default-image

অফিসের কর্মচারীদের নিয়ে একটা বাস আসে। ঢাকা মেট্রো ঝ ১১০১৩৬। কারওয়ান বাজারে প্রগতি ইনস্যুরেন্সের বিশাল উঁচু ভবনের গা ঘেঁষে বাসটা পার্ক করা থাকে নয়টা–পাঁচটা। কাছেই প্রথমার বইবিতান, সামিট ভবন, সিএ ভবন। বাসটার পাশে আরও নানা ধরনের গাড়ি পার্ক করা, সেসবের চকচকে ছাদে রোদ ঠিকরায়, ডাবওয়ালাদের দায়ের গায়ে সেই রোদ প্রতিফলিত হয়।

এই একটা বাসের নিচে এসে বিছানা পাতে একটা সংসার। একটা পলিথিন, একটা বালিশ। বহুদিন দেখেছি, এই বাসের নিচে চার চাকার মধ্যকার সামান্য ছায়ায় ঘুমোচ্ছে একটা দুগ্ধপোষ্য শিশু। বুকটা কেঁপে ওঠে, অফিস ছুটির পর ঘরমুখী যাত্রীদের বাসে তুলে নিয়ে বাসটা যখন স্টার্ট নেবে, বাচ্চাটা তার আগেই মায়ের কোলে ওঠে তো?

বিজ্ঞাপন

প্রগতি ভবনের দক্ষিণ পাশের পাটাতনে বসে ৫ নভেম্বর ২০২০ কথা বলি এই পরিবারটির সঙ্গে। মায়ের নাম পান্না। তাঁর বয়স আনুমানিক ৩০। তাঁর সাত বছর বয়সে তাঁর বাবার সঙ্গে তাঁদের বাড়ি যশোর থেকে গিয়েছিলেন মাইজদী চৌমুহনী। সেখানে তিনি হারিয়ে যান।

মানে, সাত বছরের পান্না মাইজদীতে বাবাকে হারিয়ে একা হয়ে গেল। শুরু হলো একা একা তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কল্পনা করতে পারি, ছোট্ট মেয়েটি বাবা বাবা বলে কাঁদছে। কেউ তাকে একটা বিস্কুট কিনে দিচ্ছে, কেউ হয়তো দিচ্ছে একটা রুটি। শুরু হলো পান্নার টোকাই জীবন। রাস্তায় ঘুমানো, চেয়েচিন্তে কাগজ শিশি-বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করে কোনোমতে দিন গুজরান। বছর দুয়েক পরে ৯ বছরের পান্না উঠে পড়ল ট্রেনে। নামল ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। সেখান থেকে রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে পৌঁছাল কারওয়ান বাজারে।

কারওয়ান বাজার কাউকে ফেরায় না। পান্না ফুটপাতে ঘুমায়। কাঁচাবাজারে সবজি টোকায়। হোটেলে হোটেলে পানি দেয়। দিন চলে যায়।

পান্নার বয়স যখন ১৪ কিংবা ধরা যাক ১৬, তখন বাবুল নামের একজনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে গেল। বাবুলও কারওয়ান বাজারের আড়তে মুটের কাজ করতেন। আগের মতোই কারওয়ান বাজারের লাগোয়া নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ কিংবা বলা চলে ভিআইপি সড়কের ফুটপাতে তাঁরা থাকেন। বৃষ্টির দিনে পলিথিন দিয়ে কোনো ভবনের দেয়াল ঘেঁষে ত্রিভুজাকার ছাউনি বানিয়ে নেন।

দিন যায়। তিনটা বাচ্চা হলো পান্নার।

এখন, ২০২০-এ পান্নার সঙ্গে থাকে তাঁর বড় মেয়ে লাবণী (১৪), ৮ বছরের ছেলে হাসান, আর ২ বছর ৫ মাসের মরিয়ম।

আমি মরিয়মকে তার এক মাস দুই মাস বয়স থেকেই এই বাসের নিচে শুয়ে থাকতে দেখেছি।

পান্নাকে বলি, স্বামী কই? পান্না জানান, স্বামীর মাদারীপুরের বাড়িতে আগে থেকেই বউ ছিল, এই সংসার ফেলে সে পালিয়ে গেছে।

কিশোরী লাবণী আর বালক হাসান খুবই চটপটে। মাকে কোনো প্রশ্ন করা হলে তারা দুজন আগে আগে উত্তর দেয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

লাবণী পড়ে ক্লাস ফোরে। আগে এই এলাকাতেই তার স্কুল ছিল। সাজেদা ফাউন্ডেশনের স্কুল। পরে স্কুলটা চলে গেছে সদরঘাট। সেখানে ‘রাজাদৌড়ি’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে লাবণী। সদরঘাটে সাজেদা ফাউন্ডেশনের হোস্টেলেই সে থাকত করোনাকালের আগে। এখন স্কুল বন্ধ। হোস্টেল বন্ধ। ১৪ বছরের লাবণী রাস্তায় থাকে। রাস্তায় ঘুমায়। অফিস টাইমে প্রগতি ভবনের পাশে বাসের নিচে এসে আশ্রয় নেয়। তার হাতে সিগনেচার পেনের সেট। নানা রঙের কলম। সে ছবি এঁকেছে। আমাকে সে ছবি দেখায়।

বেলা একটা। তারা বলল, আজ তাদের খাওয়া হয়নি। পান্না কারওয়ান বাজারে একটা হোটেলে ২০ কলসি পানি দেন। ‘কোন দোকান?’ হাসান জবাব দেয়, ‘আব্বাস ভাইয়ের দোকান।’ পান্না পান দুই শ টাকা। আজ তাঁর শরীরটা ভালো নয়। আজ তিনি কাজে যাননি। টাকা নেই। তাই খাওয়া নেই।

হাসান পড়ে ভিআইপি সড়কের পশ্চিম দিকের ‘পান্তারোডে’ খান হাসান আদর্শ বিদ্যালয়ে। কোন ক্লাসে? ‘শিশু শ্রেণিতে।’

বড় হয়ে কী হবা? স্বপ্ন কী? জীবনের লক্ষ্য কী? লাবণী বলে, ‘আমার স্বপ্ন ড্যান্সার হব। সাজেদা ফাউন্ডেশন থেকে তাদের গান শেখাত। নাচ
শেখাত।’ সে আরক্তমুখে গান শোনায়, ‘ঝুনঝুন ময়না নাচো না!’

হাসান বড় হয়ে বাস চালাতে চায়।

দেশ এগোচ্ছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হচ্ছি। মুজিব বর্ষে সবার জন্য বাড়ির কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওরা কি জানে, মাথাপিছু আয়ে আমরা ভারতকে ছাড়াচ্ছি? এই সব উন্নয়নের স্পর্শ কি পান্না, লাবণী, হাসান, মরিয়মরা পায়?

কিছু তো পায়, না হলে ওরা স্কুলে যেতে পারে কীভাবে?

কিন্তু খুব বৃষ্টিতে যখন ফুটপাত ভেসে যায়, সে রাতে কই যায় ওরা?

আমি বলি, পান্না বলুন, আপনার জীবনে সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা কী?

তিনি বলেন, আমার জীবনে তো কোনো আনন্দ নাই। পুরাটাই দুঃখ।

‘লাবণী, বলো, তোমার জীবনের আনন্দ কী?’

‘যখন স্কুলে আমাদের গান করায়, নাচ করতে বলে, অনুষ্ঠানে নাচি, তখন আমার আনন্দ!’ লাবণী বলে।

পান্না মরিয়মকে দুধ খাওয়াতে শুরু করেন। এই গনগনে আলোর নিচে লোকসমাগমের মধ্যেই তাঁর সংসার। কোনো সংকোচ নেই, আবার আবরু রক্ষার কায়দা তাঁর রপ্ত।

আমি বলি, ‘সমাজকল্যাণ দপ্তর আপনাদের শেল্টারে নিতে চাইলে যাবেন?’

‘হ। যামু।’

‘ফোন নম্বর দেন।’

ফোন নাই। ঠিকানা নাই, ঘর নাই, চুলা নাই, চাল নাই। আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ!

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

মন্তব্য পড়ুন 0