বিদেশমুখী শিক্ষক ও ফিরে না আসার 'দেশপ্রেম'

বিজ্ঞাপন

ফেসবুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমরা অনেকেই নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপদ্ধতিকে দোষারোপ করি এই বলে যে বিশ্ব তালিকায় আমাদের নাম নেই কেন? দু-একটি থাকলেও এতটা পেছনে কেন? কিংবা নিজেদের স্ট্যাটাসে অনেক বড় বড় করে লিখি, ‘মেধাবীরা এ দেশে থাকবে কেন? আমাদের দেশে মেধার কোনো দাম নেই, কেন দেশে ফিরব? গবেষণার সুযোগ নেই, পরিবেশ নেই!’ ইত্যাদি হাজার রকম অভিযোগ। এমনকি শিক্ষা ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের দেশে ফিরে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করার জন্য পত্রমারফতে আদেশ কিংবা অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাঁরা আবার ছুটি বাড়ানোর আবেদন চালিয়েই যাচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এখনো আমাদের দেশে একজন মেধাবীর পছন্দের প্রথম সারিতেই আছে বলে ধরা যায়। এর ব্যতিক্রমও দেখা যায় বৈকি! কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত যেকোনো ছাত্রছাত্রী মেধাতালিকায় স্থান পাওয়ার সুবাদে প্রথমেই ইচ্ছা পোষণ করেন নিজ বিভাগে শিক্ষকতা করার জন্য। পরিবারও খুশি, কারণ পেশাগত দিক থেকে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা করার সুযোগ, বেতনকাঠামো, আর সেই সঙ্গে সামাজিক সম্মান তো আছেই। এ ছাড়া আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা ইচ্ছা করলেই বিভিন্নভাবে আনুষঙ্গিক অন্যান্য কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে এর যে ব্যতিক্রম কিছু হয় না, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে সরকারি কিংবা বেসরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান, যদিও সেটি সাধারণত নিজ চেষ্টাই হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে সময়সীমা থাকে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত। আর যে-কেউ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরুর প্রায় দুই বছর পরেই চাকরিতে বহাল থেকে মূল বেতন স্কেল সহকারে শিক্ষা ছুটি ভোগ করতে পারেন। এমনকি নির্ধারিত ছুটি শেষ হয়ে গেলেও ডিগ্রি অর্জনের জন্য ছুটি বর্ধিত করার আবেদন করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সামগ্রিক উন্নতির জন্য তাঁদের বর্ধিত ছুটির আবেদনকে মঞ্জুর করে থাকে। তবে সে ক্ষেত্রে শিক্ষককে ছুটিতে যাওয়ার সময়ে নিয়ম অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কিছু চুক্তিপত্র সম্পাদন করতে হয়। কারণ, শিক্ষা ছুটির সময় বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বর্তমান পদটি ধরে রাখবে এবং উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি সরাসরি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার সেই পদে যোগদান করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের আগের সম্পাদিত চুক্তির শর্ত শিথিল হয়ে যাবে। আর কেউ যদি উচ্চশিক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান না করেন, তবে তাঁকে নিয়ম অনুযায়ী চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরিত শর্ত পূরণ করতে হয়। অন্যথায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য। তবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এসব নিয়মকানুনের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে বৈকি!

বর্তমানে প্রায়ই দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সংবাদমাধ্যমে আইনি নোটিশ। কারণ, অনেকেই বিদেশে শিক্ষাছুটি থেকে ফিরছেন না আবার চাকরিও ছাড়ছেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা মানছেন না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দেওয়া চুক্তিপত্রের নিয়মনীতি। অথচ বিদেশের মাটিতে বসে পরম আয়েশে একের পর এক প্রদর্শন করে চলেছেন দেশের প্রতি তাঁদের ‘উদার-অকৃত্রিম ভালোবাসা ও মমত্ববোধ’।

আমাদের দেশে ঘুণে ধরা শিক্ষার চলনবলন। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সুবিধার জন্য তাঁরা একদিকে বঞ্চিত করছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর সামগ্রিক অর্থে দেশকে। কারণ, আজ যাঁরা দেশের বাইরে যাচ্ছেন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ থেকে ছুটি নিয়ে, বছরের পর বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধরে রাখছে তাঁদের সংরক্ষিত পদটি। যখন শিক্ষা ছুটি শেষে তাঁরা দেশে ফিরছেন না কিংবা দীর্ঘায়িত করছেন ফেরার সময়, আবার নিয়মানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়কে তাঁর প্রাপ্যতা বুঝিয়েও দিচ্ছে না, তখন শিক্ষক হিসেবে এ দায়ভার কে নেবে? এমতাবস্থায় আমরা কি আশা করতে পারি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থান বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে অনেক ওপরের দিকে আসবে? শিক্ষার মান কি উন্নত হবে নতুন নতুন গবেষণায় আর উদ্ভাবনী শক্তিতে? উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থার জন্য আমরা কি কোনো অংশেই দায়ী না? নাকি সব দোষ ‘নন্দ ঘোষ’ বলেই উদ্ধার! এগুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে শক্তভাবে।

তা ছাড়া উন্নত দেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে প্রভাষক থেকে শুরু করে অধ্যাপক পর্যন্ত প্রায় সব শিক্ষককেই বছর শেষে কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের গবেষণা, অর্থায়ন এবং বিশ্বব্যাপী শিক্ষা সুযোগ-সমন্বয়ের অনেক তথ্য-উপাত্ত প্রমাণস্বরূপ দেখাতে হয়। আর কেউ এগুলো সঠিক ভাবে দেখাতে না পারলে হয় তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয় নতুবা তাঁর পদের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই সবাইকেই থাকতে হয় শিক্ষাক্ষেত্রে সচল। অথচ আমাদের দেশে যেহেতু এর কোনো জবাবদিহি নেই, তাই চলছি যে যার মতো করে। কারণ, উন্নতির মানদণ্ড শিক্ষা আর গবেষণা না হয়ে যদি হয় ‘অন্য কিছু’, তাহলে কি দরকার গবেষণায় বুঁদ হয়ে বসে থাকা কিংবা গবেষণার অর্থায়নের ব্যবস্থা করা? দিন তো চলেই যাচ্ছে একভাবে—পদের উন্নতি তো হবেই! একবার ভাবুন তো, দেশে একটি চাকরির পদ ধরে রেখে আজ যারা দেশে কিছু করার নেই বলে বাইরে বুলি আওড়ে বেড়াচ্ছেন, যদি তাঁরা দেশে ফিরে আসতেন ঠিক সময় পরেই, শূন্য থেকেই শুরু করতেন, নতুন কিছু শিক্ষায় শিক্ষিত করতেন আগামী প্রজন্মকে, নেই নেই করেও হয়তো কাজ কিছুটা হতো। পরবর্তী প্রজন্ম সেটাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেত অবশ্যই। আর এভাবেই তো তিল থেকে তাল হয়। সবকিছুতে এগিয়ে গেলেও সম্ভাবনামূলক উচ্চশিক্ষায় যে আমরা আসলেই বড্ড পিছিয়ে পড়ছি দিন দিন! মনে রাখতে হবে, সম্ভাবনা আমাদেরই তৈরি করতে হবে।

সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
sajal_c@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন