বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গরিবের পেট প্রতিদিন কতটুকু খালি থাকে, যতটুকু যা-ও বা ভরার সামর্থ্য রাখেন, তাতে কতটা কী পুষ্টিমান আছে, তার হিসাব করার জন্য একটা-দুইটা নয়, বহু সংস্থা আছে বিশ্বব্যাপী। তাদের একটা জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি)। ‘গরিবির মাত্রা পরিমাপক’ এই সংস্থার পরিচালক ডেভিড বিসলি দিন কয়েক আগে এই হিসাব দিয়েছেন। তাই অবিশ্বাস করার কারণ নেই, আবার বিশ্বাস করবেনই-বা কোন পরানে?
এমন তো নয়, গরিবেরা একটু-আধটু অঙ্ক পারেন না; বরং এক অর্থে তাঁদের জীবনটাই তো অঙ্কনির্ভর। পান্তায় নুনের জোগানের হিসাব কষতে কষতে জীবন পার করেন, তবু তিনবেলা পাতে দুমুঠো করে খাবারের সংস্থান করতে পারেন না। এর পরও দুই-চার কুড়ির হিসাব দিব্যি মুখে মুখে কষে ফেলতে পারেন; কিন্তু কোটি মানুষের খাবার একজন জোটাতে পারেন, এ আবার কেমনতর ‘হিসাব’?

ভিরমি খাওয়ার মতো কথারও তো একটা ধরন আছে; এ কথা যেন সমুদ্রের বুকে এক টুকরা ঢিল ছোড়ার মতো—অপুষ্টিতে ভোগা গরিবদের অপুষ্ট মস্তিষ্কে কিছুমাত্র আলোড়ন তুলতে তা অক্ষম! এই অত্যাশ্চর্য কথার আগে আরেকটু কম তাজ্জব বনে যাওয়ার মতো হিসাবে নজর দিয়ে দেখা যেতে পারে। তাবৎ দুনিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক ধনী বানানোর বন্দোবস্ত কিন্তু এই বঙ্গদেশেই আছে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। ওয়েলথ এক্সের ‘আ ডিকেড অব ওয়েলথ’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, এর চেয়ে বেশি হারে প্রথম বিশ্বের কোনো দেশও ধনী ‘উৎপাদন’ করতে পারেনি। ধনী মানে যে-সে ধনী নয়; ৫০ লাখ ডলার বা অন্তত ৪০ কোটি টাকা পকেটে যাঁদের, তাঁদের কথা বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ‘সাধারণ’ ধনী বৃদ্ধির হারেও বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। অথচ বিশ্বের যে ৫৫টি দেশে খাদ্যসংকটে পড়া মানুষের বাস, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশেরও নাম। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির দেওয়া এই অঙ্ক চলতি অর্থবছরের বাজেটের প্রায় কাছাকাছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, দেশের ৩৮ শতাংশ সম্পদের মালিকানা মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১ শতাংশ সম্পদের মালিক।

তেলেসমাতি! দুনিয়াজুড়ে চলছে তেলেসমাতি! পুঁজিবাদ নামের যে ব্যবস্থার করায়ত্ত বিশ্ব, তার কারিকুরির শেষ নেই। দুনিয়ার তাবৎ নদ-নদী যেমন সাগর-মহাসাগরে গিয়ে মেশে, জল-স্থল-অন্তরিক্ষের সব সম্পদ তেমনি গুটি কয়েক মানুষের ভান্ডারগামী করার বন্দোবস্তের নাম ‘পুঁজিবাদ’। আপনারা গরিব বলে সব দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনা-অবহেলার সওয়ার সাগর হয়ে থাকবেন, আর তাঁহারা হবেন যাবতীয় প্রাপ্তি, ভোগ, সম্পদের ‘মহাসাগর’।

গত এক বছরে বিশ্বে নতুন করে দুই কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যসংকট প্রতিবেদন ২০২১ বলছে, করোনা মহামারির জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ুর পরিবর্তন ও যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে তিনবেলা ন্যূনতম খাবারও জুটছে না তাদের। গত বছর এমন অনাহারী মানুষের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৫০ লাখ।

ডব্লিউএফপির পরিচালক ডেভিড বিসলির আশঙ্কা, চরম খাদ্যসংকটে ভোগা মানুষের কাছে যদি শিগগির সাহায্য নিয়ে যাওয়া না যায়, তাহলে যেকোনো সময় তাঁরা ইহলোক ছেড়ে যেতে পারেন। তাঁদের এই ‘পরলোকগমন’ ঠেকানোর জন্য দরকার মাত্র ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। এ পরিমাণ অর্থ দিনেও নয়, কয়েক ঘণ্টায় কামাই করার মতো মানুষও আছে এই দুনিয়ায়। এই তো দিন কয়েক আগে ছয় ঘণ্টার মতো ফেসবুকের সেবায় বিঘ্ন ঘটে, আর এতেই নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গের ক্ষতি হয় ৬০০ কোটি ডলার।

ব্লুমবার্গের হিসাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সম্পদ এখন ২৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (মাত্র)। এর ২ শতাংশ, মানে ৫৭৮ কোটি ডলার, যা দিয়ে মিটতে পারে ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের খাদ্যসংকট। সত্য হলো, করোনা অতিমারির আগেও সারা বিশ্বে ৩০০ কোটি মানুষ সবচেয়ে সস্তার খাবারও কিনে খেতে পারতেন না। আর ফি বছর ক্ষুধা ও ক্ষুধাজনিত রোগব্যাধিতে ভুগে প্রাণ হারান ৯০ লাখ মানুষ।

গত এক বছরে বিশ্বে নতুন করে দুই কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যসংকট প্রতিবেদন ২০২১ বলছে, করোনা মহামারির জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ুর পরিবর্তন ও যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে তিনবেলা ন্যূনতম খাবারও জুটছে না তাদের। গত বছর এমন অনাহারী মানুষের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৫০ লাখ। এক আফগানিস্তানেই এখন ২ কোটি ২৮ লাখ মানুষ চরম অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি (ডব্লিউএফপি)। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্যের ওপর করা সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ বলছে, খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং রোজগারে কোপ পড়ায় নিম্নমানের খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ আপনাদের মাথার ওপরের আচ্ছাদনের ফুটোর সংখ্যা, পরনের কাপড়ের মলিনতা আর ক্ষুধার জ্বালার ‘মাত্রা’ পরিমাপের নানা ব্যবস্থা আছে। যেমন ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে (পিপিপি) আপনার দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম হলে আপনি হতদরিদ্র বা অতি গরিব। বাংলাদেশের মতো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে হলে দৈনিক ন্যূনতম ৩ দশমিক ২ পিপিপি ডলার আয় দরকার হবে। বিবিএসের হিসাবে, বাংলাদেশে এখন অতি দারিদ্র্যের হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।

গত দশকটা ধনীদের ছিল বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ওয়েলথ এক্স। ২০১০ সাল থেকে বিশ্বে ধনীর সংখ্যা ও তাঁদের অর্থকড়ির পরিমাণ—দুটোই বেড়েছে নাকি হঠাৎ বন্যার জলের তোড়ের মতো, হু হু করে। শতাংশের হিসাবে ৫০-এর ঘর ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কথা হলো, কোন শতকের কোন দশকটা বা কোন বছরটা, এমনকি কোন দিনটা ধনীদের ছিল না বা এখনো এই করোনার বৈরী সময়েও নেই? ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ অ্যান্ড আমেরিকানস ফর ট্যাক্স ফেয়ারনেস নামের একটি সংস্থা হিসাব কষে দেখিয়েছে, মহামারি শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে শতকোটি ডলারের মালিকদের সম্পদ বেড়ে দ্বিগুণ বেড়েছে। অন্যান্য দেশেরও চিত্র অভিন্ন। সুতরাং শিল্পবিপ্লবের আগের বা পরের বিশ্ব প্রযুক্তি-শাসিত সময়ের দুই দিকের দুনিয়া কিংবা ‘ডিজিটাল’ ও ‘অ্যানালগ’ জমানা—এই বৈষম্যময় অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো ফারাক কি ঘটাতে পেরেছে? এর উত্তর ইলন মাস্কদের জানা। তাই ‘দারিদ্র্য’ কবিতাখানি পড়ে তাঁদের ভাবান্তর কিছুটা হলেও হতে পারে, তবে তার স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ডের বেশি হবে না।

হাসান ইমাম সাংবাদিক। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন