করতে পারতাম! বার্ষিক সরকারি ব্যয়ের ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকাকে ৫৫ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নীত করার মাধ্যমে সামাজিক সুবিধা বৃদ্ধির সম্ভাব্যতা ধরে রাখা যেত; প্রতিবছর।
ভিশন ২০২১-এর ওপর সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দূরদৃষ্টি ছাড়া একটি জাতি হলো একটি পথভ্রষ্ট জাতি’। বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো, কৌশল এবং সমাধানের একটি নকশা তৈরি করবে, যা দেশকে তার দর্শনের দিকে পরিচালনা করতে সাহায্য করবে।
প্রথম আলো পত্রিকায় এই সিরিজের আরও কিছু প্রবন্ধ প্রকাশের আশা রয়েছে। সেখানে আমরা বেশির ভাগ বিস্তারিত এবং উদ্ভাবনীমূলক গবেষণা উত্থাপন করব, যা আমাদের সবাইকে বাংলাদেশের জন্য সেরা সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। আমি আপনাদের ফেসবুকে এবং আলোচনায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। মে মাসে, যখন আমাদের সব গবেষণা প্রকাশিত হয়ে যাবে, তখন কোন পরিকল্পনাটি বাংলাদেশিদের উন্নতিতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ, এবং সর্বাপেক্ষা কম খরচে, তা নিয়ে কঠিন কিন্তু ফলপ্রসূ আলোচনা করতে আমরা সবাই প্রস্তুত হব।
ড. বিয়ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0