‘এই ঘটনার জন্য কাকে দায়ী করেন আপনি?’
জানি, আগুনে দগ্ধ যন্ত্রণাকাতর একটি মানুষের কাছে বা তাঁর অসহায় বেদনার্ত নিকটজনের কাছে এসব প্রশ্ন করাটাও একধরনের নির্মমতা। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব থেকেই হয়তো সতীর্থ একজন সাংবাদিক এই প্রশ্নটি করেছেন আজিজুর রহমানের স্ত্রীকে। শিল্পী বেগমের বয়স ২২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। আগের রাতে (২৭ জানুয়ারি) পেট্রলবোমায় ট্রাকচালক স্বামীর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার সংবাদ শুনে একা এক কাপড়ে সুদূর যশোর থেকে ছুটে এসেছেন সম্পূর্ণ অপরিচিত চট্টগ্রাম শহরে। যে বাসটিতে চেপে সারা রাতের ভ্রমণ শেষে এখানে এসেছেন, সেই বাসেও হামলা হতে পারত, স্বামীর মতো একই পরিণতি হতে পারত তাঁরও। কিন্তু সেসব দুশ্চিন্তা করার ফুরসত মেলেনি তাঁর। অনিদ্র রাত কেটেছে স্বামীটি বেঁচে আছে কি না, থাকলে কী অবস্থায় আছেন, দুটি ছোট মেয়েকে নিয়ে এখন কী করে কাটবে জীবন? এ রকম মীমাংসাহীন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খঁুজতে খঁুজতে। এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে বিভ্রান্ত শিল্পী বেগম। পাশে শয্যায় কাতরাচ্ছেন আজিজ (৩৫)। সারা শরীরে ব্যান্ডেজ, সারা মুখ ক্ষতবিক্ষত। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠবে যেকোনো অপরিচিত লোকও, শিল্পীর অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়।
স্ত্রীর কাছে প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আজিজুর রহমানের মুখের কাছে ঝঁুকে সাংবাদিক একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘এই ঘটনার জন্য...?’
কথা বলার মতো অবস্থা নয় আজিজের, অস্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, ‘কাউরে দায়ী করি না...।’ বলতে গিয়ে শরীরটা কেঁপে উঠল, গভীর অভিমানে চোখ থেকে গড়িয়ে নামল পানি।
কাকে দায়ী করবেন আজিজ? অবরোধ আহ্বানকারীরা শান্তিপূর্ণ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। সেই শান্তির নমুনা তো প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায়, টিভির পর্দায় দেখছে মানুষ। আর সরকার বলেছে, নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সেই নিরাপত্তাও তো দেখা হলো।
বার্ন ইউনিটে দেখলাম আজিজের পাশের শয্যাগুলোতে শুয়ে কাতরাচ্ছেন আরও কয়েকজন। সবাই শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ। তাজুল ইসলাম (৫০) নামের একজন এখানে ভর্তি হয়েছিলেন ১১ জানুয়ারি। তিনিও ট্রাকচালক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বারো আউলিয়ায় তাঁর বাড়ি। তাজুল জানালেন, ১১ দিন বেকার বসে ছিলেন সাতক্ষীরায়। হাতে টাকাপয়সা নেই, নিজেরই খাবার জোটে না, বাড়িতে সংসার খরচের টাকা কী করে পাঠাবেন—এই দুশ্চিন্তা থেকেই ঝঁুকিটা নিয়েছিলেন। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে চালবোঝাই ট্রাক নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের দিকে। বিপদ বুঝে যাত্রাবিরতি দিয়ে পাঁচ দিন খুলনায় ছিলেন। কিন্তু বিপদ পিছু ছাড়ল না তাজুলের। পাঁচ দিন পর যাত্রা শুরু করে ১০ জানুয়ারি কুমিল্লার কাছাকাছি এসে হামলার শিকার হলেন। গাড়িতে বসেই দেখতে পেয়েছিলেন অন্ধকারের ভেতর থেকে মৃত্যুদূতের মতো এগিয়ে আসছে তিনটি তরুণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেট্রলবোমা ছুড়ে দিয়েছিল তারা। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল শরীরের সব কাপড়চোপড়ে। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে রাস্তার পাশের বিলের মধ্যে ছুটতে শুরু করেছিলেন। ভাগ্যক্রমে সেখানে পেয়ে গিয়েছিলেন ছোট একটি জলাশয়। লাফিয়ে পড়েছিলেন সেখানে। কিন্তু পানি থেকে উঠে দেখেন আবার শরীরের নানা জায়গায় জ্বলে উঠেছে আগুন। এর মধ্যে এলাকার লোকজন জড়ো হয়েছে সেখানে। প্রথমে কুমিল্লা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আগুনে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ধারকর্জ করে সাত হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে তাঁকে। দুই হাত, বুক আর ঊরু পুড়ে গেছে তাজুলের। আর কখনো স্টিয়ারিং ধরতে পারবেন কি না জানেন না। স্ত্রী তাহেরা বেগমের চোখে অমানিশার অন্ধকার। তিন মেয়ে তানজু, তানিশা ও মায়মুনাকে রেখে এসেছেন ননদের কাছে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কখন ফিরে যেতে পারবেন বাড়িতে জানেন না। আমরাও জানি না এই পরিবারটি আর কখনোই ফিরে যেতে পারবে কি না আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে।
বার্ন ইউনিটের প্রতিটি শয্যা ঘিরেই এখন এ রকম একেকটি গল্প। প্রতিদিন সারা দেশেই এ রকম নির্মমতার গল্প রচিত হচ্ছে। এর শেষ কোথায়?
এবার অন্য একটি প্রসঙ্গে আসি। গত ২৯ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে গেছে ‘এফবি ইদ্রিস’ নামের একটি ট্রলার। কোস্টগার্ড ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছে, লাশ মিলেছে সাতজনের। নিখোঁজ যাত্রীদের অনেকেরই যে সলিলসমাধি ঘটেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ট্রলারের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। ঝঁুকি নিয়ে অবৈধভাবে এই যাত্রীরা মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন চাকরির আশায়। একশ্রেণির দালালের সহযোগিতায় সমুদ্রপথে অবৈধ উপায়ে মালয়েশিয়া (কখনো বা থাইল্যান্ড) যাওয়ার চেষ্টা নতুন ঘটনা নয়। গত তিন বছরে পাঁচটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন এলাকায়। এসব ট্রলারের ছয় শতাধিক যাত্রীর মধ্যে লাশ উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৭০ জনের। বাকি নিখোঁজ যাত্রীদের কপালে কী ঘটেছে সহজেই অনুমেয়। এই চেষ্টায় যাঁরা সফল হয়েছেন, তাঁরা সেখানে যে সোনার হরিণের (চাকরি) সন্ধানে গিয়েছিলেন তা আদৌ পেয়েছেন কি না, আমরা জানি না। তবে তাঁদের আত্মীয়-পরিজনের সূত্রে নানা সময়ে যেসব প্রতারণার কথা জানতে পেরেছি, তা মোটেও সুখকর নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জমিজমা বিক্রির টাকা দালাল চক্রের হাতে তুলে দিয়েও বৈধ কাগজপত্রের অভাবে সেখানে তাঁদের কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেও এসেছেন অনেকে। এখন প্রশ্ন উঠছে, জীবন তুচ্ছ করে কেন এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে চায় চাকরিপ্রত্যাশী যুবকেরা?
রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু বা বার্ন ইউনিটের শয্যায় অগ্নিদগ্ধের কাতরতার সঙ্গে কুতুবদিয়া চ্যানেলের ট্রলারডুবির ঘটনার আপাত কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু যে দেশে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে মাসে ৭ থেকে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করতে পারেন চালক, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন বাস বা ট্রাকচালক, এমনকি শহুরে বাজারে মাছ কাটার কাজ করেও দৈনিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করা সম্ভব যে দেশে, সেখানকার মানুষ কেন সর্বস্ব বাজি রেখে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বিদেশে সস্তায় শ্রম বিক্রি করতে যেতে চায়, সে কথাটা ভেবে দেখা দরকার।
দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে গরিব-ধনী-মধ্যবিত্ত সবারই জীবনে আজ অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা। শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ চাকরিজীবী কারোরই জীবন নির্বিঘ্ন নয়। তবু বিত্তবানরা কেউ কেউ আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় ফ্ল্যাট কিনছেন, সন্তানদের সে দেশে পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার আঁচ থেকে রক্ষা করতে চাইছেন। কিন্তু দরিদ্র কৃষক, রিকশা বা ট্রাকচালক, হকার বা ক্ষুদ্র দোকানদার কোথায় যাবেন? অর্থোপার্জনের জন্য বিদেশ যেতে চাইলে পদে পদে প্রতারণার ফাঁদ, আর দেশে ওত পেতে আছে পেট্রলবোমা। হয় বার্ন ইউনিট, নয় কুতুবদিয়া চ্যানেল—এই কী তার অনিবার্য গন্তব্য?
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন