বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
তুরস্কের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত এক দশকে আশঙ্কাজনকভাবে লিরার দাম পড়ে গেছে। এর মধ্য দিয়েও বোঝা যায় তুরস্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাজারের ওপর অনেক নির্ভরশীল অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে তুরস্কেরই ক্ষতি হবে বেশি।

রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বেগে ফেলেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে তুরস্ক এস-৪০০ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কেনার পর ওয়াশিংটন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ২০১৯ সালে এই প্রযুক্তি তুরস্কের কাছে হস্তান্তরের পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের কর্মকর্তাদের ওপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান তৈরিতে গঠিত আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম থেকে তুরস্ককে বাদ দেওয়া হয়েছে। এরদোয়ান সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, তুরস্ক রাশিয়া থেকে আরেক দফায় ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি কিনবে।

এত সব উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্যে কি যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে? সম্ভবত না। সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে বাইডেন বা এরদোয়ান কারোরই মত নেই। বরং তুরস্ক সরকার বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে ৪০টি এফ-১৬ ফাইটার জেট এবং তুরস্কের পুরোনো বিমানকে আধুনিকায়নের জন্য ৮০টি আধুনিকায়ন কিট কেনার বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করছে। তুরস্ক তার সামরিক বাহিনীকে এফ-১৬ বিমানে সজ্জিত করার বিষয়ে অনেক আগে থেকেই আগ্রহী।

গ্রিস, রাশিয়া ও ইরানের মতো প্রতিবেশীরা যখন সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন তুরস্কের হাত–পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তবে নিজেকে সামরিক প্রযুক্তিতে ভালোভাবে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে এখনো আঙ্কারাকে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ কারণেই এখনো তুরস্ক ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখার পক্ষে। তুরস্কের বেশির ভাগ নাগরিক এখনো ন্যাটোর সদস্যপদ ঠিক রাখাকে সমর্থন করে থাকেন। তুরস্কের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত এক দশকে আশঙ্কাজনকভাবে লিরার দাম পড়ে গেছে। এর মধ্য দিয়েও বোঝা যায় তুরস্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাজারের ওপর অনেক নির্ভরশীল অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে তুরস্কেরই ক্ষতি হবে বেশি। এরদোয়ান প্রথমে যেমনটা বলেছিলেন, সেই মতো যদি সত্যি পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের আঙ্কারা থেকে বহিষ্কার করতেন, তাহলে লিরার দাম আরও পড়ে যেত।

অন্যদিকে তুরস্ককে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেনের ভাষ্যমতে তুরস্ক হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘তথাকথিত কৌশলগত মিত্র’। কৌশলগত কারণেই তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না। ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় যাবতীয় কার্যক্রমে তুরস্কের সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওই অঞ্চলে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাশিয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সে কারণে সেখানে ন্যাটোর জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি, যার জন্য তুর্কি সেনাদের উপস্থিতি প্রয়োজন। তুরস্ক তাদের বানানো বেরাকতার টিবি ২ নামের যে ড্রোন ইউক্রেনের কাছে বিক্রি করেছে, তা ডোনবেসে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর কৌশলগত মূল্য আছে।

কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো বাহিনীকে তুর্কি বাহিনী যে সমর্থন দিয়ে থাকে, তারও বড় ধরনের কৌশলগত মূল্য আছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ও উত্তর আফ্রিকায় তুরস্কের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যাচ্ছে। সিরিয়ায় এবং লিবিয়ায় তুরস্কের বাহিনী রাশিয়াপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে। এটি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। একইভাবে আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দর পরিচালনার ভার তুরস্কের বাহিনী নেওয়ায় সেখানে রাশিয়া যা ইচ্ছা তা–ই করার সুযোগ পাবে না—এই বিবেচনাও ওয়াশিংটন ও আঙ্কারাকে সম্পর্ক ধরে রাখায় সহযোগিতা করছে।

এই সব বিবেচনায় বলা যায়, বাইডেন ও এরদোয়ান দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে ঝালাই করতে পারেন। সে সুযোগ তাঁদের সামনে রয়েছে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

দিমিত্রি বেচেভ ভিয়েনায় অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান সায়েন্সের ফেলো

মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন