দু–একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সব ভাষারই একটা লিখিত রূপ থাকে, যার অধিকার পেতে সাক্ষরতার চাবিটা লাগে। এই রূপটি চর্চিত, এর ব্যবহারের পেছনে চিন্তা, কল্পনা, সময় আর অভিনিবেশের বিনিয়োগ থাকে। অন্য একটি রূপ কথ্য, যার অংশীদারত্ব ওই ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিংহভাগ। কথ্যচর্চা ব্যাপক, তাৎক্ষণিক এবং অনেক ক্ষেত্রেই চটজলদি। যে জনগোষ্ঠী যত বেশি ভাষাসচেতন, শিক্ষাপ্রাপ্ত, তার ভাষাচর্চা তত সংহত, সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান, তার ভাষায় আড়ষ্টতা থাকে না, ভিন্ন ভাষার অকারণ আগ্রাসন থাকে না। সে ভাষাভাষী তাদের সূক্ষ্ম-বিমূর্ত চিন্তাগুলোও অবলীলায় ও সুবিন্যস্তভাবে প্রকাশ করতে পারে।

পশ্চিমের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানে দেখি, বক্তারা যে অনেক জটিল বিষয়ও চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁরা যখন কোনো কূট বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখনো তাঁদের ভাষা ব্যবহার থাকে বলিষ্ঠ, ত্রুটিহীন। কিছুদিন আগে ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটিশ সংসদে বিতর্ক হলো। বিরোধী সাংসদেরা প্রধানমন্ত্রীর দিকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ভাষার শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। তাঁর উত্তরগুলো কাগজে লিখে নিলে দেখা যাবে তাঁর প্রতিটি বাক্য শুদ্ধ, শব্দ বা শব্দবন্ধের পুনরাবৃত্তি নেই।

ইংরেজ বা আমেরিকানরা না হয় দুনিয়ার ওপর দীর্ঘদিন খবরদারি করেছে, আমেরিকা এখনো করছে, বিত্তবৈভবে সবার ওপরে থেকেছে, শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে টাকার সমুদ্র ঢেলেছে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর বেশির ভাগ ওই দুই দেশে, বই প্রকাশনা আর বই পড়ার দিক থেকেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যখন ভাষা ব্যবহারের পেছনে অকাতরে মেধা ও শ্রম দিয়েছে, বিদ্যালয় থেকে শুরু করে করপোরেট বিশ্ব পর্যন্ত ভাষার সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহারের পেছনে বিনিয়োগ করেছে, তখন ভাষার দুটি রূপই তো হয়ে দাঁড়াতে পারে সতেজ, ঈর্ষণীয়ভাবে সাবলীল, মানলাম। কিন্তু কলম্বিয়া? ভেনেজুয়েলা? অথবা পেরু? এ দেশগুলো তো কিছুদিন আগেও তৃতীয় বিশ্বের মানচিত্রে ছিল। এখনো এ দেশগুলো গরিবি হটাতে পারেনি, শিক্ষার মান উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে আছে এবং পশ্চিমা পুঁজিবাজারের আগ্রাসনের নিচে ধুঁকছে। তাহলে তাদের একজন গল্পকার কী করে তার মাতৃভাষায় সেই দখল এবং সেই মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, এর ব্যবহারে সেই কুশলতা দেখাতে পারেন, যা একজন ইংরেজি বা আমেরিকান ঔপন্যাসিক, নাট্যকার দেখাতে পারেন?

বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টক শো, রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা, সংসদের বিতর্ক অথবা একাডেমিক আলোচনা শুনুন, হতাশ হবেন। মনে হবে মাতৃভাষায় মনের ভাবটি সাবলীল ও শুদ্ধভাবে, অনাবশ্যক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করে প্রকাশ করাটা যেন জগতের সবচেয়ে দুরূহ কাজ। বক্তারা বেশির ভাগ বাক্য সমাপ্ত করতে পারেন না, এক বাক্যের লেজ মুড়িয়ে দেয় আরেক বাক্যের দাঁত। ‘ইয়ে’, ‘মানে’, ‘ধরেন’ ইত্যাদি ঠেকা-শব্দে আকীর্ণ থাকে আধা শেষ হওয়া বাক্যগুলো। বাংলা ভাষার এমন দুর্বিপাকের একটা বড় কারণ ইংরেজির আগ্রাসন। ইংরেজি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রচুর আছে। আরও শব্দ আমরা নেব, ইংরেজি এবং দুনিয়ার অন্য অনেক ভাষা থেকে, কিন্তু আমাদের নিজেদের শর্তে। সেগুলো হবে মূলত বিশেষ্য, যেহেতু বস্তুর জগতে আমরা আছি, তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং বস্তু আসে তার নাম-পরিচয় নিয়ে। মডেম আমরা তৈরি করিনি, স্লাইড ক্যালিপার্সও না। কিন্তু ‘গর্জিয়াস?’ ‘বাট?’ ‘সেন্ড করো?’ সুন্দর ও প্রচলিত এমন সব বাংলা শব্দের ইংরেজি বিকল্প আমরা ব্যবহার করি যাতে মনে হতে পারে, বাংলা শব্দগুলো হয় নুলো, না হয় অচ্ছুত।

আমাদের দেশে ভাষা নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হয়, বিতর্ক হয়। এটি স্বাভাবিক। কারণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন ২৭ কোটির মতো মানুষ। বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি, একটি পক্ষ প্রমিত ভাষা আর শুদ্ধ উচ্চারণ বলে কিছুই স্বীকার করতে চায় না। তারা বলে, প্রমিত বলে যা চলে তা মেকি এবং কলকাতার ভাষা। তাদের কথায় যুক্তি আছে। প্রমিত ভাষাটা তৈরি করা ভাষা, শিক্ষিতজনেরা এটি করেছেন। যেহেতু আমাদের দেশে শিক্ষার অধিকারবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক, তাতে প্রমিতকে এলিটধর্মী বলাই চলে। এই যুক্তি মেনে নিয়েও বলা যায়, তাহলে আমাদের শিক্ষার, দর্শনচর্চার, শ্রেণিকক্ষে বক্তৃতার, সাহিত্যের ভাষা কোনটি হবে? সেখানে কি এমন একটি ভাষা ব্যবহার করব না, যার সেই ক্ষমতা আছে, যা দিয়ে সূক্ষ্ম-জটিল বিষয়গুলো তুলে ধরা যায়? যা আমাদের ভাষার দীর্ঘ ঐতিহ্য লালন করে? যে কবি বইমেলাতে বই ছেপে বের করেন, তিনি কি এলিটের দলে নাম লেখান না, যেহেতু দেশের মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষ তাঁর বইটি পড়তে সক্ষম? যিনি শ্রেণিকক্ষে সুন্দর করে বাংলা বলেন, তিনিই কি এলিট হয়ে যান? যিনি মুখের কথাকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে ভাষায় ইংরেজি শব্দের বন্যা বইয়ে দেন, তিনি কি নিম্নবর্গীয়? যিনি ইংরেজি-বাংলা-মিডিয়া ভাষার জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলেন, তিনি বিপ্লবী?

ভাষা নিয়ে এসব আমার দৃষ্টিতে একধরনের অরাজকতা। কলকাতার সঙ্গে তুলনা টানতে গিয়ে আমরা অকারণে স্পর্শকাতর হয়ে পড়ি। বাংলা ভাষার রাজধানী ঢাকা, আমরা যেভাবে এই ভাষা গড়ব, সেভাবেই এটি ভবিষ্যৎ জুড়ে থাকবে। এ জন্য আমাদের দায়িত্বই বেশি। আমাদের ভাষার অসংখ্য আঞ্চলিক রূপ আছে, আমি নিজেই তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এর অন্তত ২৫টি রূপের সাক্ষাৎ পেয়েছি। এখন মিডিয়ার ভাষা এ আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে ‘আইতাছি’, ‘খাইতাছি’ ধরনের প্রমিতকরণের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তা ছাড়া, আমাদের আদিবাসীদের ভাষা আছে, ঢাকার কুট্টি ভাষা আছে, চৌরাস্তার, ইয়ার-দোস্তির ভাষা আছে, সবই তো সগর্বে থাকা উচিত। পাশাপাশি একটি প্রমিত ভাষা কি আমরা ব্যবহার করতে পারি না, যে ভাষায় বৈকল্য নেই, প্রকাশের দুর্বলতা নেই, বিদেশি ভাষার অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ নেই? যে ভাষায় একদিন জাতিসংঘের একটি ভাষা হবে, বিশ্বের অনেক মানুষ শিখবে? ভাষার একটি বলিষ্ঠ রূপ প্রতিষ্ঠা নিয়ে আমাদের দ্বন্দ্ব কেন?

আমাদের ভাষা ব্যবহারে সক্ষমতার যাত্রা শুরু পরিবার থেকে, তারপর বিদ্যালয় সে দায়িত্ব নেয়। সব ক্ষেত্রেই তো উন্নতি চাই। কিন্তু সবাই কি ভাবি, বাংলাটাকে ঝরঝরে করব, সুন্দর করব, তাহলে অনেকটাই অর্জন করা যায়। ইচ্ছাটা থাকতে হবে, ইচ্ছার সঙ্গে চর্চাটা মেলাতে হবে।

ভাষা নিয়ে তরুণদের এক সমাবেশে এক কলেজছাত্রী আমাকে বলেছিল, প্রমিত ভাষা এলিটের ভাষা, এর প্রয়োজন নেই। যে বাক্য গঠনে, উচ্চারণে প্রশ্নটি সে করেছিল, তাকে বলেছিলাম, সেটাই আমার কাছে প্রমিত। তারপরও তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যেহেতু সে মায়ের ভাষাটাই তুলেছিল, তার মা ঘরে যে পোশাক পরেন, তা লন্ড্রি থেকে ধুয়ে আনা, ইস্তিরি করা, নিপাট কি না। সে বলেছিল, না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি যখন সন্ধ্যার পর কোনো বিয়েতে যান, ঘরের পোশাকে চলে যান কি না, তার চুল অবিন্যস্ত থাকে কি না। সে হেসে বলেছিল, তার মা যত্ন করে, পরিপাটি হয়ে মুখে একটু প্রসাধন নিয়ে যান এবং সত্য বলতে কি, তার মাকে তখন তার কাছে খুব সুন্দর মনে হয়।

আমি বলেছিলাম, তার মায়ের মতো মাতৃভাষারও একটা পরিপাটি রূপ থাকতে কি পারে না, যার প্রয়োজন নিত্যদিনের জীবনচর্চায় না হলেও শ্রেণিকক্ষে, উন্মুক্ত মঞ্চে, জনসমাগমে অনুভূত।

এই সুন্দর রূপটাকে প্রমিত, চর্চিত, যা–ই বলি, এতে ভাষা তার শক্তি আর মহিমার ভিন্ন একটি প্রকাশ নিয়ে হাজির হয়।

এ প্রকাশটি বাংলা ভাষার আরও ২৫টি প্রকাশকে অবহেলা করে না। বরং এগুলো থেকেই শক্তি নেয়।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন