বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ নির্বাচনে (২০১৮ সালের) পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা, বিরোধী দলের লোকদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলার ব্যাপকতা, ভোটের হারের অস্বাভাবিকতা, এমনকি ভোট আসলে কখন হয়েছে, তা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ছিল, সেসবের কোনো সুরাহা হয়নি। বরং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এখন সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েছে। এই সুযোগে কয়েক বছর ধরে এমন প্রচারণাও চলছে যে আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই দেশে। কয়েক দিন আগেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ‘শেখ হাসিনার বিকল্প কে’—এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন এবং লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, টেমস নদীর ওপার থেকে একজন পলাতক আসামিকে নেতা নির্বাচন করলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই—এটি বলাটা কি কেবলই রাজনৈতিক প্রচারণা বা কৌশল, নাকি প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে নির্বাচন করার যে সাংবিধানিক অধিকার জনগণের রয়েছে, তা রুদ্ধ করে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হয় এটি?

একটা জাতির যৌথ সিদ্ধান্তে ভুল হতে পারে। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষ মিলে সেই ভুল করার অধিকার থেকেও দেশের জনগণকে বিরত রাখতে পারে না। সামরিক অভ্যুত্থান করেও এটা করা যাবে না, বেসামরিক নির্বাচনী কারচুপির মাধ্যমেও এটা করা যাবে না। গণতন্ত্রের সোজাসাপটা মানে এটাই।

আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই—এটি দলের নেতারা শুধু বলেন, তা নয়; আমরা এই বক্তব্য অনুরণিত হতে দেখি আরও বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন ফোরামে, বিভিন্ন মাধ্যমে। এটি বলা হয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে এবং বিভিন্ন শোচনীয় ব্যর্থতার সময়ও। সাফল্যের বড়াই করতে গিয়ে এটি হয়তো বলা যায়। কিন্তু অন্য সময় এটি বলাটা এত সরল অর্থ বহন করে বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার সময় এটি বলে এমন ধারণাও দেওয়ার চেষ্টা করা হয় যে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে একই বা আরও খারাপ অবস্থা হবে দেশে। এই বক্তব্য সত্যি হতে পারে। আওয়ামী লীগের বদলে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার লুট, প্রকল্পে দুর্নীতি, গুম-খুন, এমনকি রাতের নির্বাচনের চেষ্টা অবশ্যই হতে পারে। সমস্যা তাই এসব বক্তব্যে নয়, সমস্যা হচ্ছে এটি কেবলই কতিপয়তন্ত্র বা অভিজাততন্ত্রের মতামতের বিষয় বানিয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিতকে অস্বীকারের চেষ্টা করা।

আওয়ামী লীগের বিকল্প আছে কি না, গণতন্ত্র অনুসারে এটা জনগণ কর্তৃক নির্ধারণের বিষয়, এটি কতিপয় সুবিধাভোগী বা ওপরতলার মানুষের মতামত প্রদানের বিষয় নয়। সংবিধান, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ কথাই বলে। এসব অনুসারে জনগণ মুক্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যাকে খুশি তাকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করার অধিকারী। এটা সারা বিশ্বের মতো এ অঞ্চলেরও নিয়ম।

ভারতে একসময় ‘গুজরাট হত্যাকাণ্ডের’ হোতা হিসেবে পরিচিত নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানে ‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’ হিসেবে পরিচিত আসিফ আলী জারদারি, শ্রীলঙ্কায় তামিলদের ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে তাঁদের দেশের মানুষ ভোট দিয়ে নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে। নেপালে সন্ত্রাসী হিসেবে নিন্দিত মাওবাদীদের এবং মালদ্বীপে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রচারিত মোহাম্মদ নাশিদের দলকে জনগণ ভোট দিয়েছে। প্রচারণা, মামলা, এমনকি কারও কারও বিরুদ্ধে আদালতের শাস্তি পর্যন্ত অগ্রাহ্য করে মানুষ তাদের নির্বাচিত করেছে। এসব প্রচারণা, মামলা ও শাস্তিকে মানুষ রাজনৈতিকভাবে দেখেছে। এটি করা ভুল কি শুদ্ধ, উচিত কি অনুচিত, দেশের জন্য ভালো কি মন্দ, তা নিয়ে সমাজের কিছু মানুষ বহু বাদানুবাদ করতে পারে; কিন্তু তারা কোনোভাবেই জনগণকে তাদের পছন্দ বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বিরত রাখতে পারে না।

আওয়ামী লীগের বিকল্প আছে কি না, সেটি তাই জনগণকে নির্ধারণ করতে দিতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করে বিএনপির ‘অপকর্ম’ ও ‘অযোগ্যতার’ ফিরিস্তি দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা যাবে, তারা ক্ষমতায় এলে দেশকে কী ভয়ংকর অবস্থায় নিয়ে যাবে, এ নিয়ে যা ইচ্ছা তা–ই বলে দেওয়া যাবে। কিন্তু এসব আশঙ্কার কথা বলে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে জনগণকে বাধ্য করা যাবে না। একটা জাতির যৌথ সিদ্ধান্তে ভুল হতে পারে। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষ মিলে সেই ভুল করার অধিকার থেকেও দেশের জনগণকে বিরত রাখতে পারে না। সামরিক অভ্যুত্থান করেও এটা করা যাবে না, বেসামরিক নির্বাচনী কারচুপির মাধ্যমেও এটা করা যাবে না। গণতন্ত্রের সোজাসাপটা মানে এটাই।

আওয়ামী লীগের বিকল্প আছে কি না—এ প্রশ্ন আমরা সবাই করতে পারি। কিন্তু এর উত্তর দেওয়ার অধিকার জনগণের। জনগণ সেই উত্তর দিতে পারে কেবল একটি জেনুইন (প্রকৃত) নির্বাচনে। জনগণকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে ‘বিকল্প আছে, নাকি নেই’—এ ধরনের প্রশ্ন হুমকি বা স্তুতি ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না।

অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজের শাসককে বেছে নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। মূলত এই অধিকারকে সম্মান করা হয়নি দেখেই আমরা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা করেছিলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু এটি ভুলে যাননি।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরপরই বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করার কাজ শুরু হয় গণপরিষদে। সেখানে ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন, ‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনসাধারণের ভোটের অধিকারকে বিশ্বাস করি।’ জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থেকে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘শাসনতন্ত্র দেওয়ার পর দেশে নির্বাচন হবে, তাতে আওয়ামী লীগকে মানুষ ভোট না দেয়, না দেক; যাদের ভোট দেবে, তারাই ক্ষমতায় আসবেন—এতে আপত্তির কিছুই থাকবে না। তাদের সাদরে গ্রহণ করা হবে।’ (গণপরিষদ বিতর্ক, খণ্ড ২, সংখ্যা ১, পৃষ্ঠা ২১)

বাংলাদেশে পরে কী হয়েছে, সেসব নিয়ে বহু বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে যে বঙ্গবন্ধুর এসব উচ্চারণই আমাদের আদি সংবিধানের নির্যাস। এর প্রতিফলন আমরা দেখি সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ৭ অনুচ্ছেদে। সেখানে বলা আছে, দেশের শাসনভার কে পাবেন, তা ঠিক করবে একমাত্র জনগণ।

জনগণকে এটি ঠিক করতে দিলে নির্বাচনকে অবশ্যই অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় তাই আমরা স্পষ্টভাবে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ‘জেনুইন ইলেকশন’-এর তাগিদ দেখি (অনুচ্ছেদ ২১)। এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনেক রেজল্যুশনে বলা হয়েছে, নির্বাচন হতে হবে প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ, অবাধ ভোটাধিকার ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বহু মানবাধিকার দলিলে বলা হয়েছে, মানবাধিকার নিশ্চিত ও রক্ষা করার পরিবেশ সৃষ্টিতে ‘জেনুইন ইলেকশন’ অপরিহার্য শর্ত।

আওয়ামী লীগের বিকল্প আছে কি না—এ প্রশ্ন আমরা সবাই করতে পারি। কিন্তু এর উত্তর দেওয়ার অধিকার জনগণের। জনগণ সেই উত্তর দিতে পারে কেবল একটি জেনুইন (প্রকৃত) নির্বাচনে। জনগণকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে ‘বিকল্প আছে, নাকি নেই’—এ ধরনের প্রশ্ন হুমকি বা স্তুতি ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন