চমকে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা দেশকে তো বটেই, এত দিন যাদের অপরাজেয় বলে মনে করা হচ্ছিল, সেই প্রবল ক্ষমতাধর শাসক বিজেপিকেও তিনি চমকে দিলেন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফল নিজের অনুকূলে এনে দুটি বিষয় তিনি স্পষ্ট করে দিলেন। প্রথমত, বিজেপি অজেয় নয়। দ্বিতীয়ত, বিজেপিবিরোধী যেকোনো জোটবদ্ধতায় তিনিই হবেন আগামী দিনের প্রধান অনুঘটক।

ভোট হলো মোট পাঁচ রাজ্যে। কিন্তু সবার নজরে ছিল প্রধানত পশ্চিমবঙ্গ। এই রাজ্য বাদ দিলে আর যে রাজ্যটি নিয়ে কিছুটা আগ্রহ দানা বেঁধেছিল, তা আসাম। কংগ্রেসের যাবতীয় প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে বিজেপি সেখানে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় থাকার পথ প্রশস্ত করেছে।

কেরালা ও তামিলনাড়ুতে বিজেপির বাজি ধরার মতো কিছু ছিল না। পদুচেরিতে বকলমে ক্ষমতায় আসবে জানা ছিল। অজানা ও অনিশ্চয়তার তীব্র দোলাচল এই এত দিন ধরে পেন্ডুলামের মতো এপাশ-ওপাশ দুলেছে স্রেফ পশ্চিমবঙ্গে। এক দিকে একা এক নারী, অন্যদিকে যাবতীয় রাষ্ট্রশক্তিতে বলীয়ান শাসক দল। দিনের শেষে দেখা গেল, বাংলা তার নিজের মেয়েকেই কোল পেতে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিজেপি চেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোটকে ধর্মীয় মেরুকরণে মুড়ে দিতে। শুরু থেকেই তারা সেই লক্ষ্য হাসিলে সচেষ্ট থেকেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এই সীমান্তবর্তী রাজ্যের ভোট কখনো এইভাবে ধর্মীয় আধারে করার চেষ্টা হয়নি। সে দিক থেকে দেখতে গেলে রাজ্য নির্বাচনে এইভাবে ‘আইডেনটিটি পলিটিকস’ আমদানির মধ্য দিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অত্যন্ত সচেতনভাবে বঙ্গীয় সমাজ ও রাজনীতিতে এক নতুন আঙিনা খুলে দিতে চেয়েছিল।

সেই আঙিনা, গোবলয়ের রাজনীতিতে তাদের চেনা ছক, যে ছক তাদের বারবার লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। সুখের কথা, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির শিক্ষা, রুচি, মনন ও বীক্ষা বিজেপির সেই ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ সত্ত্বেও শেষ বিচারে বঙ্গ সমাজ বিজেপির আইডেনটিটি পলিটিকস তত্ত্বকে আমল দেয়নি। বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিয়ে বিজেপির ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান’মার্কা ভারতীয়ত্বকে আপন করে নিতে চায়নি। বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য ও বিবিধকে আঁকড়ে ধরে একদর্শী মতবাদকে তফাতে ঠেলেছে। দিনের শেষে এই রাজনৈতিক সংঘাত তাই রূপ নিয়েছে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে। সেই লড়াইয়ে অবশ্যই হোঁচট খেল বিজেপি।

বিজেপি থমকাবে কিন্তু হাল ছেড়ে দেবে মনে করাটা হবে মারাত্মক ভুল। এই ভোট বিজেপিকে জেতাতে পারেনি। কিন্তু হারায়ওনি। বিধানসভায় ৩ থেকে ৮৩-তে উত্তরণ এই রাজ্যের শাসকদের বিরুদ্ধে তাদেরই একমাত্র প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে। এই দ্বিমেরু রাজনৈতিক বিন্যাস রাজ্যের রাজনৈতিক প্রবাহে তৃতীয় কোনো পক্ষের জন্য কোনো সুযোগ আর রাখল না।

সে দিক থেকে দেখলে স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি যেমন কংগ্রেস-কমিউনিস্টে বিভাজিত ছিল, তেমনই এবার থেকে তা হতে চলছে অতি দক্ষিণপন্থী বনাম মধ্যপন্থী রাজনীতির টক্কর। কংগ্রেস বা বামপন্থীরা রাজ্য রাজনীতিতে এই প্রথম এতখানি অকিঞ্চিৎকর হয়ে গেল।

এই কারণে ভোটে হারলেও বিজেপির রাজনীতি ও রণনীতি পরাস্ত হবে না। বরং আগামী দিনে এই সংঘাত নানাভাবে সমাজ জীবন ও রাজনীতিকে আলোড়িত করতে থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গে ব্যর্থ হলেও সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপি তার পতাকা কিন্তু তুলে রাখতে পেরেছে। আসাম এবার তাদের কাছে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কংগ্রেস যাবতীয় জড়তা ভুলে ওই রাজ্যে একটা বিরোধী জোট গড়ে তুলতে পেরেছিল। কিন্তু আসামের আইডেনটিটি পলিটিকস সেই জোটবদ্ধতাকে প্লাবিত করেছে। বিজেপির কাছে তা যতটা কৃতিত্বের, তার চেয়েও বেশি গ্লানির কংগ্রেসের কাছে। আসামের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা দূর করতেই যে শতাব্দীপ্রাচীন কংগ্রেস ব্যর্থ তা নয়, দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী কেরালা দখলেও এবার তারা ব্যর্থ। দলত্যাগের কারণে পদুচেরিতেও কংগ্রেস তার আধিপত্য হারাল। ডিএমকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তামিলনাড়ুর ক্ষমতা দখল তাদের কাছে সান্ত্বনা পুরস্কারতুল্য।

বিজ্ঞাপন

এবারের ভোট শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল নরেন্দ্র মোদি বনাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বৈরথ। হবে না-ই বা কেন? কোনো এক রাজ্য দখলে দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী অতীতে এভাবে দিনরাত এক করে দেননি। কুড়িবার রাজ্য সফরে এসেছেন মোদি। তিনি, অমিত শাহ ও অন্য শীর্ষ নেতারা শতাধিক জনসভা ও রোড শো করেছেন। এত টাকার ঝনঝনানি পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের ভোটে কেউ কোনো দিন দেখেনি। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এমন ব্যবহার ও অপব্যবহারও ছিল অদৃষ্টপূর্ব। হারার দায়ও তাই পুরোপুরি মোদি-শাহকেই নিতে হবে। আর কারও ওপর তাঁরা এই দায় বা দায়িত্ব চাপাতে পারবেন না। স্বস্তির বিষয় এই যে মোদি-শাহকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো জাতীয় স্তরে কোনো চরিত্র এখনো নেই। তা ছাড়া, লোকসভার ভোটের এখনো ঢের দেরি। তবু প্রশ্ন উঠবেই।

দুশ্চিন্তার খাঁড়া প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ের ওপর ঝুলেই থাকছে। বরং খানিকটা নেমেও এসেছে। কথায় বলে, দুঃসময় সবদিক থেকে আসে। পশ্চিমবঙ্গের হার সেই সময় ঘটে গেল, কোভিড পরিস্থিতি যখন মোদির মাথা খারাপ করে দিয়েছে। মাত্র কয় মাস আগে যিনি কোভিড যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলেন, নিজেকে বিশ্বনেতায় উত্তীর্ণ করেছিলেন, সেই মোদি আজ নিজেকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রবলভাবে সমালোচনার পাত্র করে তুলেছেন। বিদেশি প্রচারমাধ্যমে আজ তিনিই একমাত্র ‘ভিলেন অব দ্য পিস’।

যে অস্ট্রেলিয়ার হাত ধরে ‘কোয়াড’-এর সার্থক রূপায়ণে মোদি সচেষ্ট, সেই অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তাঁকে ‘কুৎসার’ অভিযোগ আনতে হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে বলতে হচ্ছে চক্রান্ত বন্ধ করুন। ফ্রান্সের ‘ল্য মঁদ’ সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে কোভিড পরিস্থিতির ভয়াল কারণের পেছনে একমাত্র দায়ী করা হয়েছে মোদির ‘ঔদ্ধত্য, অপরিণামদর্শিতা এবং জনপ্রিয়তা আদায়ের প্রচেষ্টার’। তাঁর এযাবৎ লালিত ভাবমূর্তি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলের মতোই মুখ থুবড়ে পড়েছে। দুটোই ছিল তাঁর ভাবনার বাইরে।

শুধু দেশ ও আন্তর্জাতিক দুনিয়া নয়, নিকট প্রতিবেশীদের কাছেও নরেন্দ্র মোদির এই সময় বিশেষ সুখকর নয়। নানান টানাপোড়েন সত্ত্বেও বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে ধারাবাহিকতা বহমান, আচমকাই তাতে সৃষ্টি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা।

পশ্চিমবঙ্গের ভোট চলাকালে তা তীব্রতর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের অনুপ্রবেশসংক্রান্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর আলটপকা মন্তব্য আর যা-ই হোক পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার সহায়ক হতে পারে না। পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত সম্পর্কের কাঁটা হয়ে অনেক দিন খচখচ করেছে। এবার চুক্তি সত্ত্বেও টিকা রপ্তানি নিয়ে জটিলতা সেই সম্পর্ককে অন্যভাবে আড়ষ্ট করে তুলেছে। কীভাবে কত দ্রুত এর মোকাবিলা করা সম্ভব, তার ওপরই নির্ভর করে রয়েছে আগামী দিনের সুপ্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের বিষয়টি।

বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের এই ভোট ঘিরে অন্য এক ধারণার জন্ম দিতে চেয়েছিল। নিভৃত আলাপচারিতায় নেতারা বলাবলি করতেন, রাজ্যে ক্ষমতায় এলে তিস্তা চুক্তি রূপায়ণে দেরি হবে না। এখন স্পষ্ট, অদূর ভবিষ্যতে বিজেপির সেই গুড়েও বালি। সীমান্তবর্তী দুই রাজ্য আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ও সিএএ নিয়ে দুই ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছিল বিজেপি।

এই দুই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমাজ ও রাজনীতিতেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। আহত বিজেপি নেতৃত্ব সেই দুই নীতি কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, আপাতত তা দ্রষ্টব্য হয়ে রইল।

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধি।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন