default-image

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বেসরকারিভাবে জো বাইডেন নির্বাচিত হয়েছেন। পৃথিবীর নানান প্রান্তে উৎসব হয়েছে। তবে পিকেকে-কে সমর্থকদের মধ্যে এই উৎসবের আমেজ ছিল বেশি। পিকেকে সমর্থকেরা এরবিল, সুলায়মানিয়া, হাসাকেহ, কোবানি ও মানবিছে আতশবাজি ফুটিয়ে বাইডেনের জয়ে উল্লাস করেছে। এই উল্লাসে ছিল নতুন এক শুরুর স্বপ্ন। পিকেকে মূলত বাইডেনের জয়কে ওবামা প্রশাসনের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং ওয়াশিংটনের ক্ষমতাবৃত্তের জয় হিসেবে দেখছে। ওবামা প্রশাসন এবং ওয়াশিংটনের ক্ষমতাবৃত্ত—উভয় পক্ষই সিরিয়ায় পিকেকের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের পক্ষে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি বিশ্ব আবার কুর্দি বসন্ত দেখবে।
ওবামা-বাইডেন এবং ওয়াশিংটন ক্ষমতাবৃত্তের তথাকথিত ‘আরব বসন্তের’ বিপ্লবে আটকে যাওয়া দেশ সিরিয়া। প্রায় এক যুগেও থামেনি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। সময়ের ব্যবধানে শত্রু-মিত্র পরিবর্তন হয়েছে। উদ্ভব হয়েছে আইসএসের মতো নানান সন্ত্রাসী সংগঠনের। তবে মার্কিনদের নাকের ডগায় তালেবানের মতোই ঝড়ের গতিতে আইসএসের উদ্ভব কীভাবে সম্ভব হলো, তা আজও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কৌতূহলের বিষয়। আবার সেই আইসএসের সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য আসাদ এবং নিজেদের ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন পিকেকের সঙ্গে জোট বাঁধে ওয়াশিংটন, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিধারা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
মার্কিন-পিকেকে বাহিনীর প্রথম বাধা আঙ্কারা। আঙ্কারার চোখে পিকেকে এবং ডেমোক্রেটিক ফোর্সের মধ্যে কোনোই তফাত নেই এবং উভয়েই সন্ত্রাসী সংগঠন। কিন্তু ওয়াশিংটন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সকে (এসডিএফ) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করে না। মূল ঝামেলা এখানেই।

পিকেকে আইসএসের বিরুদ্ধে মাঠে নামানোর জন্য ওয়াশিংটনে যে স্বল্পসংখ্যক ক্ষমতাধরেরা কলকাঠি নেড়েছেন, তাঁদের মধ্যে বাইডেন ছিলেন অন্যতম। তুরস্কের অনুরোধ সত্ত্বেও বাইডেন পিকেকের বিষয়ে ওবামাকে রাজি করিয়েছিলেন। গত প্রায় ৪৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বাইডেনের বন্ধুত্ব পেয়েছে প্রধানত তিনটি দল। প্রথমত, ওয়াশিংটনের ক্ষমতাবৃত্ত; দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল এবং সর্বশেষ কুর্দিরা। শুরুটা হয়েছিল ১৯৯০ সালে যখন বাইডেন সিনেটের সদস্য ছিলেন। তখন আঙ্কারা ইরাকের কুর্দি অঞ্চল থেকে পিকেকে-কে উৎখাতের জন্য অভিযান পরিচালনা করলে বাইডেন তুরস্কের বিরুদ্ধে সিনেটে রেজল্যুশন আনেন। পরের বছরগুলোতে বাইডেন-কুর্দি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থায়িত্ব লাভ করে। ডেমোক্র্যাট হওয়া সত্ত্বেও ইরাকযুদ্ধের পক্ষে বাইডেনের ভোট, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইরাকে কুর্দিদের জন্য ‘স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ গঠনে সমর্থন এবং সর্বশেষ সিরিয়ার যুদ্ধে পিকেকে-কে মার্কিনদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ; দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ককে অভেদ্য করেছে।
অভেদ্য এই সম্পর্ককে পুঁজি করে সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গড়ে তুলতে চান সিরিয়ার পিকেকে-প্রধান মাজলুম কোবানি। মাজলুম কোবানির আসল নাম ফেরহাত আবদি শাহিন। একসময় পিকেকের কমান্ডার ছিলেন। মার্কিনরা তাঁর নাম বদলে মাজলুম কোবানি রেখেছে। নিন্দুকেরা বলেন নাম বদলের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শিক অবস্থানও বদল করেছেন আবদি শাহিন। নির্বাচনে বিজয়ের পর শাহিন বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়ে সিরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের আবেদন জানিয়েছেন, যার লক্ষ্য, মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তাঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আরেকটি বসন্তের সূচনা।
মার্কিন-পিকেকে বাহিনীর প্রথম বাধা আঙ্কারা। আঙ্কারার চোখে পিকেকে এবং ডেমোক্রেটিক ফোর্সের মধ্যে কোনোই তফাত নেই এবং উভয়েই সন্ত্রাসী সংগঠন। কিন্তু ওয়াশিংটন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সকে (এসডিএফ) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করে না। মূল ঝামেলা এখানেই। মার্কিনদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজ সীমান্ত থেকে এসডিএফকে দূরে রাখতে আঙ্কারা গত কয়েক বছরে সিরিয়ায় বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আঙ্কারার অর্থনৈতিক দুর্দিনে যদি বাইডেন উভয় পক্ষকে মীমাংসায় নিয়ে আসতে পারেন, তাহলে আরেক কুর্দি বসন্ত দেখতে পারে বিশ্ব।

দ্বিতীয়ত, মার্কিনরা যখন পিকেকেকে অনবরত সাহায্য করে আসছিল, তখন আঙ্কারা অনেকটা লিবিয়ার মতন করেই সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের আরব এবং পিকেকের বিরুদ্ধে কুর্দি গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় পিকেকে এবং মার্কিন ড্রোন হামলার শিকার এই গোত্রগুলোর পিকেকে এবং মার্কিনবিরোধী মনোভাব অত্যন্ত সক্রিয়। এই সক্রিয়তা সম্ভাব্য বসন্তকে আটকে দিতে পারে। এমনকি মার্কিন-পিকেকে বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
তৃতীয়ত, ইরাকের বারজানি পরিবারের সঙ্গে পিকেকের দীর্ঘ বৈরিতা। সাধারণ কুর্দিরা বারজানি পরিবারকে শ্রদ্ধা করে। ঐতিহাসিকভাবে বারজানি পরিবার আঙ্কারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। সাদ্দাম আমলে যখন বারজানি পরিবারের পাসপোর্ট ছিল না, তখন আঙ্কারার প্রদত্ত পাসপোর্ট নিয়েই বারজানি পরিবার পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছে। সাম্প্রতিক সিরিয়ার কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চলে বারজানি পরিবারের সমর্থিত ‘কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি’ পিকেকের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক কুর্দিদের ছোট ছোট রাজনৈতিক গ্রুপগুলোকে একত্র করে রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে। অভ্যন্তরীণ এই বিবাদ সম্ভাব্য বসন্তকে গতিহীন করতে পারে।
মার্কিন সমর্থনের সম্ভাব্য এই বসন্তের বিরুদ্ধে আঙ্কারার অবস্থান দুর্দশাগ্রস্ত। এসডিএফকে বৈধতা প্রদানে অস্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবও আঙ্কারার পক্ষ থেকে বারবার নাকচ করা হয়েছে। বাইডেন প্রশাসন যদি আঙ্কারা এবং এসডিএফের মধ্যে মীমাংসায় ব্যর্থ হয়, তাহলে সংঘর্ষ অনিবার্য। অনিবার্য এই সংঘাতে এসডিএফের পক্ষে থাকার ঘোষণা বাইডেন বহুবার দিয়েছেন। সচেতন পাঠক প্রশ্ন তুলতেই পারেন, তাহলে আঙ্কারা মার্কিন-পিকেকের যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে? এই প্রশ্নের আপাত সোজাসাপ্টা উত্তর নেই। তবে যুদ্ধে না নামলে তুরস্কের ভাঙন সম্ভব হবে না। আবার যুদ্ধে নামলে আঙ্কারার ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ন্যাটো থেকে বহিষ্কারের সম্ভাবনা থাকছে। এসব সম্ভাবনার সমাধান আঙ্কারাকে বাইডেনের আমলে খুঁজতে হবে। তাই আগত দিনে আঙ্কারার পক্ষে দুঃসময় এড়ানো সম্ভব না-ও হতে পারে।
ট্রাম্প তাঁর কুর্দিবিমুখতার কথা বারবার জনসমক্ষে বলেছিলেন। বন্ধু হিসেবে নয়, বরং ট্রাম্প এসডিএফকে সিরিয়ায় মার্কিন পেট্রল কোম্পানির পাহারাদার হিসেবে দেখতে চান। ট্রাম্পের এই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে সিরিয়ান কুর্দিরা। গত গ্রীষ্মে মার্কিন এক তেল কোম্পানির সঙ্গে এসডিএফের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পেট্রল বিক্রির এই অর্থের পাশাপাশি মার্কিনরা ২০২০ সালে ৩০০ মিলিয়ন এবং ২০২১ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য বরাদ্দ করেছে এসডিএফের জন্য। বিপুল পরিমাণ এই আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের সঙ্গে সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের মদদ সম্ভাব্য কুর্দি বসন্তেরই বার্তা দিচ্ছে।


রাহুল আনজুম আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক গবেষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0