default-image

বাংলাদেশের বিবদমান রাজনীতিকেরা নিজ নিজ স্বার্থের পক্ষে বিদেশিদের সহানুভূতি ও সমর্থনের আশায় উন্মুখ হয়ে কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হতে পারেন, তার নতুন নতুন নজির সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অতীতেও বিদেশিদের আশীর্বাদের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকার অভিযোগ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের উদ্দেশ্যে বিদেশিদের মতামত ও মূল্যায়নের খণ্ডিত বিবরণ প্রচারের প্রবণতা এতটাই প্রকট হয়েছে যে অতিথিরা এখন ক্ষুব্ধ এবং বিব্রতবোধ করছেন।
ইউরোপীয় অতিথিদের একটি দল এ জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে তাদের হতাশার কথা প্রকাশ করে দিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া এতটা কূটনৈতিক বিড়ম্বনার জন্ম দিয়েছিল যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে একটি সম্মত সংশোধনী জারি করতে হয়েছিল। এ ধরনের সংশোধনী জারির আর কোনো নজির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আছে বলে মনে হয় না। গত ২২ জুলাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের বিবরণী নিয়েও এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আলাদা এক বিবৃতিতে তাদের বক্তব্য প্রকাশ করেছিল।
২৩ জুলাই, ২০১৪-তে প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী লন্ডন থেকে টেলিফোনে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ব্রিটেন বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চায়। তিনি বলেছেন যে নির্বাচন শেষ হয়েছে, এটা অতীত। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই। আগামী দিনে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই। কিন্তু, পরদিন ২৪ জুলাই ডাউনিং স্ট্রিটের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে মি. ক্যামেরন ২০১৪-এর জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়ে তাঁর হতাশার কথা জানিয়েছেন, যাতে অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না। তিনি মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথাও বলেছিলেন বলে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল।
সেবার অবশ্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের তরফে কোনো সংশোধনী জারি করতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার (এনগেজ) আহ্বান এবং রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সব ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আমাদের সরকারি ভাষ্যে দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা কোনো সংলাপের আহ্বান জানাননি। ইংরেজি শব্দ এনগেজ কথাটিকে সরকার কি তাহলে সামরিক পরিভাষার অর্থে গ্রহণ করেছে? সামরিক বাহিনীতে এনগেজ কথাটির মানে ধরা হয় শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া। ক্রসফায়ার বৃদ্ধির প্রবণতায় সে রকমটি ইঙ্গিতই তো মেলে!
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত এক প্রস্তাবে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার পাশাপাশি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সমঝোতা, র্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, মানবাধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর প্রতিকারসহ অনেকগুলো বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান ছিল। কিন্তু সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ওই প্রস্তাবের শুধু একটি অংশ বিএনপি কেন শুনছে না তা নিয়ে অনুযোগ জানিয়ে আসছেন। তাঁরা ওই কাজটি করতে বাধ্য করার জন্য বিএনপির ওপর যাতে বিদেশিরা আরও চাপ দেয় সে জন্যও নানা মহলে অনুরোধ-উপরোধ অব্যাহত রেখেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর ‘সাম্প্রতিক খাদের প্রান্তে বাংলাদেশ’ শিরোনামের সম্পাদকীয়টিও এ রকম আরেকটি দৃষ্টান্ত। ওই সম্পাদকীয়তে সরকারের দমন–পীড়ন বন্ধ ও বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে আহ্বান রয়েছে, সেটুকু সরকার ঠিকই উপেক্ষা করছে। অথচ কোনো কোনো মন্ত্রী বলছেন যে বিএনপির উচিত পত্রিকাটির সুপারিশ অনুযায়ী জামায়াতের সঙ্গ ছাড়া।
বিদেশিদের সহানুভূতি আদায়ে বিএনপি-জামায়াতও যে কতটা বেপরোয়া তার নজির যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন কংগ্রেস সদস্যের বিবৃতি জাল করা এবং ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহর টেলিফোন বিতর্কের ঘটনা। একইভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে দুনিয়ার নানা প্রান্তে জামায়াতের লবিংয়ের কথাও এখন সবার জানা। ২০০৬-০৭ কিংবা ১৯৯৫-৯৬-এর রাজনৈতিক সংকটেও এসব দলকে বিদেশিদের সহানুভূতি পেতে হয়রান হতে দেখার কথা আমাদের কারোরই স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। তবে একটা পার্থক্য লক্ষণীয়। আর সেটা হলো, বিদেশিদের মতামতকে বিকৃত বা খণ্ডিতভাবে প্রচারের কুপ্রবণতায় আমরা এখন বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
প্রধানমন্ত্রীকে লেখা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের চিঠির জবাব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তবে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের চেষ্টায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপের আহ্বানে সরকার ইতিবাচক সাড়া দেবে কি না, সে রকম কোনো তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানাননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ক্ষণস্থায়ী তাঁর এক পূর্বসূরি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ অবশ্য বলেছেন যে বান কি মুনের উচিত হবে খালেদা জিয়াকে হত্যা-খুনের রাজনীতি বন্ধ করার অনুরোধ জানানো।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে বান কি মুনকে যে জবাব দেওয়া হবে, তাতে দেশের চলমান সহিংসতা এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকারের ভূমিকা তুলে ধরা হবে। দেড় মাস ধরে বিএনপি-জামায়াত দেশজুড়ে সরকারের ভাষায় যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা ওই চিঠিতে গুরুত্ব পাবে। প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বানের চিঠি সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় বুধবার বলেছেন যে সরকার বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবে না। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীদের রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতিতে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা প্রত্যাখ্যানের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আরও বলেছেন, সংলাপের জন্য বিদেশিদের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর কোনো চাপ নেই। তাঁর কথা এই অর্থে ঠিক যে সংলাপের পথে না হাঁটলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকুচিত হওয়ার কোনো হুমকি এখনো আসেনি। যে জাল হুমকি এক-এগারোর পটপরিবর্তনে কাজ করেছিল।
প্রতিমন্ত্রী ও অন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতিতে মনে হয় যে বানের চিঠিতে সংলাপের আহ্বান এবং ঢাকায় নিয়োজিত বিদেশি কূটনীতিকদের সমঝোতার কথাগুলো উপেক্ষা করাই শ্রেয়। আমাদের বিষয়ে বিদেশিরা নাক গলাক, সেটা আমরা কেউই চাই না। কিন্তু বিবদমান রাজনীতিকদের অনমনীয়তার পরিণতিতে সাধারণ মানুষ যে সীমাহীন দুর্ভোগের সম্মুখীন, সে কথা তো অস্বীকার করা চলে না। ব্যবসায়ীদের প্রধান সংগঠন এফবিসিসিআইও সম্প্রতি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের অসহায়ত্বের কথা বিদেশিদের কাছে তুলে ধরেছে। সেখানেও প্রভাবশালী দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) উদ্বিগ্ন দূতেরা সহিংসতা বন্ধ এবং সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের প্রচার উপকমিটি ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় জাদুঘরে পেট্রলবোমায় হতাহতদের করুণ পরিণতি এবং তাঁদের পরিবারগুলোর অব্যাহত ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরার এক সুসংগঠিত অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যাতে বিদেশি কূটনীতিকেরাও আমন্ত্রিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কান্নার ছবি আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। পুরো অনুষ্ঠানেই ছিল বিএনপির আহূত অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচিকে ঘিরে ঘটতে থাকা সহিংসতার মর্মস্পর্শী বিবরণ এবং এই সন্ত্রাসকে জঙ্গিবাদ হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস। এখানেও উদ্দেশ্যটা রাজনৈতিক এবং লক্ষ্য বহির্বিশ্ব। বিএনপিকে জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা সফল হলে চলমান বিরোধের উৎস যে বিতর্কিত নির্বাচন, সেই প্রহসনের কলঙ্ক ঢেকে রাখা যাবে। ইউরোপ-আমেরিকায় আওয়ামী লীগের যেসব শাখা-প্রশাখা রয়েছে, তারাও নানা ধরনের আয়োজনে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে যে তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের জোট রাষ্ট্রের শত্রু, দেশের অনিষ্টকারী। পেট্রলবোমায় দগ্ধদের ওপর তথ্যচিত্র তৈরি করে এবং পুস্তিকা প্রকাশ করে সেগুলোও বিশ্বব্যাপী বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনুসারীরাও তাঁদের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের বিবরণী নিয়ে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।
ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাজনীতিকদের সাহায্য-সহানুভূতি লাভের এই বিদেশমুখী রাজনীতি যে কতটা বিব্রতকর হতে পারে, তার একটা দৃষ্টান্ত হচ্ছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের বিগত দুটো বাংলাদেশবিষয়ক সেমিনার। দুবারই ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি গ্রুপ অন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন অ্যান মেইন এবং অন্য কয়েকজন বাংলাদেশি রাজনীতিকদের বলেছেন যে আপনারা সবাই চান আমরা যেন আপনাদের যার যার পক্ষ সমর্থনে এগিয়ে যাই। আমরা আপনাদের রাজনীতিতে জড়াতে চাই না, আমরা শুধু সুশাসন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে সহায়তা করতে চাই। তবে সর্বসাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, ব্রিটিশ রাজনীতিকদের মধ্যেও আমরা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে সংক্রমিত করতে পেরেছি। একই লেবার পার্টির একাধিক এমপি যেমন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থকদের সমাবেশে হাজির হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, তেমনই তাঁদের অন্য কয়েকজন সহকর্মী বিএনপিপন্থীদের সমাবেশে হাজির হয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
বিশ্বায়নের কালে আমরাই ছুটছি বিদেশিদের কাছে, আবার আমরাই তাদের পরামর্শে বিরূপ হচ্ছি। এ ধরনের দ্বিচারিতায় রাজনীতিকদের কেউ কোনো আত্মপীড়ায় ভোগেন বলে মনে হয় না।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন