default-image

ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। চলচ্চিত্র, সংগীত ও অন্যান্য চোখধাঁধানো-মনজুড়ানো দৃশ্যকলা ভারতীয় নির্বাচনের একটি অবধারিত অনুষঙ্গ। তাতে গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকারা যোগ দেন। এবারও বিজেপির প্রতিপক্ষরা সংগীত ও চলচ্চিত্রের পরিচিত কিছু মুখের অংশগ্রহণে মিউজিক ভিডিও তৈরি করেছেন। তারই প্রতিক্রিয়াই বিজেপিও একই পথ ধরেছে। মিউজিক ভিডিওতে গানে মুখ মিলিয়েছেন বিজেপির সাংসদ ও গায়ক বাবুল সুপ্রিয়, আসনপ্রত্যাশী প্রার্থী অভিনেতা রুদ্রনীলও।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে এই নির্বাচন নিয়ে ঔৎসুক্য রয়েছে। সে জন্য নির্বাচনী প্রচারণামূলক মিউজিক ভিডিও থেকে শুরু করে অন্যান্য কর্মযজ্ঞের ওপর বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকেরা নজরও রাখছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার মিউজিক ভিডিওটিও অনেকেই দেখে ফেলেছেন। অনেকের জন্য ভিডিওটি বিস্ময়ের। অস্বস্তিকরও বটে। কারণ, তাতে রয়েছে বাংলাদেশের ধর্মীয় উগ্রবাদী চরিত্রের উপস্থাপনা। মিউজিক ভিডিওটির বাংলাদেশ-সম্পর্কিত বিষয়গুলো উল্লেখের শুরুতেই আছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু কিশোরী পূর্ণিমাকে ধর্ষণের ঘটনা। বিষয়টি বারবার আনা হয়েছে। রয়েছে বাংলাদেশের টিভি থেকে নেওয়া ইসলামপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ছবি। ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো সময়ের ফাইল ফটো।

বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক চেহারা দেখাতে ভিডিওতে যুক্ত করা হয়েছে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার দৃশ্য, যার সঙ্গে বর্তমান সময়ের সাযুজ্য নেই বললেই চলে। আছে আরব সন্ত্রাসবাদের দৃশ্য, আইসিসের পতাকা প্রদর্শন এবং বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের দ্বারা পুলিশের আক্রান্ত হওয়ার দৃশ্য। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবরের কাগজের কাটিং দেখানো হয়েছে বারবার।

বিবিসির ওয়েবপেজ লিখেছে, ‘বিজেপি বলছে, তারা সাতচল্লিশের দেশভাগ থেকে শুরু করে ইসলামি জঙ্গিদের কার্যকলাপ মনে করিয়ে দিতে চেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের। এর জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি ঘটনার প্রসঙ্গ আনা হয়েছে।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, ভিডিওটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর দুরভিসন্ধি, উসকানি এবং নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। দলটি নির্বাচন কমিশনে লিখিত প্রতিবাদও জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনটি পশ্চিমবঙ্গের। সংগত কারণেই রাজ্যটির অধিবাসীদের চাওয়া-পাওয়া, না পাওয়া ইত্যাদিই ভিডিওটির বিষয় হওয়ার কথা। পরিসংখ্যান থাকার কথা। সেসব পরিসংখ্যানে তৃণমূলের আগের নির্বাচনের ওয়াদা এবং ওয়াদা ভঙ্গের বিষয়ও থাকার কথা। ভবিষ্যতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী কী অগ্রগতি হবে, কোন কোন পিছিয়ে পড়া বিষয়কে সামনে এগিয়ে আনা হবে, সেসব প্রতিশ্রুতি থাকার কথা। কিন্তু সেসব প্রয়োজন ছাপিয়ে ভাইরাল ভিডিওটি অনাবশ্যক বাংলাদেশ-বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় উসকানিতে ভরপুর হয়ে বসেছে কি না, সে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

ভিডিওটির শুরুই এ রকম, এত দিন বাঙালি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাস ভুলভাল শিখে এসেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এসব আর গেলাতে পারবে না, সিলেবাসে ভুলভাল থাকবে না। ঠিক কীভাবে ভুল ইতিহাস তৈরি হয়েছে, কীভাবে শুদ্ধ করা হবে, সে ধারণা অবশ্য গানটিতে দেওয়া নেই। ভিডিওটিতে দাবি করা হয়েছে, ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে দলিত কন্যা পূর্ণিমা ধর্ষণের কথা। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের সরাসরি উল্লেখ আছে গানে। পূর্ণিমার মায়ের আর্তি, ‘আমার কন্যাটি ছোট, একজন একজন করে আসুন’ গানেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে। ভয়াবহ অপরাধটি ঘটেছিল ২০০১ সালের বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের পর। জয়ী দল বিএনপির স্থানীয় কর্মীরা ঘৃণ্য এ ধর্ষণকাণ্ড ঘটিয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায় সারা বাংলাদেশে আপামর জনতার ঘৃণাও কুড়িয়েছিল। বাংলাদেশ অপরাধটির বিচার করেছে। অপরাধীরা আইনের অধীনে প্রাপ্য সর্বোচ্চ সাজাও পেয়েছে।

এখনো বাংলাদেশের আমজনতা রাজনৈতিক কারণে নারীর যৌন নির্যাতনকে যৌন অপরাধের মধ্যে বীভৎসতম বিবেচনা করে। ভারতেও তাই। কারণ, এ সমস্যা যতটা ধর্মীয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষমতা-সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলগুলোর কর্মীদের যৌন-অপরাধের যেমন অসংখ্য ঘটনা আছে, ভারতেও আছে। পূর্ণিমা-প্রসঙ্গ টেনে বিজেপি কর্মীরা কি দলটিকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের রোল মডেল দাবি করছে? কিন্তু তথ্য-প্রমাণের কোনোই অভাব নেই যে নারীদের যৌন নির্যাতনে বিজেপির বদনাম সব দলের চেয়ে অনেক বেশি। যৌনাপরাধ বিচারে বিজেপির রেকর্ড সবচেয়ে খারাপ। ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বরের ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, বিজেপির ১১৬ জন এমপি-এমএলএ নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত।
২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল ইন্ডিয়া টুডে একটি গবেষণা প্রতিবেদনের সারমর্ম নিয়ে শিরোনাম করেছিল, ‘বিজেপির নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ ভারতে সর্বোচ্চ’।

বিজ্ঞাপন

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস নামের গবেষণা সংস্থাটির গবেষণালব্ধ তথ্য ইন্টারনেটেই আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি হিন্দুস্থান টাইমস-এ খবর বেরিয়েছে, ১৯ বছরের এক মুসলিম তরুণীকে গণধর্ষণকারী চারজনের একজন বিজেপির বড় নেতা। বাধা দিতে গিয়ে তরুণীটির বাবা নৃশংস আক্রমণের শিকার হন এবং পরে মারা যান। গত বছরের শেষ দিকে উত্তরাখন্ডের বিজেপি এমএলএর নারী ধর্ষণের ঘটনায় নারী অধিকারকর্মীদের আন্দোলনে প্রদেশটি উত্তাল হয়ে উঠেছিল।

২০১৭ সালের ৪ জুন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা কুলদীপ সিং সেঙ্গার উত্তর প্রদেশের উন্নাওতে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। ঘটনাপঞ্জি সিনেমার গল্পকেও হার মানানোর মতো। ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করে কিশোরীটির বাবাকে কারাবন্দী রেখে হত্যা করা হয়। ২০১৯ সালে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর সেঙ্গারের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। এ রকম আরও অসংখ্য উদাহরণ টানা যাবে। মোদ্দাকথা, ক্ষমতাসীনদের যৌনাপরাধ ক্ষমতার বাড়াবাড়ি রকমের অপপ্রয়োগের ফল। পূর্ণিমা হিন্দুধর্মের—এই ধর্মীয় কার্ডই খেলছে বিজেপি। তাতে পশ্চিমবঙ্গে দু-চারজন বিজেপি এমএলএর লাভ হলেও হতে পারে। কিন্তু ক্ষতি হবে ভারত ও বাংলাদেশের দেড় শ কোটি মানুষের। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহারের বিজেপির মিউজিক ভিডিও-কৌশলটিতে আতঙ্কিত ও আশঙ্কিত না হওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। বাংলাদেশের সমস্যার কমতি নেই। বাংলাদেশ সেসব সমস্যা সমাধান না করে বসেও নেই। বাংলাদেশের সেসব সমস্যার সমাধানে ভারতের নির্বাচনের কী দায় বা দায়িত্ব? পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশের ঘটনার উল্লেখ যে শুধুই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে ফায়দা লোটার চেষ্টা, তাতে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নেই। আরও কথা থাকে; বাংলাদেশের দলিত ও সংখ্যালঘুদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ কি সক্ষম নয়? ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার ছবি ব্যবহার কি প্রতারণা নয়? আরব ও আইসিস না পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা, না বাংলাদেশের সমস্যা। সেগুলোর ব্যবহার কেন? পেপার কাটিংয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানো সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিজেপির এমএলএরা জিতে এসে কী করবেন না করবেন, সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কোথায়?

যতজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, সবাই মনে করছেন, বিজেপির মিউজিক ভিডিওটি ধর্মের জঘন্য রাজনৈতিক ব্যবহার এবং প্রতিবেশী দেশের প্রতি কূটনৈতিক অশিষ্টতার একটি দলিল হয়ে রইল।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। সদস্য, সিপিএস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন